প্রাণ পেল সেন্ট মার্টিন

আপলোড সময় : ০৭-১১-২০২৬ ০৩:০৯:২৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৭-১১-২০২৬ ০৩:১২:১৩ অপরাহ্ন
ঘড়ির কাঁটা তখন দুপুর দেড়টায়। আট মাসেরও বেশি সময় পর পর্যটকবাহী জাহাজ ভিড়েছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জেটিতে। জাহাজ থেকে একে একে নামছেন পর্যটক। তাদের বহন করতে প্রস্তুত টমটম নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন চালক মোহাম্মদ ইমরান।  পর্যটকদের নামতে দেখেই আনন্দে লাফিয়ে ওঠেন ইমরান। মুখে চওড়া হাসি, চোখে আনন্দের ঝিলিক।

যেন দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে তার। ইমরান সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা। একসময় পর্যটকদের টমটমে বহন করেই চলত তার সংসার। পর্যটন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জীবিকার তাগিদে কক্সবাজারের একটি হোটেলে চাকরি নিতে হয়েছিল তাকে।

গত বছর ঋণ করে টমটম কিনলেও পর্যটক না থাকায় সেই ঋণের টাকা তুলতে পারেননি। এবার পর্যটন মৌসুমে আয় থেকে ঋণ পরিশোধের আশায় নতুন করে একটি মাটির ব্যাংক কিনেছেন।পর্যটক আসা মানে তার কাছে শুধু বাড়তি আয় নয়, ঋণমুক্ত হওয়ার স্বপ্নও।

ইমরানের ভাষ্য, পর্যটকদের দেখে আজ (৫ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার) আনন্দে চোখে পানি চলে এসেছে। এই খুশি কাউকে বোঝাতে পারব না।

গত বছর আমার মতো অনেক টমটমচালক ঋণ নিয়ে সংসার চালিয়েছেন, কিন্তু সেই ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। এবার পর্যটক আসায় অন্তত কিছুটা স্বস্তি পাব।

ইমরানের মতো এমন অপেক্ষায় ছিলেন দ্বীপের কয়েক হাজার মানুষ। একসময় মাছধরা ও চাষাবাদ ছিল তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। সময়ের সঙ্গে পর্যটনশিল্পের প্রসার ঘটলে বদলে যায় দ্বীপের অর্থনীতির চিত্র। টমটম চালানো, পর্যটকদের ছবি তোলা, হোটেল-রিসোর্টে কাজ, খাবারের দোকান কিংবা নৌযানে শ্রমিক হিসেবে কাজ বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হন স্থানীয়রা। 

পর্যটনই হয়ে ওঠে অধিকাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। ফলে পর্যটকের যাতায়াত বন্ধ ও সীমিত হওয়ায় দ্বীপের মানুষের জীবনেও নেমে আসে অনিশ্চয়তা।

দ্বীপে নেমে স্থানীয়দের মুখের হাসিতে আলাদা আনন্দ খুঁজে পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা পর্যটক ফজলুল হক। তিনি বলেন, সেন্ট মার্টিনের মানুষের চেহারায় অন্যরকম আনন্দ দেখলাম। অনেকের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি, পর্যটক না আসায় তারা কতটা অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যায়। আমরা চাই, পর্যটক আসার মধ্য দিয়ে তাদের জীবনে স্বস্তি ফিরুক।

দ্বীপে পাঁচ বছর ধরে পর্যটকদের ছবি তুলে সংসার চালাচ্ছেন মোহাম্মদ আল সাবের। পর্যটক কমে যাওয়ায় শুধু দ্বীপে নয়, জীবিকার তাগিদে কক্সবাজার ও টেকনাফের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রেও ছবি তুলেছেন তিনি। তবু পাঁচ সদস্যের পরিবারের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। আয় কমলেও সংসারের ব্যয় কমেনি, বরং সময়ের সঙ্গে বেড়েছে ঋণের বোঝা।

আল সাবের বলেন, পর্যটক না থাকায় কক্সবাজার-টেকনাফের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ছবি তুলেছি। তার পরও সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়েছে। পরিবারের পাঁচ সদস্যের খরচ জোগাতে গিয়ে ঋণ বেড়েছে। এবার টানা চার মাস পর্যটক আসবে। এতে অন্তত সংসারটা মোটামুটি চালাতে পারব।

পর্যটন বন্ধের প্রভাব শুধু বড়দের জীবিকায় নয়, পড়েছে শিশু-কিশোরদের শিক্ষাজীবনেও। দ্বীপের অনেক পরিবারের আয়ের বড় অংশ পর্যটন মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পর্যটক এলে পরিবারের কাজে সহায়তা করে কিংবা পার্টটাইম কাজ করে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পড়াশোনার খরচ চালান। কেউ খাতা-কলম কেনেন, কেউ কোচিংয়ের খরচ চালান। পর্যটন বন্ধ থাকলে এসব সুযোগও বন্ধ হয়ে যায়।

সেন্টমার্টিন উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবুল ফারুক বলেন, ‘বৃহস্পতিবার থেকে একটি রিসোর্টে পার্টটাইম কাজ করছি। বাবার একার আয়ে আমাদের পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব হয় না। পর্যটক এলে চার মাস কাজ করে কিছু টাকা আয় করতে পারব। এভাবে কাজের সুযোগ থাকলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সুবিধা হবে। তা না হলে আমাদের পড়াশোনায় বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়।

দ্বীপের বাসিন্দাদের ভাষ্য, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি-এই চার মাসই সেন্টমার্টিনের প্রধান পর্যটন মৌসুম। এই সময়ের আয় দিয়েই অনেক পরিবারকে বছরের বাকি সময়ের ব্যয় সামলাতে হয়। 

পর্যটকদের রাতযাপনে নিষেধাজ্ঞা, যাতায়াত সীমিত হওয়া এবং পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় গত দুই বছরে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানে বড় ধাক্কা লাগে। হোটেল-রিসোর্টের কর্মী, জেলে, নৌযানশ্রমিক, টমটমচালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পড়েন বিপাকে।

দ্বীপের বাসিন্দা আয়াত উল্লাহ বলেন, অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে পর্যটনের সঙ্গে জড়িত। ফলে পর্যটন মৌসুম শুরু হলে এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকায় গতি ফেরে। এই চার মাসের আয়ের ওপর অনেক পরিবারের সারা বছরের হিসাব নির্ভর করে। তবে শুধু পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল থাকলে হবে না,  দ্বীপের মানুষের জন্য সরকারি উদ্যোগে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘পর্যটন বন্ধ কিংবা সীমিত থাকলে তাদের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে যায়। দুই বছর পর পর্যটন ঘিরে মানুষের মধ্যে আবার কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে। 

ইউপি চেয়ারম্যান জানান, পর্যটকদের বরণ করে নিতে দ্বীপবাসী প্রস্তুত। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, সরকার অনুমোদিত জাহাজে অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে পর্যটকরা সেন্টমার্টিনে যেতে পারবেন। গত বছর পর্যটকবাহী একটি জাহাজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। এবার যাতে এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জাহাজগুলোর ফিটনেস যাচাই করেছে।

 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :