​লালমনিরহাটে ১৬ নদীর ১৪টিই অস্তিত্ব সংকটে

আপলোড সময় : ০২-১০-২০২৬ ০৫:২৩:০৩ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০২-১০-২০২৬ ০৫:২৩:০৩ অপরাহ্ন
২০২৫ সালে বাংলাদেশ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তালিকা অনুযায়ী লালমনিরহাট জেলায় নদীর সংখ্যা ১৬টি। এর মধ্যে তিস্তা ও ধরলা নদীর অস্তিত্ব দৃশ্যমান থাকলেও বাকি ১৪টি নদী অস্তিত্ব হয়ে পড়েছে চরম সংকটে। দখল, দূষণ, পলি জমে ভরাট, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় এসব নদীর অনেকটাই এখন ছোট খাল বা নালায় পরিণত হয়েছে।

সংকটাপন্ন নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে—গিদারি, চেনাকাটা, টেংরামারী, মরাসতী, রত্নাই, ভাটেশ্বরী, স্বর্ণামতী, সতী, সানিয়াজান, সিংগীমারী, কোটেশ্বর, খাটুমারা, সাঙ্গুলী ও খেংটি।

এ ছাড়া লালমনিরহাটের তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান, গিদারি, টেংরামারী, সাঙ্গুলী, খেংটি ও মালদহ নদীর সঙ্গে ভারতের আন্তসীমান্ত সংযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বছরের পর বছর ময়লা-আবর্জনা ও কচুরিপানা জমে অনেক নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও অবৈধভাবে বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। আবার নদীর তীর ও তলদেশ দখল করে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা। পলি জমে নদী ভরাট হওয়া, উজান থেকে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং স্থানীয়ভাবে অবৈধ দখলের কারণে নদীগুলো ক্রমেই অস্তিত্ব হারাচ্ছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন সমীক্ষাতেও জেলার নদীগুলোর নাজুক পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে।

লালমনিরহাটের প্রধান নদী তিস্তাও নানা সংকটে রয়েছে। উজানে পানি প্রত্যাহার, নদীর তলদেশে পলি জমে ভরাট হওয়া এবং পানিপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে তিস্তার স্বাভাবিক গতিপথ ও নাব্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্ষায় অল্প সময়ের পানির চাপে নদীর দুই পাড়ে দেখা দেয় ভাঙন ও বন্যা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন নদীপাড়ের মানুষ ও কৃষকেরা।

তিস্তা নদীর ভাঙন ও বন্যা থেকে রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে একটি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন তিস্তাপারের মানুষ। তবে এখনো সেই মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হয়নি। ফলে নদী ও নদীপাড়ের মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

তিস্তার একটি আন্তঃশাখা নদী সতী। হাতীবান্ধা উপজেলার পারুলিয়া এলাকায় তিস্তা থেকে উৎপন্ন হয়ে নদীটি আদিতমারী উপজেলা হয়ে সদর উপজেলার দিকে প্রবাহিত হয়ে আবার তিস্তায় মিলিত হয়েছে।

একসময় নদীটির গড় প্রস্থ ছিল প্রায় ৫০০ ফুট। কিন্তু দখলের কারণে লালমনিরহাট শহরের বাসস্ট্যান্ডের কিছুটা উজানে নদীটি সংকুচিত হয়ে কোথাও কোথাও মাত্র ৫ থেকে ৭ ফুটে দাঁড়িয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

দখল ও ভরাটের কারণে মৃত্যুর মুখে থাকা নদীটি দ্রুত উদ্ধার ও পুনঃখনন করা না হলে এর স্বাভাবিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

পাটগ্রাম উপজেলার সিংগীমারী নদীর অবস্থাও সংকটাপন্ন। পাটগ্রাম বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় নদীর বিভিন্ন অংশে জমেছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। একই সঙ্গে নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা গড়ে ওঠায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে নদীর প্রবাহপথ।

বুড়িমারী স্থলবন্দরের দিকে যাওয়ার পথে কয়েক কিলোমিটার সড়ক নদীটির পাশ দিয়ে চলে গেছে। নদীটির এক তীরে ভারতীয় সীমান্ত ও চা-বাগান রয়েছে। পাটগ্রাম বাসস্ট্যান্ডের কাছে নদীর বড় একটি অংশ দখল হয়ে গেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয়রা জানান, পুরোনো দখলের পাশাপাশি নতুন করে নদীর জায়গা দখলের প্রবণতাও রয়েছে। নদীর ভেতর ও তীরে ফেলা ময়লা-আবর্জনা ধীরে ধীরে ভরাট হচ্ছে। পরে ভরাট হওয়া অংশও দখল হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চললেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় নদীটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

লালমনিরহাটের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী ধরলা। নদীটিতে প্রতিবছর ভাঙনের ঘটনা ঘটে। ধরলা নদী বাংলাদেশে দুই দফায় প্রবেশ করেছে। বুড়িমারী স্থলবন্দরের পাশ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর নদীটি আবার ভারতে চলে গেছে। পরে পাটগ্রাম দিয়ে পুনরায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে কুড়িগ্রাম জেলার মধ্য দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

ধরলা নদীর সঙ্গে জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরও যোগ রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে এ নদীর ওপর দিয়ে রেল যোগাযোগ ছিল। এখনো লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট এলাকায় ধরলাপাড়ে পুরোনো রেলস্টেশনের চিহ্ন রয়েছে। সীমান্তের ওপারে পুরোনো রেলসেতুটিও নদীপাড়ের মানুষের কাছে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।

জেলার সংকটাপন্ন নদীগুলো রক্ষায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় পরিবেশবাদীরা।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, নদীর জমির ব্যক্তি মালিকানা থাকার সুযোগ নেই। কোনোভাবে ব্যক্তিমালিকানা তৈরি হয়ে থাকলে তা বাতিল করা এবং নদীর জমির খাজনা-খারিজ বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে দখল হওয়া নদীর জায়গা উদ্ধারে স্থানীয় নদী রক্ষা কমিটিকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ও লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক প্রধান বলেন, নদীগুলো দখলমুক্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সংকটাপন্ন নদীগুলো পরিষ্কার ও পুনঃখননের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এইচকে/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :