জাতিসংঘে চার দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে একটি ঐতিহাসিক ভাষণের পাশাপাশি ৬টি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ও ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
সার্বিকভাবে এই সফর বাংলাদেশের জন্য এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক সাফল্য বয়ে এনেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, দীর্ঘ সময় পর একটি গণতান্ত্রিক ও জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার এই নেতৃত্ব বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমাদৃত ও প্রশংসিত হয়েছে।
শুক্রবার নিউইয়র্ক সময় বিকাল ৫টায় (বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর রাত ৩টায়) ‘জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে’ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মাহদী আমিন একথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ, বিশ্বমঞ্চে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের তাৎপর্য ও নিউইয়র্ক সফরের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে এই প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এই সফরে প্রধানমন্ত্রী গত চার দিনে মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান আটটিসহ সরকারি প্রতিনিধিদল আরও প্রায় ৫০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে বাংলাদেশ মোট ৮০টির মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে দেশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে।
মাহদী আমিন বলেন, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোট সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন। এর মধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে প্রদান করেন একটি ঐতিহাসিক ভাষণ। এছাড়া সাইড লাইনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোতে চারটি, শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে একটি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে একটি বক্তব্য রাখেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, জাতিসংঘ কেন্দ্রিক প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ত সময়সূচিকে মূলত কয়েকটি ভাগে দেখা যায়। প্রথমত, সাধারণ পরিষদের মূল ধারার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত আটটি কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য প্রদান, জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রাতরাশ অনুষ্ঠান এবং উদ্বোধনী অধিবেশন। এছাড়া জাতিসংঘ সম্মেলনস্থলের বাইরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও তিনি সস্ত্রীক অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট চারটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব কর্মসূচির চারটিতেই বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে দুটি বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিয়ে যৌথভাবে আয়োজন করে, যার একটি ছিল রোহিঙ্গা সংকট এবং অন্যটি স্বাস্থ্যসেবা খাতে ধাত্রী বা মিডওয়াইফদের সংখ্যা বৃদ্ধি সংক্রান্ত। এসব ইভেন্টে বিশ্বনেতারা অংশ নেন। এছাড়া জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায্য রূপান্তর এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শীর্ষক বাকি দুটি উচ্চপর্যায়ের ইভেন্টেও বাংলাদেশের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, তৃতীয়ত, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিবিড় আলোচনা হয়েছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে মালদ্বীপ, ভুটান, হাইতি, তুরস্ক, ক্রোয়েশিয়া, ইরান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত-এই ১১টি দেশের শীর্ষ নেতাদের সাথে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সাথে বৈঠকে মুসলিম উম্মাহর মধ্যকার দীর্ঘদিনের এই সুসম্পর্ককে আরও গভীর করে জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়।
দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বাইরেও প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে পাঁচটি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে আরও ছয়টি বৈঠক করেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব, জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি বোয়িং গ্লোবাল, গেটস ফাউন্ডেশন, ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারী, ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউট এবং স্থানীয় প্রবাসী কমিউনিটির সাথেও প্রধানমন্ত্রীর ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও জাতিসংঘে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, স্বনামধন্য এই চিকিৎসক মোট আটটি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং এর চারটিতে বক্তব্য রাখেন। জাতিসংঘের নারী নেত্রীদের প্ল্যাটফর্মের বার্ষিক অধিবেশন, বিশ্ব ফার্স্ট স্পাউস সংলাপ এবং মাতৃমৃত্যু হ্রাস সংক্রান্ত মিডওয়াইফারি ইভেন্টে ওনার বক্তব্য বিশ্বনেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের জীবনসঙ্গীদের ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে। সফরকালে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গেও অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে কুশল বিনিময় করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের চার দিনের সফর শেষে আজ রাতে দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী। মাহ্দী আমিন বলেন, সফরে তার নির্দেশনায় খুব ছোট একটি প্রতিনিধিদল পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তি ও শিক্ষা খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে ক্যালিফোর্নিয়া যাবে। সফরের শেষ দিনেও প্রধানমন্ত্রী দিনভর ব্যস্ত সূচি পার করেছেন।
সফরের শেষ দিনের কর্মব্যস্ততার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, জাতিসংঘ সফরের শেষ দিনে সকালেই এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সাধারণ প্রথা ভেঙে নীতি-নির্ধারকদের বাইরে গিয়ে বিশ্বখ্যাত জেপি মর্গান চেস আয়োজিত ‘ব্রেকফাস্ট মিটিং উইথ ওয়াল স্ট্রিট’ শীর্ষক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বের প্রথম সারির প্রায় ২০টি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সাথে তিনি অংশ নেন। আমেরিকান বেসরকারি খাত আয়োজিত এই খোলামেলা আলোচনায় বাংলাদেশের বিশেষ করে আর্থিক খাতে কীভাবে মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা যায়, সে বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।
শেষ দিনের কর্মব্যস্ততা প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন আরো জানান, এরপর বিশ্বজুড়ে শান্তি, মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে কাজ করা ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের (আইপিআই) প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর শান্তির বার্তার কথা স্মরণ করে আইপিআই বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে স্বাগত জানায়। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি গণতান্ত্রিক সরকার কীভাবে নেতৃত্ব দিতে পারে, সে বিষয়ে সংস্থাটটি আশা প্রকাশ করে।
পরবর্তী সূচিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র। তিনি বলেন, গুম, খুন, হামলা, মামলা ও বাকস্বাধীনতাহরণের বিরুদ্ধে বিগত দিনে কমিশনের ভূমিকার কথা স্মরণ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী ও গণতন্ত্রকামী মানুষের পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে সত্য ও ন্যায্যতাকে বিশ্ব মানচিত্রে তুলে ধরায় নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারকে অভিনন্দন জানায় মানবাধিকার কমিশন। মাহ্দী আমিন উল্লেখ করেন, সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়া দল বিএনপি যেহেতু আজ রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, তাই সব শহীদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের মানবাধিকার, আইনের শাসন ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে পুনর্নির্মাণ করা হবে।
সফরের শেষ মুহূর্তেও প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী কমিউনিটি নেতাদের সাথে কুশল বিনিময় করেন জানিয়ে মাহদী আমিন জানান, এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের তিন প্রভাবশালী দেশ কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তিনটি দেশ থেকেই প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এসব বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জ্বালানি ও খনিজ খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে যৌথ বিনিয়োগের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয় বলে জানান মাহদী আমিন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র তিনি বলেন, আমরা দেখেছি বিশ্বের প্রতিটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা অপরিসীম শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে গ্রহণ করেছে। কারণ ওনার ক্ষমতার মূল উৎসই হচ্ছে দেশের জনগণ। তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘে দেওয়া গতকালের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী কেবল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখাই তুলে ধরেননি, বরং সারা বিশ্বে কীভাবে শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবতা প্রতিষ্ঠা করা যায়, তার একটি বলিষ্ঠ বৈশ্বিক দর্শন উপস্থাপন করেছেন। তাঁর এই দূরদর্শী বক্তব্য বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের এই ইতিবাচক ধারা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য নেতৃত্বে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় ও মর্যাদাপূর্ণ হবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে, যেখানে জনগণের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকবে।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি একেএম ওয়াহিদুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনিসহ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সদস্যবৃন্দ ও জাতিসংঘ মিশনের কর্মকর্তারা।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
সার্বিকভাবে এই সফর বাংলাদেশের জন্য এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক সাফল্য বয়ে এনেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, দীর্ঘ সময় পর একটি গণতান্ত্রিক ও জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার এই নেতৃত্ব বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমাদৃত ও প্রশংসিত হয়েছে।
শুক্রবার নিউইয়র্ক সময় বিকাল ৫টায় (বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর রাত ৩টায়) ‘জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে’ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মাহদী আমিন একথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ, বিশ্বমঞ্চে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের তাৎপর্য ও নিউইয়র্ক সফরের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে এই প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এই সফরে প্রধানমন্ত্রী গত চার দিনে মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান আটটিসহ সরকারি প্রতিনিধিদল আরও প্রায় ৫০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে বাংলাদেশ মোট ৮০টির মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে দেশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে।
মাহদী আমিন বলেন, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোট সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন। এর মধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে প্রদান করেন একটি ঐতিহাসিক ভাষণ। এছাড়া সাইড লাইনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোতে চারটি, শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে একটি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে একটি বক্তব্য রাখেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, জাতিসংঘ কেন্দ্রিক প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ত সময়সূচিকে মূলত কয়েকটি ভাগে দেখা যায়। প্রথমত, সাধারণ পরিষদের মূল ধারার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত আটটি কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য প্রদান, জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রাতরাশ অনুষ্ঠান এবং উদ্বোধনী অধিবেশন। এছাড়া জাতিসংঘ সম্মেলনস্থলের বাইরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও তিনি সস্ত্রীক অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট চারটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব কর্মসূচির চারটিতেই বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে দুটি বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিয়ে যৌথভাবে আয়োজন করে, যার একটি ছিল রোহিঙ্গা সংকট এবং অন্যটি স্বাস্থ্যসেবা খাতে ধাত্রী বা মিডওয়াইফদের সংখ্যা বৃদ্ধি সংক্রান্ত। এসব ইভেন্টে বিশ্বনেতারা অংশ নেন। এছাড়া জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায্য রূপান্তর এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শীর্ষক বাকি দুটি উচ্চপর্যায়ের ইভেন্টেও বাংলাদেশের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, তৃতীয়ত, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিবিড় আলোচনা হয়েছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে মালদ্বীপ, ভুটান, হাইতি, তুরস্ক, ক্রোয়েশিয়া, ইরান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত-এই ১১টি দেশের শীর্ষ নেতাদের সাথে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সাথে বৈঠকে মুসলিম উম্মাহর মধ্যকার দীর্ঘদিনের এই সুসম্পর্ককে আরও গভীর করে জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়।
দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বাইরেও প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে পাঁচটি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে আরও ছয়টি বৈঠক করেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব, জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি বোয়িং গ্লোবাল, গেটস ফাউন্ডেশন, ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারী, ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউট এবং স্থানীয় প্রবাসী কমিউনিটির সাথেও প্রধানমন্ত্রীর ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও জাতিসংঘে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, স্বনামধন্য এই চিকিৎসক মোট আটটি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং এর চারটিতে বক্তব্য রাখেন। জাতিসংঘের নারী নেত্রীদের প্ল্যাটফর্মের বার্ষিক অধিবেশন, বিশ্ব ফার্স্ট স্পাউস সংলাপ এবং মাতৃমৃত্যু হ্রাস সংক্রান্ত মিডওয়াইফারি ইভেন্টে ওনার বক্তব্য বিশ্বনেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের জীবনসঙ্গীদের ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে। সফরকালে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গেও অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে কুশল বিনিময় করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের চার দিনের সফর শেষে আজ রাতে দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী। মাহ্দী আমিন বলেন, সফরে তার নির্দেশনায় খুব ছোট একটি প্রতিনিধিদল পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তি ও শিক্ষা খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে ক্যালিফোর্নিয়া যাবে। সফরের শেষ দিনেও প্রধানমন্ত্রী দিনভর ব্যস্ত সূচি পার করেছেন।
সফরের শেষ দিনের কর্মব্যস্ততার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, জাতিসংঘ সফরের শেষ দিনে সকালেই এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সাধারণ প্রথা ভেঙে নীতি-নির্ধারকদের বাইরে গিয়ে বিশ্বখ্যাত জেপি মর্গান চেস আয়োজিত ‘ব্রেকফাস্ট মিটিং উইথ ওয়াল স্ট্রিট’ শীর্ষক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বের প্রথম সারির প্রায় ২০টি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সাথে তিনি অংশ নেন। আমেরিকান বেসরকারি খাত আয়োজিত এই খোলামেলা আলোচনায় বাংলাদেশের বিশেষ করে আর্থিক খাতে কীভাবে মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা যায়, সে বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।
শেষ দিনের কর্মব্যস্ততা প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন আরো জানান, এরপর বিশ্বজুড়ে শান্তি, মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে কাজ করা ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের (আইপিআই) প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর শান্তির বার্তার কথা স্মরণ করে আইপিআই বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে স্বাগত জানায়। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি গণতান্ত্রিক সরকার কীভাবে নেতৃত্ব দিতে পারে, সে বিষয়ে সংস্থাটটি আশা প্রকাশ করে।
পরবর্তী সূচিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র। তিনি বলেন, গুম, খুন, হামলা, মামলা ও বাকস্বাধীনতাহরণের বিরুদ্ধে বিগত দিনে কমিশনের ভূমিকার কথা স্মরণ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী ও গণতন্ত্রকামী মানুষের পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে সত্য ও ন্যায্যতাকে বিশ্ব মানচিত্রে তুলে ধরায় নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারকে অভিনন্দন জানায় মানবাধিকার কমিশন। মাহ্দী আমিন উল্লেখ করেন, সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়া দল বিএনপি যেহেতু আজ রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, তাই সব শহীদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের মানবাধিকার, আইনের শাসন ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে পুনর্নির্মাণ করা হবে।
সফরের শেষ মুহূর্তেও প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী কমিউনিটি নেতাদের সাথে কুশল বিনিময় করেন জানিয়ে মাহদী আমিন জানান, এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের তিন প্রভাবশালী দেশ কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তিনটি দেশ থেকেই প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এসব বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জ্বালানি ও খনিজ খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে যৌথ বিনিয়োগের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয় বলে জানান মাহদী আমিন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র তিনি বলেন, আমরা দেখেছি বিশ্বের প্রতিটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা অপরিসীম শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে গ্রহণ করেছে। কারণ ওনার ক্ষমতার মূল উৎসই হচ্ছে দেশের জনগণ। তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘে দেওয়া গতকালের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী কেবল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখাই তুলে ধরেননি, বরং সারা বিশ্বে কীভাবে শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবতা প্রতিষ্ঠা করা যায়, তার একটি বলিষ্ঠ বৈশ্বিক দর্শন উপস্থাপন করেছেন। তাঁর এই দূরদর্শী বক্তব্য বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের এই ইতিবাচক ধারা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য নেতৃত্বে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় ও মর্যাদাপূর্ণ হবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে, যেখানে জনগণের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকবে।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি একেএম ওয়াহিদুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনিসহ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সদস্যবৃন্দ ও জাতিসংঘ মিশনের কর্মকর্তারা।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন