কক্সবাজারের রামুর বাঁকখালী নদীতে ভাসানো হয়েছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কল্পজাহাজ। বাঁশ, কাঠ, বেত ও রঙিন কাগজের কারুকাজে তৈরি সাতটি কল্পজাহাজে ফুটিয়ে তোলা হয় বুনো হাতি, হরিণ, ঘোড়া, পঙ্খীরাজ, হাঁস-ময়ূরসহ বিভিন্ন প্রাণী ও ধর্মীয় স্থাপনার অবয়ব। জাহাজের ওপর বৌদ্ধ কীর্তন, গান ও বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনায় উৎসবমুখর হয়ে ওঠে নদীর দুই পাড়।
শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে রামু সদরের চেরাংঘাটা এলাকায় বাঁকখালী নদীতে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। উপজেলার বিভিন্ন বৌদ্ধবিহার থেকে তৈরি করে আনা সাতটি কল্পজাহাজ একে একে নদীতে ভাসানো হয়। উৎসব দেখতে নদীর দুই তীরে জড়ো হন হাজারো মানুষ।
কল্পজাহাজগুলো দেখতে ছিল ভিন্ন রকম। কয়েকটি কাঠের নৌকা একসঙ্গে জুড়ে তৈরি করা হয় প্রতিটি জাহাজ। এরপর বাঁশ, কাঠ, বেত ও রঙিন কাগজ দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয় নানা আকৃতির শিল্পকর্ম। কোনো জাহাজে বুনো হাতি, কোথাও হরিণ বা পঙ্খীরাজ, আবার কোনো জাহাজে ফুটিয়ে তোলা হয় বৌদ্ধবিহারের জাদি।
জাহাজগুলো নদীতে ভাসানোর সময় দুই পাড়ে থাকা মানুষ হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। অনেকেই মুঠোফোনে ধারণ করেন উৎসবের ছবি ও ভিডিও। ঢাকঢোল, গানবাজনা ও বৌদ্ধ কীর্তনের সঙ্গে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা।
এবারের কল্পজাহাজে উৎসবের পাশাপাশি উঠে এসেছে রামুর ইতিহাসও। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রামুর বৌদ্ধবিহার ও বসতিতে হামলার স্মৃতি তুলে ধরা হয়েছে জাহাজের শিল্পকর্মে। এর মধ্য দিয়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতার বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে জানান আয়োজকেরা।
কল্পজাহাজ ভাসানোর আয়োজনটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় ঐতিহ্য হলেও এতে অংশ নেন বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ। স্থানীয়দের পাশাপাশি কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকরাও উৎসব দেখতে রামুতে ছুটে আসেন।
খাগড়াছড়ি সদর থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উৎসবে যোগ দেন কিং সেন মং। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে এই উৎসবে আসছেন। প্রতিবছরই কল্পজাহাজে নতুন কোনো বার্তা তুলে ধরা হয়। আয়োজনটি তার কাছে খুবই উপভোগ্য।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটক সমির মল্লিক ও কল্পজাহাজ ভাসানোর খবর পেয়ে রামুতে আসেন। তিনি বলেন, এমন ঐতিহ্যবাহী আয়োজন আগে দেখেননি। পুরো আয়োজন দেখে তিনি মুগ্ধ।
স্থানীয় বাসিন্দা জুনায়েদ চৌধুরী বলেন, কল্পজাহাজ ভাসানো বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ঐতিহ্য হলেও এখানে সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে। ফলে এটি এখন শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও বড় আয়োজন।
রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের আবাসিক প্রধান প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রামুতে কল্পজাহাজ ভাসানোর আয়োজন হয়ে আসছে। প্রায় দুইশ বছর আগে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে এ উৎসবের প্রচলন হয়। পরে রামুসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
বৌদ্ধ ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, আড়াই হাজার বছর আগে মহামতি বুদ্ধের মগধ থেকে বৈশালী যাওয়ার স্মৃতির সঙ্গেও এ উৎসবের যোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
কল্পজাহাজ ভাসানোর আগের দিন সন্ধ্যায় রামু মৈত্রী বিহার ও রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় ফানুস উৎসব। রঙ-তুলির আঁচড়ে ফানুসে ফুটিয়ে তোলা হয় মহামতি বুদ্ধের জন্ম থেকে মহাপরিনির্বাণ পর্যন্ত জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় ও তার জীবনদর্শন।
সন্ধ্যার আকাশে একের পর এক ফানুস উড়তে থাকলে পুরো এলাকায় তৈরি হয় অন্যরকম আবহ। আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে আকাশ, আর উৎসবের সেই রেশ ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যেও।
রামুর বাঁকখালী নদীর পাশাপাশি কক্সবাজার শহরের কবিতা চত্বর সৈকত, সদর উপজেলার চৌফলদণ্ডী, চকরিয়ার হারবাং ও টেকনাফেও কল্পজাহাজ ভাসানোর আয়োজন করা হয়।
এদিকে, কল্পজাহাজ ভাসানো উপলক্ষে বিকেলে নদীর চরে আয়োজন করা হয় আলোচনা সভার। উৎসব উদ্যাপন কমিটির সভাপতি বিপ্লব বড়ুয়ার সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সুকুমল বড়ুয়াসহ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা বক্তব্য দেন। বক্তারা ধর্মীয় সম্প্রীতি, শান্তি ও পারস্পরিক সহাবস্থানের ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে রামু সদরের চেরাংঘাটা এলাকায় বাঁকখালী নদীতে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। উপজেলার বিভিন্ন বৌদ্ধবিহার থেকে তৈরি করে আনা সাতটি কল্পজাহাজ একে একে নদীতে ভাসানো হয়। উৎসব দেখতে নদীর দুই তীরে জড়ো হন হাজারো মানুষ।
কল্পজাহাজগুলো দেখতে ছিল ভিন্ন রকম। কয়েকটি কাঠের নৌকা একসঙ্গে জুড়ে তৈরি করা হয় প্রতিটি জাহাজ। এরপর বাঁশ, কাঠ, বেত ও রঙিন কাগজ দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয় নানা আকৃতির শিল্পকর্ম। কোনো জাহাজে বুনো হাতি, কোথাও হরিণ বা পঙ্খীরাজ, আবার কোনো জাহাজে ফুটিয়ে তোলা হয় বৌদ্ধবিহারের জাদি।
জাহাজগুলো নদীতে ভাসানোর সময় দুই পাড়ে থাকা মানুষ হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। অনেকেই মুঠোফোনে ধারণ করেন উৎসবের ছবি ও ভিডিও। ঢাকঢোল, গানবাজনা ও বৌদ্ধ কীর্তনের সঙ্গে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা।
এবারের কল্পজাহাজে উৎসবের পাশাপাশি উঠে এসেছে রামুর ইতিহাসও। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রামুর বৌদ্ধবিহার ও বসতিতে হামলার স্মৃতি তুলে ধরা হয়েছে জাহাজের শিল্পকর্মে। এর মধ্য দিয়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতার বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে জানান আয়োজকেরা।
কল্পজাহাজ ভাসানোর আয়োজনটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় ঐতিহ্য হলেও এতে অংশ নেন বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ। স্থানীয়দের পাশাপাশি কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকরাও উৎসব দেখতে রামুতে ছুটে আসেন।
খাগড়াছড়ি সদর থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উৎসবে যোগ দেন কিং সেন মং। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে এই উৎসবে আসছেন। প্রতিবছরই কল্পজাহাজে নতুন কোনো বার্তা তুলে ধরা হয়। আয়োজনটি তার কাছে খুবই উপভোগ্য।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটক সমির মল্লিক ও কল্পজাহাজ ভাসানোর খবর পেয়ে রামুতে আসেন। তিনি বলেন, এমন ঐতিহ্যবাহী আয়োজন আগে দেখেননি। পুরো আয়োজন দেখে তিনি মুগ্ধ।
স্থানীয় বাসিন্দা জুনায়েদ চৌধুরী বলেন, কল্পজাহাজ ভাসানো বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ঐতিহ্য হলেও এখানে সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে। ফলে এটি এখন শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও বড় আয়োজন।
রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের আবাসিক প্রধান প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রামুতে কল্পজাহাজ ভাসানোর আয়োজন হয়ে আসছে। প্রায় দুইশ বছর আগে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে এ উৎসবের প্রচলন হয়। পরে রামুসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
বৌদ্ধ ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, আড়াই হাজার বছর আগে মহামতি বুদ্ধের মগধ থেকে বৈশালী যাওয়ার স্মৃতির সঙ্গেও এ উৎসবের যোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
কল্পজাহাজ ভাসানোর আগের দিন সন্ধ্যায় রামু মৈত্রী বিহার ও রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় ফানুস উৎসব। রঙ-তুলির আঁচড়ে ফানুসে ফুটিয়ে তোলা হয় মহামতি বুদ্ধের জন্ম থেকে মহাপরিনির্বাণ পর্যন্ত জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় ও তার জীবনদর্শন।
সন্ধ্যার আকাশে একের পর এক ফানুস উড়তে থাকলে পুরো এলাকায় তৈরি হয় অন্যরকম আবহ। আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে আকাশ, আর উৎসবের সেই রেশ ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যেও।
রামুর বাঁকখালী নদীর পাশাপাশি কক্সবাজার শহরের কবিতা চত্বর সৈকত, সদর উপজেলার চৌফলদণ্ডী, চকরিয়ার হারবাং ও টেকনাফেও কল্পজাহাজ ভাসানোর আয়োজন করা হয়।
এদিকে, কল্পজাহাজ ভাসানো উপলক্ষে বিকেলে নদীর চরে আয়োজন করা হয় আলোচনা সভার। উৎসব উদ্যাপন কমিটির সভাপতি বিপ্লব বড়ুয়ার সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সুকুমল বড়ুয়াসহ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা বক্তব্য দেন। বক্তারা ধর্মীয় সম্প্রীতি, শান্তি ও পারস্পরিক সহাবস্থানের ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন