৪০ বছর ধরে নদীভাঙন

বদলে যাচ্ছে মাগুরার মানচিত্র, অস্তিত্ব সংকটে নদীপাড়ের মানুষ

আপলোড সময় : ২৩-০৯-২০২৬ ০৩:২২:২৪ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৩-০৯-২০২৬ ০৩:২২:২৪ অপরাহ্ন
‘ভাঙছে নদী, কাঁদছে মানুষ’—মাগুরার মহম্মদপুরে মধুমতি নদীর তীরবর্তী মানুষের কাছে যেন এটাই বছরের পর বছরের বাস্তবতা। দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে অব্যাহত নদীভাঙনে বদলে যাচ্ছে উপজেলার মানচিত্র। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা, দোকানপাট ও রাস্তাঘাট। বর্ষা এলেই নতুন করে আতঙ্কে দিন কাটে নদীপাড়ের শত শত পরিবারের।

উপজেলার চুড়ারগাতি, চরগয়াশপুর, কাশীপুর, বসুরধুলজুড়ী, ভোলানাথপুর, রুইজানী, গোপালনগর, জাঙ্গালীয়া, ধুপুড়িয়া, রায়পাশা, চরপাচুড়িয়া, হরেকৃষ্ণপুর, আড়মাঝি, ঝামা, দেউলি ও কালীশংকরপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন চলছে। এর মধ্যে চুড়ারগাতি, চরগয়াশপুর, বসুরধুলজুড়ী, ভোলানাথপুর, জাঙ্গালীয়া, হরেকৃষ্ণপুর, ঝামা ও দেউলি এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেশি।

স্থানীয়দের দাবি, নদীর মাঝ বরাবর বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় চর জেগে ওঠায় মধুমতির স্বাভাবিক স্রোত প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গোপালনগর থেকে প্রায় পাল্লা গ্রাম পর্যন্ত এবং আড়মাঝি, হরেকৃষ্ণপুর ও ঝামা এলাকায় জেগে ওঠা চরগুলোর কারণে নদীর স্রোতের চাপ তীরের দিকে বেশি পড়ছে। এতে ভাঙন আরও তীব্র হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

নদীপাড়ের বাসিন্দা রহমত শেখ বলেন, বছরের পর বছর নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে তাদের জীবন কাটছে। নদী যখন ভাঙন শুরু করে, তখন ঘরবাড়ি ও মালামাল সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। একবার ভিটেমাটি হারানোর পর নতুন করে ঘর গড়ে তুললেও পরের বছর আবার ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়। স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

আরেক নদীপাড়ের বাসিন্দা নজরুল ইসলামের ভাষ্য, মধুমতির ভাঙনে শুধু ঘরবাড়িই নয়, ফসলি জমি ও গাছপালাও নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। এতে মানুষের বসবাস ও জীবিকা দুটোই হুমকির মুখে পড়েছে। সাময়িকভাবে জিও ব্যাগ ফেলার পাশাপাশি নদীর স্রোতের গতিপথ বিবেচনায় নিয়ে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

এদিকে গত এক মাস ধরে টানা বৃষ্টি ও নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও নদীর পাড় ভেঙে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। নদীর পানি কমে ভাটার টান বাড়লে ভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নদীতীরবর্তী পরিবারগুলো।

মধুমতির ভাঙনে ইতোমধ্যে বহু ফসলি জমি, বৃক্ষরাজি, দোকানপাট ও রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে একাধিক মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির ও গোরস্তান। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এসব স্থাপনাও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।

নদীপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, ভাঙন ঠেকাতে বিভিন্ন সময় জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। তাদের দাবি, নদীর গতিপথ ও স্রোতপ্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে স্থায়ী নদীশাসন ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হোক।

মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী বলেন, ভাঙনকবলিত ঝুঁকিপূর্ণ কিছু এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তা এবং নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত অবহিত করা হয়েছে।

মাগুরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) সন্তোষ কর্মকার বলেন, আমরা ঝামা ও হরেকৃষ্ণপুর এলাকায় জিও ব্যাগের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ভাঙনরোধের চেষ্টা করছি। জনগণের এই দুর্ভোগের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে।

তবে নদীপাড়ের মানুষের দাবি, প্রতিবছর ভাঙন শুরু হওয়ার পর সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে এবার স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে মধুমতির ভাঙনে একের পর এক বসতভিটা, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হারিয়ে যাবে।

মধুমতি নদী ঘিরেই মহম্মদপুরের বহু মানুষের জীবন-জীবিকা। অথচ সেই নদীই বছরের পর বছর কেড়ে নিচ্ছে তাদের ঘর, জমি ও স্বপ্ন। তাই নদীপাড়ের মানুষের প্রত্যাশা—মধুমতির ভাঙন রোধে এবার নেওয়া হোক কার্যকর পদক্ষেপ ও উদ্যোগ।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :