বরিশালে ৮ নদীতে তীব্র ভাঙন: ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কা

আপলোড সময় : ১৩-১০-২০২৬ ০৩:১৫:২৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৩-১০-২০২৬ ০৩:১৫:২৮ অপরাহ্ন
বাপ-দাদার ভিটেমাটি বলতে এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে পাঁচ বছরে পাঁচবার বসতবাড়ি সরাতে হয়েছে জয় হাজরার পরিবারকে। প্রতিবারই নতুন করে ঘর বেঁধেছেন, গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন সংসার। কিন্তু নদীর আগ্রাসন থামেনি। এবার যে জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন, সেটিও হয়তো আর বেশি দিন টিকবে না। এ বছর বসতভিটা টিকে গেলেও আগামী বছর কী হবে, তা নিয়ে শঙ্কায় তিনি।

বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার ইলুহার গ্রামের বাসিন্দা জয় হাজরার মতো এমন অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে বরিশালের নদীতীরবর্তী হাজারো মানুষের। 

কারও চোখের সামনেই নদীতে বিলীন হচ্ছে বসতঘর, কারও হারিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি, আবার কারও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জীবিকার শেষ সম্বলটুকুও তলিয়ে যাচ্ছে নদীগর্ভে। ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করতে করতে অনেক পরিবার এখন নিঃস্ব। নতুন করে ঘর বাঁধার জায়গা হারিয়ে কেউ কেউ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন।

বরিশালের নদ-নদীতে অব্যাহত ভাঙনে বদলে যাচ্ছে এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও জনপদের চিত্র। মেঘনা, কালাবদর, তেঁতুলিয়া, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, কীর্তনখোলা, পান্ডব ও আড়িয়াল খাঁসহ বিভিন্ন নদীর ভাঙনে একের পর এক বসতবাড়ি, বাজার, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে। কোথাও বসতঘর সরিয়ে নেওয়ার আগেই নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে ভিটেমাটি, কোথাও আবার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা চলে এসেছে ভাঙনের একেবারে কিনারে।

বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় নদীভাঙনের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মেঘনা, কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীতীরবর্তী এ উপজেলার চরগোপালপুর ও আলিমাবাদ ইউনিয়নে সাম্প্রতিক সময়ে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে ৮০টি বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একই সময়ে বাজারের প্রায় ৪০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।  

এ ছাড়া একই উপজেলার গোবিন্দপুর, চর মিঠুয়া, দড়িরচর খাজুরিয়া, আদর্শ নগর, আন্দারমানিক, জাঙ্গালিয়া ও দক্ষিণ উলানিয়াসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। নদীতীরবর্তী এসব এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। একদিকে বসতভিটা হারানোর ভয়, অন্যদিকে জীবিকা ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

শুধু মেহেন্দিগঞ্জ নয়, বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলাতেও সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে বিপর্যস্ত জনজীবন। এসব নদীর ভাঙনে সড়ক, বেড়িবাঁধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, কবরস্থান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ শতাধিক বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। 

এই উপজেলার মীরগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় ভাঙনের কারণে একাধিক গ্রাম হুমকির মুখে পড়েছে। কোথাও কোথাও বসতঘর সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছেন বাসিন্দারা। বাবুগঞ্জের ক্ষদ্রকাঠী গ্রামের নদী ভাঙন বরিশাল এয়ারপোর্টের দক্ষিণ পাশের নিরাপত্তা ওয়ালের প্রায় ৬ শত মিটারের কাছাকাছি চলে এসেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 

বানারীপাড়া উপজেলার ইলুহার এলাকার বাসিন্দা জয় হাজরার জীবনের গল্প নদীভাঙনের নির্মম বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে তাদের পরিবারের বাপ-দাদার সব সম্পত্তি বিলীন হয়ে গেছে। টিকে থাকার তাগিদে বারবার বসতবাড়ি সরাতে হয়েছে।

জয় হাজরা বলেন, সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে বাপ-দাদার সব সম্পত্তি চলে গেছে। গত পাঁচ বছরে আমাদের পরিবার পাঁচবার বসতবাড়ি সরিয়েছে। যে পরিস্থিতি, তাতে হয়তো এখন যেখানে আছি, সেটি এ বছর টিকে গেলেও আগামী বছর আর টিকবে কি না, জানি না।

বানারীপাড়ায় নদীভাঙনের তীব্রতা আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। বসতভিটা হারানোর পাশাপাশি তাদের অনেকের কৃষিজমি ও জীবিকার অবলম্বনও হারিয়ে যাচ্ছে।

বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়ীয়া, চরমোনাই ও শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায়ও নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। গত দেড় দশকে চরবাড়ীয়া ইউনিয়নের লামচরী গ্রামের কয়েক শ পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়েছে। একসময় যে জায়গায় ছিল মানুষের বসতি, সেখানে এখন নদীর পানি বিরাজমান রয়েছে। 

শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা করিম হাওলাদার বলেন, ফসলি জমি ও ভিটেমাটি-সবই নদীর ভাঙনে চলে গেছে। ভাঙন শুরু হলে সহজে থামতে চায় না। আমাদের অবস্থা এখন খুবই খারাপ।

রাতের আধাঁরে হারিয়ে যায় শেষ আশ্রয়

নদীভাঙন কখনো কখনো এত দ্রুত ঘটে যে, বাসিন্দারা নিজেদের জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পান না। বিশেষ করে রাতে ভাঙন শুরু হলে বিপদের মাত্রা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। ঘুমন্ত মানুষ বুঝে ওঠার আগেই হুমকির মুখে পড়ে তাদের জীবন ও বসতভিটা।

মুলাদী উপজেলার কৃষক আবুল ফজলের অভিজ্ঞতাও তেমনই। চোখের সামনে নিজের বসতভিটা নদীতে বিলীন হতে দেখেছেন তিনি। তিনি জানান, ভাঙনের ভয়াবহতা এতটাই আকস্মিক ছিল যে, আগে থেকে কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ পাননি।

আবুল ফজল বলেন, চোখের সামনে নিজের বসতভিটা ভাঙনে চলে গেছে। ভোররাতে যদি টের না পেতাম, তাহলে হয়তো আমরাও আর বেঁচে ফিরতে পারতাম না। রাতে হঠাৎ এত বেশি ভাঙন শুরু হয়েছিল, কিছু বুঝে উঠতে পারিনি।

হিজলা উপজেলার স্কুলশিক্ষক জয়নাল মৃধা জানান, এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে বরিশালের মানচিত্রই একসময় বদলে যাবে। প্রতিনিয়ত মানুষ ভিটেমাটি হারাচ্ছেন, হারাচ্ছেন নিজেদের পরিচিত জনপদ ও দীর্ঘদিনের স্মৃতি। যেভাবে ভাঙন চলছে, তাতে বরিশালের মানচিত্র দিন দিন বদলে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ ভিটেমাটি হারাচ্ছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উচিত, ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া।

৬০ কিলোমিটারজুড়ে ভাঙন, স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষা

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বরিশালে ৩৮টি নদ-নদী রয়েছে। এসব নদ-নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭১৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, সন্ধ্যা ও সুগন্ধাসহ ৮ নদীর প্রায় ৬০ কিলোমিটার অংশে বর্তমানে ভাঙন চলছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেশি।

নদীভাঙন মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কিছু এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে নদীতীরবর্তী মানুষের দাবি, বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক উদ্যোগের পাশাপাশি ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বলেন, বর্ষাকাল হওয়ায় জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন চলছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেশি। এসব এলাকায় জরুরি আপৎকালীন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ে আমাদের একটি প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া আছে। সেটি অনুমোদিত হলে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে কাজ করা যাবে।

তবে প্রকল্প অনুমোদন ও স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা নদীতীরবর্তী মানুষের কাছে প্রতিটি দিনই আতঙ্কের। তাদের ভয়, নতুন করে ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই হয়তো হারিয়ে যাবে আরেকটি বাড়ি, আরেকটি গ্রাম কিংবা বহু মানুষের দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত কোনো জনপদ।

নদীর ভাঙনে শুধু জমির সীমানা বদলায় না, বদলে যায় মানুষের জীবনও। বসতভিটা হারানো পরিবারগুলোর কাছে নদীভাঙন মানে শুধু ঘর হারানো নয়, বরং জীবিকা, নিরাপত্তা ও শেকড় হারানোর বেদনা। 

সাময়িক প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে দ্রুত কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে আর কাউকে বারবার ঘর সরিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ছুটতে না হয় সেই প্রত্যাশায় প্রহর গুনছেন বরিশালের নদীতীরবর্তী মানুষ।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :