কলাপাড়ার প্রবীণদের উপকূল, একাকিত্ব ও টিকে থাকার লড়াই!

আপলোড সময় : ০১-১১-২০২৬ ১২:৩০:৫০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০১-১১-২০২৬ ১২:৩০:৫০ অপরাহ্ন
বয়সের হিসাবে জীবনের শেষ প্রান্তে। কেউবা বয়সের ভারের চেয়ে রোগাক্রান্ত হয়ে বেশি নুয়ে পড়েছেন। অনেকে শয্যাশায়ী। আবার কেউ কেউ গত হয়েছেন। কিন্তু পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় অনেক প্রবীণের কাছে বয়স যেন কেবল একটি সংখ্যা। কারও হাতে এখনো লাঙলের ফলা, কেউ নদী-সাগরে কাটানো জীবনের স্মৃতি আঁকড়ে আছেন। কেউবা সংসারের ছোটখাটো কাজ করে নিজের প্রয়োজন মেটান। কেউবা একান্নবর্তী সংসারে সুখস্মৃতি উপভোগ করছেন। রয়েছে আবার কারও বিপরীত দৃশ্যপট। কারও দিন কাটে একাকিত্বে- সন্তানরা দূরে, শরীর দুর্বল, আয় নেই; ভরসা বলতে বয়স্ক ভাতা কিংবা স্বজনের সামান্য সহায়তা। কেউবা আবার এখনো শ্রমজীবীর কাজ করছেন। নুয়ে পড়া শরীরটাকেই পুঁজি করে লড়ছেন জীবনের প্রয়োজনে। উপকূলীয় জনপদ কলাপাড়ায় ৭০ ঊর্ধ্ব এসব মানুষের জীবন শুধু বার্ধক্যের গল্প নয়; এটি দীর্ঘ কয়েক দশকে বদলে যাওয়া কৃষি, নদী, সমুদ্র, জলবায়ু ও পারিবারিক কাঠামোরও জীবন্ত দলিল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, পটুয়াখালী জেলার মোট জনসংখ্যা ১৭ লাখ ২৭ হাজার ২৫৪। জনশুমারি ২০২২-এ বয়সভিত্তিক জনসংখ্যার তথ্যও সংরক্ষিত হয়েছে, যেখানে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বয়সভেদে আলাদা হিসাব রয়েছে। ওই তথ্যানুসারে কলাপাড়ায় ৭০ বছর থেকে শতবর্ষীর চেয়ে বেশি বয়সের প্রবীণ মানুষের সংখ্যা মোট ১২ হাজার ২১৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ছয় হাজার ৮৫৮ জন। নারী পাঁচ হাজার ৩৫৭ জন। পরিসংখ্যান মতে ৭০-৭৪ বছর বয়সীর সংখ্যা পাঁচ হাজার ৫২২ জন। ৭৫-৭৯ বছর বয়সী দুই হাজার ৫৬৯ জন। ৮০-৮৪ বছর বয়সী দুই হাজার ১২৩ জন। ৮৫-৮৯ বছর বয়সী ৮৬৮ জন। ৯০-৯৪ বছর বয়সী ৭০৭ জন। ৯৫-৯৯ বছর বয়সী ৩৫৮ জন এবং শতবর্ষী থেকে তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ৬৮ জন।

এই পরিসংখ্যানের আড়ালে থাকা মানুষগুলোর গল্প আরও কঠিন।
কলাপাড়ার কোনো গ্রামে ৭০ পেরোনো কৃষক এখনো সকালে ঘুম থেকে উঠে জমির দিকে তাকান। শরীর আগের মতো সাড়া দেয় না, তবু জমিতে শ্রমিকের কাজ, গবাদিপশুর দেখাশোনা কিংবা বাড়ির উঠানে সবজি চাষে যুক্ত থাকেন। তাঁর কাছে কাজ শুধু আয়ের উৎস নয়-নিজেকে প্রয়োজনীয় মনে করারও একটি উপায়।

৭০-৮০ পেরোনো অনেক জেলের জীবনেও একই চিত্র। যৌবনে যে নদী বা সাগর ছিল জীবিকার প্রধান ভরসা, বয়সের ভারে সেই পানিতে নামা এখন আর সম্ভব হয় না। তবু নৌকা, জাল, মাছের গন্ধ আর জোয়ার-ভাটার স্মৃতি তাঁদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেউ কেউ এখন ঘাটে বসে তরুণ জেলেদের মাছ ধরা দেখেন; কেউ সন্তান বা নাতিদের কাছ থেকে শোনেন সাগরের খবর।

তবে এখনো অসংখ্য প্রবীণের জীবীকার বোঝা বইতে হয়। শরীর সায় দেয় না। নুয়ে পরেছে শরীর। তারপরও করতে হয় কোন না কোন কাজ এদেরই একজন নীলগঞ্জ ইউনিয়নের গুটাবাছা গ্রামের আবুল কাশেম। সংসারের কিংবা নিজের যোগান দিতে খাল থেকে শাপলা তুলে বিক্রি করেন। শাকসবজি সংগ্রহ কওে কলাপাড়া পৌর শহরের বাজাওে বিক্রি করেন। দুবেলা; দু’মুঠো অন্নের যোগান দিতে এখনো লড়াই করছেন প্রবীণ এই মানুষটি। একই দশা চাকামইয়া নেওয়াপাড়া গ্রামের আব্দুল হামিদের। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তারা তাঁদেও ঘর সমলাতে ব্যস্ত। নিজের অসুস্থ রোগাকায় শরীর নিয়ে আব্দুল হামিদ কলাপাড়া শহওে অটোবাইক চালাচ্ছেন। অসুস্থ-স্ত্রীর দীর্ঘদিন সেবাও তাঁকে করতে হয়েছে। একসময় সে পরপাওে চলে গেছেন। জানালেন, হামিদ এখন অসুস্থ শরীরে কোনদিন অটো চালাতে পারছেন, আবার কোনদিন পারছেন না। বিছানায় পড়ে থাকতে হয়। শরীরের সঙ্গে এই মানুষটি আর তাল মেলাতে পারছেন না।  

প্রবীণ নারীদের জীবন আরও নীরব। সংসারের জন্য সারাজীবন কাজ করেও অনেকের নিজের নামে কোনো আয় নেই। স্বামী মারা গেলে বা সন্তানরা কর্মের সন্ধানে অন্যত্র চলে গেলে ঘরটিই হয়ে ওঠে তাঁদের পুরো পৃথিবী। কারও দিন কাটে নাতি-নাতনিদের দেখাশোনায়, আবার কারও দিন কাটে অপেক্ষায় কখন সন্তান ফোন করবে, কখন বাড়ি আসবে।
কলাপাড়ার মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় এই বয়সী মানুষের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার মতো দুর্যোগের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘ পরিচয়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্যোগের সময় দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। হাঁটতে না পারা, চোখের সমস্যা, শারীরিক দুর্বলতা কিংবা ওষুধের প্রয়োজন-সবকিছু মিলিয়ে অনেক প্রবীণের জন্য একটি দুর্যোগ অন্যদের তুলনায় বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায়।

তবে প্রবীণদের জীবন বুঝতে শুধু সংখ্যা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন তাঁদের কাছে যাওয়া, তাঁদের কথা শোনা।

৭০ পেরিয়ে কেউ হয়তো আজও নিজের হাতে ভাত রান্না করেন। কেউ লাঠিতে ভর দিয়ে বাজারে যান। কেউ পুরোনো দিনের কলাপাড়ার গল্প বলেন, যখন যোগাযোগব্যবস্থা ছিল দুর্বল, বিদ্যুৎ ছিল না, নদীপথই ছিল প্রধান যোগাযোগ। আবার কেউ স্মরণ করেন ঘূর্ণিঝড়ের রাত, হারিয়ে যাওয়া স্বজন, বদলে যাওয়া নদী কিংবা বিলীন হয়ে যাওয়া গ্রামের কথা। অনেকে আবার কোন উপায় না পেয়ে লাঠি হাতে নিয়ে ভিক্ষে করছেন। চিকিৎসা ও কাধ্য সহায়তা এদেও সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতনমহল।

তাঁদের প্রত্যেকের জীবন যেন কলাপাড়ার একটি করে জীবন্ত ইতিহাস।

তাই ৭০ ঊর্ধ্ব মানুষের জন্য শুধু ভাতা নয়, সহজ চিকিৎসা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, দুর্যোগের সময় বিশেষ সহায়তা এবং পারিবারিক-সামাজিক সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ তাঁরা কেবল সমাজের ‘বৃদ্ধ’ নন; তাঁদের শ্রম, স্মৃতি, লোকজজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে আজকের কলাপাড়া। ৭০ পেরিয়ে তাঁদের শরীরের চামড়ায় হয়তো ভাঁজ পড়েছে, জীবনটাও হয়তো ধীরে চলে, কিন্তু তাঁদের জীবনের গল্প এখনো অনেক দূর যাওয়ার মতো। যা আজকের তরুণ ও যুবসমাজকে পথ দেখায়- এগিয়ে চলার পথের।

কলাপাড়ায় সরকারিভাবে সামাজিক নিরাপত্তা বেস্টনির সহায়তা পাওয়া প্রবীণ মানুষের সংখ্যা ১৭ সহস্রাধিক হলেও মাত্র ৭০০ টাকায় সব ধরনের সংকুলান হয় না। যদিও এটি তাঁদের জন্য বড় সহায়ক। অন্তত ওষুধ কেনার কাজে লাগছে অধিকাংশের। জীবীকার যোগান দেওয়া কষ্টের মানুষগুলোর দাবি তাঁদের এই সহায়তার অর্থ বৃদ্ধি করা হোক।

 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :