রাতভর পাহাড় সাবাড়, মাটি যাচ্ছে সরকারি প্রকল্পে

আপলোড সময় : ০৪-১০-২০২৬ ১১:৫৮:২৯ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৪-১০-২০২৬ ১১:৫৮:২৯ পূর্বাহ্ন
প্রশাসনের দেওয়া সেই অনুমতির আড়ালে বড় এক্সকাভেটর দিয়ে রাতভর পাহাড় কেটে ট্রাকযোগে লাল মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে স্থানীয় একটি সরকারি প্রকল্পের নির্মাণকাজে। অন্যদিকে পাহাড় কাটার ফলে উঁচুতে থাকা আশপাশের বাড়িঘর ধসে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ ঘটনায় প্রশাসনের অনুমতি দেওয়ার যৌক্তিকতা এবং অনুমতির শর্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি হলেও পাহাড় কেটে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি করার সুযোগ আইনে নেই।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপাড়া ইউনিয়নের আইনগাঁও এলাকায় বসতবাড়ি নির্মাণের কথা উল্লেখ করে রুনু বেগম নামে এক নারীর নামে ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি থেকে মাটি কাটার জন্য আবেদন করা হয়। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ সেপ্টেম্বর নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জেরিন স্বাক্ষরিত একটি পত্রে বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি থেকে সীমিত পরিসরে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়। অনুমতিপত্রে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর সংশ্লিষ্ট বিধানের আওতায় মাটি উত্তোলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আইনটির ৭(ক) ধারায় ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থেকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এ অনুমতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বসতবাড়ি নির্মাণের প্রয়োজনের তুলনায় বাণিজ্যিকভাবে অনেক বেশি পরিমাণ মাটি কাটা হচ্ছে। বড় আকারের এক্সকাভেটর দিয়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ফুট উচ্চতার একটি পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে পাহাড়ের প্রাকৃতিক আকৃতি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের উঁচু অংশ কেটে নেওয়ায় আশপাশের বাড়িঘর ধসে পড়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাত থেকে আইনগাঁও গ্রামের সায়েম আহমদসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র ভেকু মেশিন দিয়ে পাহাড় কাটার কাজ শুরু করে। পরে শুক্রবার ও শনিবার রাতভর ভেকু দিয়ে পাহাড়ের লাল মাটি কেটে ট্রাকযোগে সরিয়ে নেওয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব মাটি আইনগাঁও এলাকায় নির্মাণাধীন বিবিয়ানা ২৩০/১৩২/৩৩ কেভি জিআইএস উপকেন্দ্রের ভরাট কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। 

আইনগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘গ্রামের প্রভাবশালীরা রুনু বেগমের নামে অনুমতি এনে , সালেহ, শায়েম, আউয়াল, আশরাফ আলীর তত্ত্বাবধানে স্থানীয় সংঘবদ্ধ চক্র এই পাহাড় থেকে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কাটছে। পরে ট্রাকভর্তি মাটি বিক্রি করা হচ্ছে পার্শ্ববর্তী বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছে। আমাদের রাস্তাঘাট সব ভেঙে গেছে। আমরা প্রতিবাদ করলে তারা শুনছে না। আমাদের মারধরের হুমকি দিচ্ছে।’

এদিকে দিনারপুরের পাহাড়ি এলাকায় নির্বিচারে মাটি কাটার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন—বাপা হবিগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি তোফাজ্জল সোহেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা হলেও পাহাড় কেটে পরিবেশ ও প্রতিবেশ ধ্বংস করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সীমিত আকারে পাহাড়-টিলা কাটার যে অনুমতি দিয়েছে, সেই ক্ষেত্রে পাহাড়-টিলা যারা কাটে, তাদের জন্য একটি বৈধতা তৈরি হলো। এতে আরও বেশি সুযোগ তৈরি হলো পাহাড় ও টিলা কেটে সমান্তরাল করার।’

তোফাজ্জল বলেন, ‘পাহাড় ও টিলা আমাদের প্রতিবেশ ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত ২০ বছর ধরে নবীগঞ্জ এলাকায় এক শ্রেণির অসাধু লোকজন পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান যে পাহাড় কাটার অনুমতি দিয়েছে এবং পাহাড় কাটার যে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, সেটি খুবই নিন্দনীয়। আইনগাঁও এলাকায় পাহাড় কেটে মাটি বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় প্রশাসনের অনুমতি পরিবেশ ধ্বংসের বৈধতা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।’

গজনাইপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের কায়েদ বলেন, ‘রাতের আঁধারে পাহাড় কাটা ভয়ঙ্কর জিনিস। যারা পাহাড় কাটছে, তারা হলো রাজু, সালেহ, শায়েম, আউয়াল। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কাটছে তারা। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা আছে। এদের বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা না নিলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।’

নবীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনিরুদ্ধ দেব রায় বলেন, ‘পাহাড় কাটার অভিযোগ পেয়ে কাজ বন্ধ রাখতে বলেছি। রুনু বেগম যদি বাড়ি নির্মাণে অনুমতি নিয়ে মিস ইউজ করেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাকে পাহাড় কাটার অনুমতি দেওয়া হয়নি।’

এ বিষয়ে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জেরিন বলেন, ‘এক নারী বাড়ি তৈরির জন্য কিছু মাটি কাটার আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের পক্ষ থেকে সীমিত আকারে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এখন জানতে পেরেছি, অনুমতির নামে তারা পাহাড় কাটছে। এ ঘটনা জানার পর মাটি কাটা বন্ধ রাখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদি আমাদের অনুমতির বাইরে গিয়ে কোনও কাজ করে থাকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

তিনি বলেন, ‘টিলা বা পাহাড় কাটার অনুমতি দেওয়ার অধিকার নেই আমাদের। সরজমিন তদন্ত করে যথাযত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার অনুমতিপত্র স্থগিত করা হয়েছে, তাকে কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। এরপরও কাজ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :