থানচির দুর্গম বড় মদকে ১০ হাজার মানুষের জন্য হাসপাতাল স্থাপনের দাবি

আপলোড সময় : ০৪-১১-২০২৬ ০৪:০২:১৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৪-১১-২০২৬ ০৪:০২:১৯ অপরাহ্ন
বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার এবং থানচি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে দুর্গম সীমান্তবর্তী এলাকা বড় মদক। পাহাড় ও নদীবেষ্টিত এই জনপদে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা নদীপথ। প্রতিবছর হাম, টাইফয়েড, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ দেখা দিলেও সেখানে নেই কোনো স্থায়ী সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ফলে জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সীমান্তবর্তী এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষ।

গুরুতর অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসার জন্য দুর্গম নদীপথ পাড়ি দিয়ে থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে সময় লাগে আট ঘণ্টারও বেশি। এতে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকিও।

এ অবস্থায় বড় মদক এলাকায় দ্রুত একটি সরকারি হাসপাতাল স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, সীমান্তবর্তী ছোট মদক ও বড় মদকের প্রায় ৬০টি গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সেখানে একটি স্থায়ী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, থানচি উপজেলার রেমাক্রী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ছোট মদক ও বড় মদক এলাকায় ৬০টির বেশি গ্রামে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। অথচ বিশাল এই জনপদে নেই কোনো স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা সহজ যোগাযোগব্যবস্থা। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ওঝা, বৈদ্য ও কবিরাজদের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়লেও দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ না থাকায় রোগীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে চিকিৎসাসেবা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন রয়েছেন বড় মদক এলাকার মানুষ। হাম, টাইফয়েড ও ডায়রিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। ফলে সাধারণ রোগও অনেক সময় জটিল আকার ধারণ করছে। জরুরি মুহূর্তে রোগীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে দীর্ঘ সময় লাগায় বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি।

বড় মদকের বাসিন্দা মংমে মারমা, উসাইশৈ মারমা, উশৈওয়াং মারমা ও চপ্রুঅং মারমাসহ স্থানীয়রা জানান, গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রায় ৭০ কিলোমিটার দুর্গম নদীপথ পাড়ি দিয়ে থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে হয়। এতে আট ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। দীর্ঘ এই যাত্রায় অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। গত মাসেও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

তারা আরও বলেন, সাময়িক চিকিৎসা কার্যক্রম কিংবা বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ দিয়ে এই এলাকার দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসংকট দূর করা সম্ভব নয়। সীমান্তবর্তী দুর্গম জনপদের মানুষের চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করতে বড় মদকে একটি স্থায়ী সরকারি হাসপাতাল স্থাপন জরুরি।

রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা (রনি) বলেন, রেমাক্রী ও বড় মদক এলাকায় প্রতিবছর পানিবাহিত রোগসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ দেখা দেয়। জরুরি চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সংকটাপন্ন রোগীদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না।

তিনি আরও বলেন, চিকিৎসাসেবা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের জন্য বড় মদকে হাসপাতাল স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। এ দাবিতে গত মাসে স্থানীয় বাসিন্দারা রেমাক্রী অথবা বড় মদক এলাকায় একটি সরকারি হাসপাতাল স্থাপনের জন্য থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আবেদন করেছেন। সরকারি উদ্যোগে হাসপাতালটি স্থাপন করা হলে বড় মদক, ছোট মদকসহ আশপাশের সীমান্তবর্তী এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষ জরুরি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাবেন।

dis

এ বিষয়ে থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ বলেন, রেমাক্রী ইউনিয়নের দুর্গম ও গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী এলাকা বড় মদক। সেখানে হাসপাতাল স্থাপন করা হলে বুলুপাড়া, আন্ধারমানিক, ছোট মদক, বড় মদকসহ তিন্দু ইউনিয়নের আশপাশের দুর্গম এলাকার মানুষও দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাবেন।

তিনি আরও বলেন, হাসপাতাল স্থাপনের দাবিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান, পাড়াপ্রধান ও তরুণেরা স্বাস্থ্য বিভাগে আবেদন করেছেন। তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বড় মদকে হাসপাতাল স্থাপনের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত প্রস্তাব ও প্রয়োজনীয় চিঠি পাঠানো হয়েছে।

বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী জানান, বড় মদক এলাকায় হাসপাতাল স্থাপনের বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের পরিকল্পনা বিভাগের সঙ্গে কথা হয়েছে। সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করে হাসপাতাল স্থাপনের উপযুক্ত জায়গা নির্ধারণের পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কনভেনার ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য লুসাই মং জানান, থানচির তিন্দু ইউনিয়নের কম্বো পাড়ায় ২০ শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য বিজিবি সেক্টর থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে রেমাক্রী ইউনিয়নের বড় মদক এলাকায় স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র অথবা পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র স্থাপনের আবেদন করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, বেসরকারি সংস্থা গ্রিন হিল ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অংশীদারত্বে বড় মদক এলাকায় একটি মিডওয়াইফারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকেও মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সব মিলিয়ে দুর্গম বড় মদক এলাকায় ইউনিয়ন পরিবারকল্যাণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রস্তাব ও পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাহাড়ি এই দুর্গম সীমান্ত জনপদের প্রায় ১০ হাজার মানুষের জীবন রক্ষায় বড় মদকে একটি স্থায়ী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবি এখন এলাকাবাসীর প্রধান দাবি।

 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :