​হামের টিকা নিলেও ২৭% শিশুর শরীরে তৈরি হচ্ছে না অ্যান্টিবডি

আপলোড সময় : ২৭-১০-২০২৬ ১২:৩৮:২৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৭-১০-২০২৬ ১২:৩৮:২৮ অপরাহ্ন
দেশজুড়ে পরিচালিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা নেওয়ার পরও ২৭ শতাংশ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি গড়ে ওঠেনি। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ কয়েকটি দেশি-বিদেশি সংস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত এক যৌথ গবেষণায় জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম উদ্বেগজনক এই তথ্য উঠে এসেছে। গত এপ্রিল-মে মাসে দেশব্যাপী হাম-রুবেলার বিশাল টিকা ক্যাম্পেইন পরিচালনার পরও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় এই গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ঢাকা, ময়মনসিংহ ও মুন্সিগঞ্জের উপশহর ও গ্রাম পর্যায়ের ৯ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৩০৯টি শিশুর রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে গবেষকরা দেখেছেন, এর মধ্যে মাত্র ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ বা ২০৩টি শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। ৬ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুর অ্যান্টিবডি রয়েছে সীমান্ত এলাকায় বা বর্ডার লাইনে। আর সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, টিকা পাওয়ার পরও ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ বা ৮৫টি শিশুর শরীরে কোনো অ্যান্টিবডিই তৈরি হয়নি। বিশেষ করে ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে এই রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।

টিকা দেওয়ার পরও শিশুদের সুরক্ষিত না থাকার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। টিকা বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল এ বারি জানান, টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে বিমানবন্দর হয়ে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে শিশুর শরীরে প্রয়োগ পর্যন্ত একটি দীর্ঘ পরিবহন ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া বা কোল্ড চেইন পার হতে হয়। এর যেকোনো এক পর্যায়ে নির্দিষ্ট তাপমাত্রার হেরফের হলেই টিকার কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেতে পারে। এর পাশাপাশি শিশুদের অতিমাত্রায় অপুষ্টির শিকার হওয়াকেও একটি বড় কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।

দেশে ব্যবহৃত টিকাগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত হলেও, এগুলো দেশে আনার পর মান যাচাইয়ের কোনো নিজস্ব পরীক্ষাব্যবস্থা নেই। উপরন্তু, সম্প্রতি ৭০ জন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞকে নিয়ে গঠিত স্বাধীন পর্যালোচনা দলের তথ্যানুযায়ী, ইপিআইয়ের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ২০ শতাংশ শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

টিকার এই কার্যকারিতাহীনতার মধ্যেই দেশে হামের প্রাদুর্ভাব রীতিমতো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছর হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে ২ লাখ ২২ হাজার ৫৫২ জন চিকিৎসা নিতে এসেছেন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২৩৩ জনের, যার মধ্যে ১০৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হামে এবং বাকি ১ হাজার ১২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টাতেই সারা দেশে ১ হাজার ৩৮৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন।

সংক্রমণের এই ভয়াবহ বিস্তার ঠেকাতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে জরুরিভিত্তিতে নতুন পরিকল্পনার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ সতর্ক করে জানিয়েছেন, টিকার কভারেজ যেকোনো মূল্যে ৯৫ শতাংশের ওপরে নিয়ে যেতে হবে। শুধু তাই নয়, টিকা দেওয়ার বয়সসীমা পাঁচ বছরের বেশি এবং পর্যায়ক্রমে তা ১৮ বছর পর্যন্ত বাড়াতে হবে। হামের এই জটিল পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে প্রতি চার বছর পরপর জাতীয় ক্যাম্পেইন আয়োজনের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।

অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বর্তমান টিকার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই জানিয়ে বলেছেন, আইইডিসিআরের এই গবেষণাটির নমুনা সংখ্যা বেশ কম হওয়ায় এখনই চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। প্রকৃত পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য বর্তমানে জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে দেশের ৩০টি উপজেলার তিন হাজার শিশুর ওপর বড় পরিসরে আরেকটি গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে।

আগামী নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে এই গবেষণার ফলাফল পাওয়া গেলে হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে। পাশাপাশি, টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ ও প্রয়োগ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় টিকার বিশুদ্ধতা যেন বজায় থাকে, সে বিষয়ে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেছেন। 

সূত্র: প্রথম আলো।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :