পিরোজপুরে নৌকার ভাসমান হাটে প্রতিদিন শত শত মণ পেয়ারা বিক্রি

আপলোড সময় : ১৬-০৯-২০২৬ ১২:২২:০৪ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৬-০৯-২০২৬ ১২:২২:০৪ অপরাহ্ন
সকাল হলেই চাষিরা ছোট ছোট খাল ধরে বিভিন্ন এলাকা থেকে সবুজ-হলুদ পেয়ারা নিয়ে ডিঙি নৌকায় করে ছুটে আসেন এই খালে। এ সময় খালজুড়ে ভাসতে থাকে সারি সারি নৌকা। প্রতিটি নৌকায় সাজানো থাকে সদ্য তোলা তাজা পেয়ারা। এমনই দৃশ্যের দেখা মেলে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর-কুড়িয়ানার খালে পেয়ারার ভরা মৌসুমে।

সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আটঘর-কুড়িয়ানা, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠিসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের খালের বুক চিরে ছোট ছোট নৌকায় পেয়ারা নিয়ে সন্ধ্যা নদীর শাখা আটঘর-কুড়িয়ানা খালে নিয়ে আসেন চাষিরা।

বর্তমানে দেশের একমাত্র ভাসমান পেয়ারার হাট শুধু স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রই নয়, বরং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছেও একটি অনন্য দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে। এখানকার পেয়ারা আকারে বড় ও সুস্বাদু হওয়ায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পদ্মা সেতু হওয়ার পর নেছারাবাদের পেয়ারার চাহিদা আরও বেড়েছে। এখন কৃষক ভালো মূল্য পাচ্ছেন, ব্যবসায়ীরা পণ্য দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন। এতে এই ফলের চাষাবাদ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি পেয়ারার মৌসুমে এ হাটকে কেন্দ্র করে পর্যটকদেরও ঢল নামে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাসমান এই হাটের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। যতই দেখুন না কেন, এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখার তৃষ্ণা যেন মেটে না। দর্শনার্থীরা নৌকা ও ট্রলারে করে পেয়ারা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। এতে একদিকে যেমন বেড়েছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান।

আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা হাট সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, আশপাশের এলাকা থেকে ছোট ছোট ডিঙিতে পেয়ারাবোঝাই করে বিক্রির জন্য এসেছেন চাষিরা। দরদাম করছেন পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। দরদামে মিললে প্লাস্টিকের ট্রেতে তুলে রাখা হচ্ছে পেয়ারা এবং ঢাকা হচ্ছে কলাগাছের পাতা দিয়ে। কেউবা টাকা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন নিজ গন্তব্যে। কেউবা পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ফিরছেন।

স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্র। এই হাট ঘিরে স্থানীয় হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলো জমজমাট হয়ে উঠেছে। এখানে সরষে ইলিশ, ইলিশভর্তা, চিংড়ি ভুনা, হাঁসের মাংসসহ বেশ কয়েকটি খাবার খুব জনপ্রিয়।

পেয়ারাচাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, হাট থেকে প্রতিদিন শত শত মণ পেয়ারা চলে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। প্রতি মণ পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়।

খুলনার বাগেরহাট থেকে পেয়ারা কিনতে এসে আমিনুল ইসলাম বলেন, “এই জায়গা থেকে পেয়ারা কিনে বাজারে বিক্রি করব। এখানকার পেয়ারা খুব সুস্বাদু। এই পেয়ারা বাংলাদেশে আর কোথাও হয় না। এ কারণে বাজারেও এই পেয়ারার খুব চাহিদা।”

স্থানীয় পেয়ারা ব্যবসায়ী রিয়াজ হোসেন বলেন, “এ বছর আবহাওয়া খারাপ হওয়ার কারণে পেয়ারা একটু কম হয়েছে। তবে দাম ভালো। আমাদের এই এলাকার পেয়ারার সারাদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।”

আরেক পেয়ারা চাষি রবিন দাস বলেন, “আমার ১৩ বিঘা জমিতে পেয়ারা চাষ হয়। প্রতিদিন ভোরে বাগানে গিয়ে পেয়ারা তুলি। পেয়ারা পাড়তে অনেক সময় লাগে। পেয়ারা পাড়া শেষ হলে নৌকায় করে বিক্রি করতে নিয়ে আসি এই ভাসমান হাটে।”

ঢাকার এক বাসিন্দা রুমি খানম বলেন, “আমরা ঢাকা থেকে রওনা হয়েছি। সকালে এখানে এসে পৌঁছেছি। এই এলাকায় যত সময় ঘুরেছি, দেখলাম খুবই ভালো পরিবেশ। রাস্তার দুপাশে পেয়ারা গাছ, আমড়া গাছ, লেবু গাছ এবং নৌকায় করে পেয়ারা বিক্রি—এসব দৃশ্য খুবই ভালো লাগার মতো।”

পিরোজপুর থেকে ঘুরতে আসা মাহিম নামে এক কলেজশিক্ষার্থী বলেন, “আমি এই স্বরূপকাঠিতে দুটি পর্যটনকেন্দ্র ঘুরতে এসেছি। একটি হলো ভাসমান নৌকার হাট এবং অপরটি পেয়ারা পার্ক। দুটিই সুন্দর পরিবেশ।”

হাটে এমন হৈচৈ থাকলেও রয়েছে কিছু সমস্যাও। অভিযোগ করে অনেকে বলেছেন, হাটে কোনো আবাসিক হোটেল বা সরকারিভাবে ওয়াশরুম না থাকায় আমরা ফ্রেশ হতে পারছি না। এ ক্ষেত্রে মা-বোনদের বেশি কষ্ট হচ্ছে। তা ছাড়া আমাদের গাড়ি রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই এবং একটি রেস্ট হাউসও নেই। এগুলোর ব্যবস্থা করার জন্য আমি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

নেছারাবাদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, “নেছারাবাদ উপজেলায় মোট ৬০০ হেক্টর জমিতে পেয়ারার আবাদ হয়েছে। এ বছর আশা করা যায়, উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ টন হবে এবং দামও বেশ ভালো। পেয়ারা চাষিদের কৃষি অফিস থেকে সার্বক্ষণিক পরামর্শ প্রদান করে থাকি এবং তাঁদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া কিছু উদ্যোক্তা পেয়ারা থেকে জ্যাম ও জেলি তৈরি করে বাজারজাতও করে থাকেন।”

নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত দত্ত বলেন, “উপজেলার পুরো পর্যটনব্যবস্থা নিয়ে আমরা একটি পরিকল্পনা করেছি। কীভাবে এই পর্যটনকেন্দ্র আরও সুন্দর করা যায়, কীভাবে পর্যটকদের থাকা, খাওয়া এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়—এ ব্যাপারেও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতেও কাজ করা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “এখানে দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকেরা ঘুরতে আসেন। আমরা পর্যটকদের কথা চিন্তা করে তিনটি পেয়ারা পার্কে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ওয়াশব্লক করেছি। এ ছাড়া নৌকার হাটসহ আরও কয়েকটি স্থানে ওয়াশব্লক করার পরিকল্পনা রয়েছে। বরাদ্দ পেলে আমরা কাজ শুরু করতে পারব। তা ছাড়া পর্যটকদের জন্য কিছু নির্দেশনা রয়েছে। সেগুলো যারা না মানেন, তাঁদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।”

পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামারবাড়ি) সৌমিত্র সরকার বলেন, “পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদে সবচেয়ে বেশি পেয়ারার চাষ হচ্ছে। এ ছাড়া গত বছরের তুলনায় এ বছর পেয়ারার উৎপাদন ও চাহিদা বেড়েছে। গত বছর জেলায় ৭১০ হেক্টর জমিতে এই ফলের আবাদ হয়েছিল। এ বছর ৭১৬ হেক্টর জমিতে এই ফলের আবাদ হয়েছে। জেলায় গত বছর এই ফলের উৎপাদন হয়েছিল ৭ হাজার ২১০ মেট্রিক টন এবং এ বছর উৎপাদন হয়েছে ৭ হাজার ৬৯২ মেট্রিক টন। প্রতি মৌসুমে এ পেয়ারার হাটে প্রায় ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকারও বেশি পেয়ারা কেনাবেচা হয়।”

তিনি আরও বলেন, “এ ছাড়া জেলার নাজিরপুর, জিয়ানগর, ভান্ডারিয়া ও কাউখালীতেও পেয়ারার চাষ হয়। এর সঙ্গে যুক্ত প্রায় সহস্রাধিক পেয়ারা চাষি। এসব চাষিকে আমরা সার্বক্ষণিক বিভিন্ন পরামর্শসহ যাবতীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছি। নেছারাবাদের আটঘর-কুড়িয়ানায় একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা হলে এবং মৌসুমি পেয়ারা সংরক্ষণ করে রাখতে পারলে কৃষক ন্যায্য বাজারমূল্য পাবেন।”
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 
 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :