​১০০ বছরেও শিশুর জন্ম হয়নি যে দেশে, নেই নিজস্ব হাসপাতাল

আপলোড সময় : ২৫-১০-২০২৬ ০৪:১২:০০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৫-১০-২০২৬ ০৪:১২:০০ অপরাহ্ন
বিশ্বের ১৯৫টি স্বীকৃত স্বাধীন দেশের প্রত্যেকটিরই রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনযাপনের ধরন। তবে এর মধ্যে এমন একটি রাষ্ট্র রয়েছে, যার আয়তন অত্যন্ত ছোট, নেই নিজস্ব সাধারণ হাসপাতাল, এমনকি পূর্ণাঙ্গ সেনাবাহিনীও নেই। দেশটির নাম ভ্যাটিকান সিটি। ইতালির রাজধানী রোমের মাঝখানে অবস্থিত এই রাষ্ট্রকে ঘিরে রয়েছে নানা বিস্ময়কর তথ্য।

ভ্যাটিকান সিটি বিশ্বের সবচেয়ে ছোট স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপের আবাসস্থল এই দেশ। এখানে রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা, ভ্যাটিকান মিউজিয়াম এবং সিস্টিন চ্যাপেলের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য পর্যটক ও তীর্থযাত্রী দেশটি দেখতে আসেন। তবে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব সাধারণ হাসপাতাল না থাকার বিষয়টি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।

ভ্যাটিকান সিটির আয়তন মাত্র ০.৪৪ বর্গকিলোমিটার বা ৪৪ হেক্টর। চারদিকে ইতালির রাজধানী রোমের শহর, আর তার মাঝেই প্রাচীরঘেরা এই স্বাধীন রাষ্ট্রের অবস্থান। ১৯২৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইতালির সঙ্গে ল্যাটেরান চুক্তির মাধ্যমে ভ্যাটিকান সিটির সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি শিল্প, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের জন্যও ভ্যাটিকান সিটির পরিচিতি বিশ্বজুড়ে। সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে নিয়মিত ভিড় করেন পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরা। অন্যদিকে ভ্যাটিকান মিউজিয়াম ও সিস্টিন চ্যাপেলের অসাধারণ শিল্পকর্ম দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ সেখানে ছুটে যান। তবে এত সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের অধিকারী রাষ্ট্রটির দৈনন্দিন জীবনযাত্রা অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ আলাদা।

প্রশ্ন উঠতে পারে, ভ্যাটিকান সিটিতে কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে চিকিৎসা কোথায় করান? কিংবা কোনো নারীর সন্তান জন্মদানের প্রয়োজন হলে তিনি কোথায় যান? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থানের মধ্যে। ভ্যাটিকান সিটি রোমের ভেতরে অবস্থিত হওয়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানকার বাসিন্দা ও কর্মীদের ইতালির হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

রাষ্ট্রটির নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল বা প্রসূতি হাসপাতাল নেই। তবে স্বাস্থ্যসেবা একেবারেই অনুপস্থিত নয়। ভ্যাটিকানের সরকারি তথ্যভান্ডারে স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিভাগ এবং ওষুধের দোকানের উল্লেখ রয়েছে। ছোট আয়তন ও সীমিত জনসংখ্যার কারণে জটিল চিকিৎসার জন্য আলাদা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে প্রতিবেশী রোমের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রটি।

ভ্যাটিকান সিটিকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি করে সেখানে গত ১০০ বছরে কোনো শিশুর জন্ম না হওয়ার দাবি। বিষয়টি শুনে মনে হতে পারে, দেশটিতে শিশুর জন্ম নিষিদ্ধ। বাস্তবে এমন কোনো নিষেধাজ্ঞার তথ্য নেই। বরং নিজস্ব প্রসূতি হাসপাতাল না থাকায় সন্তান জন্মদানের জন্য সাধারণত মায়েদের রোমের হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হয়।

তবে ভ্যাটিকান সিটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঠিক ১০০ বছর সেখানে কোনো শিশুর জন্ম হয়নি—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তাই বিষয়টিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

ভ্যাটিকান সিটির আরেকটি ব্যতিক্রমী দিক হলো নাগরিকত্বের ব্যবস্থা। বিশ্বের অনেক দেশে জন্মস্থানের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ থাকলেও ভ্যাটিকান সিটিতে সাধারণত জন্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না। নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন, সেই দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত বসবাস এবং প্রযোজ্য নিয়মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারিত হয়।

জনসংখ্যার দিক থেকেও রাষ্ট্রটি অত্যন্ত ছোট। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভ্যাটিকান সিটির নাগরিক ছিলেন ৬৭৩ জন। অন্যদিকে নাগরিক ও অনাগরিক মিলিয়ে সেখানে বসবাসকারীর সংখ্যা ছিল ৮৮২। অর্থাৎ দেশটির নাগরিকের সংখ্যা এবং সেখানে বসবাসকারী মানুষের মোট সংখ্যা এক নয়।

ভ্যাটিকান সিটিতে পোপ, যাজক, বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং পোপের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সুইস গার্ডের সদস্যরা বসবাস করেন। জনসংখ্যা ও আয়তন সীমিত হওয়ায় রাষ্ট্রটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রোমের ভেতরে ভ্যাটিকানের অধিকারভুক্ত অন্যান্য ভবনেও কার্যক্রম পরিচালনা করে।

সব মিলিয়ে, ভ্যাটিকান সিটি শুধু বিশ্বের ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র বলেই অনন্য নয়; বরং সীমিত আয়তন ও জনসংখ্যার মধ্যেও কীভাবে একটি রাষ্ট্র তার প্রশাসনিক ও দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেটিও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। নিজস্ব সাধারণ হাসপাতাল না থাকলেও পাশের রোমের চিকিৎসাব্যবস্থা ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে দেশটির বাসিন্দাদের। আর শতবর্ষ ধরে কোনো শিশুর জন্ম না হওয়ার দাবিটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত না হলেও, রাষ্ট্রটির ব্যতিক্রমী নাগরিকত্বব্যবস্থা, ধর্মীয় গুরুত্ব ও ভৌগোলিক অবস্থান একে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :