একসময় ছিল নিত্যদিনের খাবার,

আবারও নতুন করে পুষ্টির আলোচনায় সেই মিলেট

আপলোড সময় : ২৭-০৯-২০২৬ ০৫:০৯:১৭ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৭-০৯-২০২৬ ০৫:২৫:২৯ অপরাহ্ন
একসময় গ্রামের মানুষের রান্নাঘরে চাল-গমের পাশাপাশি নিয়মিত দেখা মিলত নানা ধরনের ছোট দানার শস্যের। জোয়ার, বাজরা, কাউন, চিনা, শ্যামা কিংবা রাগির মতো শস্য ছিল বহু মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যের অংশ। সময়ের সঙ্গে ধান ও গমের আধিপত্য বাড়ায় এসব শস্য ধীরে ধীরে মানুষের খাদ্যতালিকা থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। তবে পুষ্টিগুণ ও জলবায়ু সহনশীলতার কারণে হারিয়ে যাওয়া সেই মিলেটই এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

মিলেট মূলত ছোট দানার বিভিন্ন শস্যের একটি গোষ্ঠী। বাংলাদেশে কাউন, চিনা, বাজরা ও অন্যান্য স্থানীয় ক্ষুদ্র দানার শস্য চাষের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল, চরাঞ্চল ও অপেক্ষাকৃত শুষ্ক এলাকায় এসব শস্য মানুষের খাদ্য ও কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।

বাঙালির পুরোনো খাদ্যসংস্কৃতিতে মিলেট

ধানভিত্তিক খাদ্যসংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মিলেটজাতীয় শস্যের চাষ ও ব্যবহার ছিল। বাংলার গ্রামীণ সমাজেও কাউন বা চিনার মতো শস্য দিয়ে ভাত, খিচুড়ি, পায়েসসহ নানা ধরনের খাবার তৈরির প্রচলন ছিল।

বয়স্ক গ্রামবাসীদের অনেকের স্মৃতিতে এখনো রয়েছে কাউনের ভাত কিংবা কাউনের পায়েসের কথা। অভাবের সময়ে এসব শস্য ছিল পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভরসা। কোথাও ধানের সঙ্গে মিশিয়ে, আবার কোথাও আলাদাভাবে এসব শস্য রান্না করা হতো।

শুধু খাবার নয়, গ্রামীণ জীবনযাত্রা ও ঋতুভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গেও এসব শস্যের সম্পর্ক ছিল। নতুন ধান ঘরে ওঠার আগের সময় কিংবা ধান উৎপাদন কঠিন এমন এলাকায় স্বল্পমেয়াদি ক্ষুদ্র শস্য মানুষের খাদ্যের জোগান দিত।

কেন হারিয়ে গেল ঐতিহ্যবাহী শস্য

কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের পর ধান ও গমের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আসে। সাদা চাল ও পরিশোধিত গমের তৈরি খাবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে অনেক স্থানীয় কৃষক মিলেটের চাষ কমিয়ে ধান, গমসহ তুলনামূলক বেশি বাজারমূল্যের ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

শহরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা এবং বাজারব্যবস্থার পরিবর্তনও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ফলে একসময় যে শস্য স্থানীয় বাজারে সহজেই পাওয়া যেত, সেটিই ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকা থেকে হারিয়ে যায়।

পুষ্টিগুণে আবারও আলোচনায়

মিলেট নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরির অন্যতম কারণ এর পুষ্টিগুণ। বিভিন্ন ধরনের মিলেটে খাদ্যআঁশ, প্রোটিন, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাসসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। তবে কোন ধরনের মিলেটে কোন পুষ্টি উপাদান কত পরিমাণে রয়েছে, তা শস্যের ধরন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর নির্ভর করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যতালিকায় একাধিক ধরনের পূর্ণ শস্য রাখা বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তবে মিলেটকে কোনো রোগের ‘ওষুধ’ বা এককভাবে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কৃষিতেও সম্ভাবনাময়

মিলেটের প্রতি আগ্রহ শুধু পুষ্টির কারণে নয়, কৃষির কারণেও বাড়ছে। অনেক ধরনের মিলেট তুলনামূলক কম পানিতে এবং প্রতিকূল পরিবেশেও চাষ করা যায়। এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কৃষিতে বৈচিত্র্য বাড়ানোর আলোচনায় এসব শস্য গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশেষ করে খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কিংবা কম উর্বর জমিতে উপযোগী ফসল হিসেবে বিভিন্ন মিলেট নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গবেষণা ও চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার সুযোগ

বাংলাদেশে মিলেটের ব্যবহার এখনো তুলনামূলক সীমিত। তবে পুরোনো খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে এর গভীর যোগসূত্র রয়েছে। স্থানীয় জাত সংরক্ষণ, কৃষকদের উৎসাহিত করা, বাজার তৈরি এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারকে নতুনভাবে জনপ্রিয় করা গেলে হারিয়ে যাওয়া এসব শস্য আবারও খাদ্যতালিকায় জায়গা করে নিতে পারে।

পুষ্টিবিদ ও কৃষিবিদদের মতে, খাদ্যনিরাপত্তা শুধু বেশি ধান উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষিতে বৈচিত্র্য এবং মানুষের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকেই পুরোনো মিলেট নতুন করে গুরুত্ব পেতে পারে।

একসময় যে শস্য ছিল গ্রামের সাধারণ মানুষের খাবারের অংশ, আধুনিক সময়ে সেটিই ফিরে আসছে পুষ্টিকর ও টেকসই খাদ্যের আলোচনায়। তবে মিলেটের এই প্রত্যাবর্তন কেবল নতুন কোনো খাদ্যপ্রবণতা নয়, বরং হারিয়ে যেতে বসা স্থানীয় খাদ্যঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ারও একটি সুযোগ।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচকে/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :