​রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ

আপলোড সময় : ০৮-১০-২০২৬ ১২:৩১:২৬ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৮-১০-২০২৬ ১২:৩১:২৬ অপরাহ্ন
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট। এখন কেবল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) অনুমতির অপেক্ষা। অনুমতি মিললেই রিঅ্যাক্টরে শুরু হবে স্থিতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন, যা ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ নামে পরিচিত। এরপর ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের পথে এগোবে প্রকল্পটি।

আগামী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। 

বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে তারা এ তথ্য জানান।

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি পরীক্ষাগুলো ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম ধাপে ১৬ দশমিক ১ এমপিএ (মেগাপ্যাসকেল) পরিচালন চাপ ও ২৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রেখে ১২টি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়।

পরবর্তী ধাপে ১৮ দশমিক ৬৫ এমপিএ চাপের পরীক্ষায় শুরুতে কিছু সমস্যা দেখা দিলেও পরে তা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র জানায়, প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ (এমসিআর) ও জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ (ইসিআর)—দুই জায়গা থেকেই পরীক্ষাগুলো পরিচালনা করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথম ইউনিটের চাপ নিয়ন্ত্রণ ও অতিরিক্ত চাপ কমানোর ব্যবস্থা যাচাই করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন ভালভ খোলা ও বন্ধ হওয়ার সময়, সাড়া দেওয়ার গতি, সতর্কসংকেত এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় চাপ ও তাপমাত্রার তথ্যও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

এখন রূপপুর প্রকল্পের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ ধাপ শুরু করতে বায়রার অনুমতি প্রয়োজন।

অনুমতি পাওয়ার পর রিঅ্যাক্টরে একটি স্থিতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হবে। এর মধ্য দিয়ে রিঅ্যাক্টর স্থির অবস্থা থেকে সক্রিয় অপারেশনাল পারমাণবিক স্থাপনায় রূপান্তরের আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রবেশ করবে।

পরমাণু বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরকে তার পূর্ণ নির্ধারিত তাপীয় ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিস্তরে পরিচালনা করে প্রাথমিক ক্রিটিক্যালিটিতে নেওয়া হবে। এ পর্যায়েই শুরু হবে প্রথম স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন বা ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি।

এ সময় রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ পরামিতি, বিভিন্ন সিস্টেম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করা হবে। ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটিসহ পুরো ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে।

পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো হবে।

ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ শেষ হলে প্রকল্পটি প্রবেশ করবে ‘পাওয়ার স্টার্ট-আপ’ পর্যায়ে। এ ধাপে ধীরে ধীরে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো, টারবাইনের সঙ্গে সমন্বয় এবং শেষ পর্যন্ত জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করার কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

এ জন্য অপারেটিং অর্গানাইজেশনকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্স নিতে হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় গ্রিডে সংযোগ দেওয়ার আগে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩ শতাংশে নেওয়া হবে। এরপর ধাপে ধাপে তা ২০ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এ পর্যায়ে নিরাপদভাবে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।

পাওয়ার স্টার্ট-আপ পর্যায়ে প্রযুক্তিগত ও সাংগঠনিক—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভ্যন্তরে রিঅ্যাক্টর, টারবাইন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে তাৎক্ষণিক ও অত্যন্ত সমন্বিত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে কেন্দ্রের বাইরের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গেও কঠোর, নিয়ন্ত্রিত ও প্রযুক্তিগত সমন্বয় প্রয়োজন হবে।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড-সংশ্লিষ্ট সংস্থা, সামরিক বাহিনী, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, নিউক্লিয়ার ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট সংস্থা এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম ইউনিটকে নিরাপদভাবে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার পর উৎপাদন ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। উৎপাদন শুরু হওয়ার পর টানা ৭ থেকে ৮ মাস পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলতে পারে।

জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে যুক্ত হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রসঙ্গত, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের মেয়াদ প্রথমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। পরে দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লেও ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ নেই। তবে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। বর্তমানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচকে/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :