পরাশক্তিগুলোরও যে ক্ষমতার সীমা আছে, তা মানতে তারা রাজি না হওয়ায় বিশ্ব আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
তার মতে, পরাশক্তিগুলোর বিভাজনের কারণে নিরাপত্তা পরিষদ অচল হয়ে পড়লেও জাতিসংঘ এখনো মানবিক সহায়তা, শান্তিরক্ষা ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘ মহাসচিব এ কথা বলেন। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
গুতেরেসের ভাষায়, পরাশক্তিগুলো বিভাজনের সুযোগ নিয়ে মাঝারি শক্তির দেশগুলোও কোনো নিয়ম না মেনে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে, যা বিশ্বকে ‘খুব, খুব বিপজ্জনক’ করে তুলেছে।
জাতিসংঘ যে উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল, ৮০ বছর পর এ সংস্থা তা পূরণের সক্ষমতা হারিয়েছে কি না–এমন প্রশ্নের জবাবে গুতেরেস বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের অন্যতম সাফল্য হল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকিয়ে রাখা।
তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে অনেক সংঘাত থাকলেও দুটি পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি, যা জাতিসংঘের কাজের কারণেই অনেকাংশে সম্ভব হয়েছে।
তবে এখন নতুন আরো শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে, সে কথা তিনি স্বীকার করেছেন।
হিন্দুকে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, “এমন পরাশক্তি রয়েছে, যারা এখনো স্বীকার করে না যে তাদের ক্ষমতারও সীমা আছে এবং তারা এমন সব দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, যার ফল ভয়াবহ।”
তার মতে, পরাশক্তিগুলোর বিভাজন মাঝারি শক্তির দেশগুলোর মধ্যে ‘দায়মুক্তির’ ধারণা তৈরি করছে। তারা কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। আর পরাশক্তিদের বিভাজনের কারণে নিরাপত্তা পরিষদ অচল হয়ে যাওয়ায় বিশ্বে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কার্যকর ব্যবস্থা থাকছে না।
হরমুজ, বাব আল-মানদাব ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতা
বাব আল-মানদাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইয়েমেনের হুতিদের হাতে চলে যাওয়ার খবরের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে গুতেরেস বলেন, জাতিসংঘের অন্যতম মৌলিক লক্ষ্য হলো নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
তার ভাষ্য, কৃষ্ণসাগর, হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদাবে নৌ চলাচলের অধিকার ও স্বাধীনতাকে অবশ্যই সম্মান করতে হবে। কাউকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া এবং অন্য কাউকে না দেওয়া কিংবা জোর করে টোল আরোপ করা গ্রহণযোগ্য নয়।
জাতিসংঘ খাদ্য ও সার পরিবহনকে অবরোধের বাইরে রাখার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি।
গুতেরেস মনে করিয়ে দেন, রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের সময় কৃষ্ণসাগরের শস্য পরিবহনের জন্য একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তবে হরমুজ প্রণালিতে সার পরিবহনের ক্ষেত্রে একই ধরনের একটি প্রস্তাব ইরানকে দেওয়া হলেও তেহরান তাতে সায় দেয়নি বলে জানান তিনি।
কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেইন ও রাশিয়া—উভয় দেশের খাদ্য, সার ও জ্বালানি রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়েও জাতিসংঘ কাজ করতে আগ্রহী বলে জানান মহাসচিব। তবে সে জন্য যে সব পক্ষের ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’ প্রয়োজন, সে কথাও তিনি বলেন।
‘পরাশক্তিগুলোকে ক্ষমতার সীমা বুঝতে হবে’
ব্রিকস সম্মেলনে ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের নেতারা উপস্থিত থাকায় তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা তৈরির চেষ্টা করবেন কি না—এমন প্রশ্নে গুতেরেস বলেন, তিনি সবার সঙ্গেই কথা বলেছেন।
তবে তার মতে, মূল সমস্যা হচ্ছে পরাশক্তিগুলোর বিভাজন।
“পরাশক্তিগুলো বিভক্ত থাকলে কোনো সম্মান থাকে না। সবাই মনে করে, তারা যা খুশি করতে পারে,” বলেন তিনি।
সুদানের উদাহরণ টেনে গুতেরেস বলেন, দেশটির সংঘাতে বহু দেশ জড়িয়ে পড়েছে। সুদানের সংঘাত মূলত সে দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারত, কিন্তু ‘দায়মুক্তির’ ধারণার কারণে অনেক বাইরের দেশও এতে জড়িয়ে পড়েছে।
ইউক্রেইন যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে গুতেরেস বলেন, রাশিয়া সাড়ে চার বছর আগে ইউক্রেনে হামলা চালানোর পরও সংঘাত চলছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়ছে।
“আমার মনে হয়, পরাশক্তিগুলোর নিজেদের ক্ষমতার সীমা বোঝার সময় এসেছে। এটি বিশ্বকে আরও শান্তিপূর্ণ হতে সহায়তা করবে,” বলেন গুতেরেস।
ইউক্রেইনে ভারতের ভূমিকার প্রশংসা
ইউক্রেইন ও রশিয়ার যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি আনার চেষ্টায় ভারত মধ্যস্থতার জন্য প্রস্তুত থাকার কথা বলেছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে গুতেরেস বলেন, ইউক্রেইনের যুদ্ধ ও উপসাগরীয় পরিস্থিতি—দুই ক্ষেত্রেই তাদের আলোচনায় শান্তির প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
তবে অবিলম্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না হলেও নৌ চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে তারা ‘একমত’ হয়েছেন।
ভারতের মধ্যস্থতার চেষ্টার প্রশংসা করে গুতেরেস বলেন, পক্ষগুলোর সঙ্গে নয়াদিল্লির নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে, যা পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, বড় সমস্যা হলো আস্থার ঘাটতি। কোনো পক্ষই বিশ্বাস করে না যে অন্য পক্ষ চুক্তি বাস্তবায়ন করবে।
“প্রকৃত মধ্যস্থতাকারী, শান্তির বার্তাবাহক ও সেতুবন্ধনকারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর ভারত ছাড়া এ ক্ষেত্রে আর কোনো দেশ ভালো অবস্থানে নেই।”
‘নিরাপত্তা পরিষদ এখনকার বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’
ব্রিকস সম্মেলনে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। জাতিসংঘ সংস্কার করে এগিয়ে যাওয়া উচিত, নাকি পুরো বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো প্রয়োজন—এমন প্রশ্নে গুতেরেস বলেন, জাতিসংঘে মৌলিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
তার মতে, বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৪৫ সালের বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে নয়।
এতে জাতিসংঘের বৈধতা ও কার্যকারিতা—দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
একইভাবে ব্রেটন উডস ব্যবস্থা বর্তমান উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর বাস্তবতা প্রতিফলিত করে না। বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এসব দেশের প্রতিনিধিত্ব ‘স্পষ্টতই কম’ বলে মন্তব্য করেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
তিনি বলেন, “আমাদের ১৯৪৫ সালের বিশ্ব বাস্তবতার পরিবর্তে আজকের বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্ষমতার কাঠামো ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার প্রক্রিয়াগুলো পুনর্বিন্যাস করতে হবে।”
তার মতে, এটি শুধু সংস্কারের বিষয় নয়; বরং প্রয়োজন একটি ‘ব্যাপক পুনর্গঠন’।
তবে তিনি এও বলেছেন, জাতিসংঘকে প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন না।
‘জাতিসংঘ ভেঙে পড়েনি’
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ অচল হয়ে গেলেও পুরো জাতিসংঘ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি বলে মনে করেন গুতেরেস।
তিনি বলেন, সীমিত সম্পদ ও বিভিন্ন ধরনের কাটছাঁটের মধ্যেও জাতিসংঘের কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়নি। বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাগুলোতেও প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে যাচ্ছে এবং মানুষকে সহায়তা করছে।
বিশ্বের বিপজ্জনক এলাকাগুলোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী কার্যক্রমও যে চলছে, সে কথাও তিনি মনে করিয়ে দেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নীতিমালার আওতায় আনার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন গুতেরেস।
তিনি বলেন, জাতিসংঘেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্যানেল এবং প্রথম বৈশ্বিক সংলাপের আয়োজন করেছে।
গুতেরেসের ভাষায়, এসব উদাহরণ প্রমাণ করে যে জাতিসংঘ এখনো ‘জীবনীশক্তিতে পূর্ণ’ এবং নিজেদের কাজের পদ্ধতি ও কাঠামো অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে সংস্কার করার সক্ষমতা রাখে।
তবে মূল সমস্যা রয়ে গেছে ক্ষমতার কাঠামোতে। গুতেরেস বলেন, বর্তমান বিশ্বে ক্ষমতার সম্পর্ক ‘বিকৃত’ হওয়ায় বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
গাজায় যা ঘটছে ‘ভয়াবহ ও অগ্রহণযোগ্য’
গাজায় ইসরায়েলের অভিযানকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বিবেচনা করেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে গুতেরেস বলেন, ‘গণহত্যা’ একটি আইনি সংজ্ঞা, যা আদালতের বিবেচনার বিষয়।
তবে গাজায় যা ঘটছে, তা ‘ভয়াবহ’ এবং ‘একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, “এটি আন্তর্জাতিক আইনের অধীন সব নীতির লঙ্ঘন।”
তবে জাতিসংঘ যে এ ঘটনাকে আইনগতভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছে না, সে কথাও তিনি বলেন।
গুতেরেস বলেন, জাতিসংঘ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলারও নিন্দা জানিয়েছে।
গাজায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়া এবং জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের হত্যার পরও কোনো দেশ যদি জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের প্রবেশে বাধা দেয় বা মহাসচিবকে প্রবেশ করতে না দেয়, তাহলে কী হবে—এমন প্রশ্নে গুতেরেস বলেন, জাতিসংঘের তা থামানোর ক্ষমতা নেই।
তার ভাষায়, এটাই ‘মূল সমস্যা’। পরাশক্তিগুলোর বিভাজনের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে ইসরায়েল, ইরান বা অন্য কোনো দেশ মনে করতে পারে যে তারা ‘যা খুশি’ করতে পারে।
“আন্তর্জাতিক আইনের এসব লঙ্ঘনের জন্য কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করার মত কোনো ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে নেই।”
উত্তরসূরি হিসেবে চান নারী মহাসচিব
চলতি বছর জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার কথা। গুতেরেসের আরও এক মেয়াদ দায়িত্বে থাকার প্রয়োজন আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি বলেন, “না, আমার আরেক মেয়াদ একেবারেই প্রয়োজন নেই।”
উত্তরসূরি হিসেবে কোনো নারীকে দেখতে চান কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পদে নারীর থাকা স্বাভাবিক এবং এটি লিঙ্গসমতার বিষয়।
গুতেরেস জানান, গত ১০ বছরে জাতিসংঘের ১৭০টি নেতৃত্বের পদে নারী-পুরুষ সমতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীদের ৫৫ শতাংশ এখন নারী।
সব জায়গায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কর্মীদের ক্ষেত্রেও সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান মহাসচিব।
তিনি বলেন, “একজন নারীকে মহাসচিব হিসেবে দেখতে পেলে আমি খুব খুশি হব।”
সবচেয়ে বড় সাফল্য, সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা
গত ১০ বছরে নিজের সবচেয়ে বড় সাফল্য ও ব্যর্থতা কী—এমন প্রশ্নে গুতেরেস বলেন, তার সাফল্য বা ব্যর্থতার বিচার অন্যদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।
তবে নিজের কাজের যে বিষয়টি নিয়ে তিনি সবচেয়ে সন্তুষ্ট, তা হলো জাতিসংঘের নীতির প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে গত ১০ বছর সংস্থাটিকে পরিচালনা করতে পারা।
“মানদণ্ডের ক্ষেত্রে আমরা কখনো দ্বৈত নীতি গ্রহণ করিনি,” বলেন তিনি।
গুতেরেস বলেন, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা ও নিরাপত্তা পরিষদসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যে গুরুতর সংস্কার দরকার, ক্ষমতাধর দেশগুলোকে তা বোঝাতে না পারাকে তিনি নিজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যর্থতার কথা বলা হলে গুতেরেস বলেন, সেটি জাতিসংঘের ব্যর্থতা নয়, বরং সদস্য দেশগুলোর ব্যর্থতা।
তার ভাষায়, জাতিসংঘ জলবায়ু পদক্ষেপের লড়াইয়ে সামনের সারিতে রয়েছে। কিন্তু সদস্য দেশগুলো মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর চেয়ে নিজেদের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে যাচ্ছে।
“সদস্য রাষ্ট্রগুলো জাতিসংঘকে যেমন দেখতে চায়, জাতিসংঘ তেমনই হবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অক্ষমতা বা অনিচ্ছার অজুহাত হিসেবে জাতিসংঘকে ব্যবহার করা উচিত নয়।”
৩১ ডিসেম্বরের পর কী করবেন?
জাতিসংঘ মহাসচিবের পদ ছাড়ার পর কী করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে গুতেরেস বলেন, এ বিষয়ে তার এখনো কোনো পরিকল্পনা নেই।
“আমার একেবারেই কোনো ধারণা নেই। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমার যা করার কথা, তা ঠিকভাবে করতে কঠোর পরিশ্রম করছি। এরপর দেখা যাবে।”
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে
তার মতে, পরাশক্তিগুলোর বিভাজনের কারণে নিরাপত্তা পরিষদ অচল হয়ে পড়লেও জাতিসংঘ এখনো মানবিক সহায়তা, শান্তিরক্ষা ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘ মহাসচিব এ কথা বলেন। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
গুতেরেসের ভাষায়, পরাশক্তিগুলো বিভাজনের সুযোগ নিয়ে মাঝারি শক্তির দেশগুলোও কোনো নিয়ম না মেনে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে, যা বিশ্বকে ‘খুব, খুব বিপজ্জনক’ করে তুলেছে।
জাতিসংঘ যে উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল, ৮০ বছর পর এ সংস্থা তা পূরণের সক্ষমতা হারিয়েছে কি না–এমন প্রশ্নের জবাবে গুতেরেস বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের অন্যতম সাফল্য হল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকিয়ে রাখা।
তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে অনেক সংঘাত থাকলেও দুটি পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি, যা জাতিসংঘের কাজের কারণেই অনেকাংশে সম্ভব হয়েছে।
তবে এখন নতুন আরো শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে, সে কথা তিনি স্বীকার করেছেন।
হিন্দুকে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, “এমন পরাশক্তি রয়েছে, যারা এখনো স্বীকার করে না যে তাদের ক্ষমতারও সীমা আছে এবং তারা এমন সব দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, যার ফল ভয়াবহ।”
তার মতে, পরাশক্তিগুলোর বিভাজন মাঝারি শক্তির দেশগুলোর মধ্যে ‘দায়মুক্তির’ ধারণা তৈরি করছে। তারা কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। আর পরাশক্তিদের বিভাজনের কারণে নিরাপত্তা পরিষদ অচল হয়ে যাওয়ায় বিশ্বে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কার্যকর ব্যবস্থা থাকছে না।
হরমুজ, বাব আল-মানদাব ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতা
বাব আল-মানদাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইয়েমেনের হুতিদের হাতে চলে যাওয়ার খবরের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে গুতেরেস বলেন, জাতিসংঘের অন্যতম মৌলিক লক্ষ্য হলো নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
তার ভাষ্য, কৃষ্ণসাগর, হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদাবে নৌ চলাচলের অধিকার ও স্বাধীনতাকে অবশ্যই সম্মান করতে হবে। কাউকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া এবং অন্য কাউকে না দেওয়া কিংবা জোর করে টোল আরোপ করা গ্রহণযোগ্য নয়।
জাতিসংঘ খাদ্য ও সার পরিবহনকে অবরোধের বাইরে রাখার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি।
গুতেরেস মনে করিয়ে দেন, রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের সময় কৃষ্ণসাগরের শস্য পরিবহনের জন্য একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তবে হরমুজ প্রণালিতে সার পরিবহনের ক্ষেত্রে একই ধরনের একটি প্রস্তাব ইরানকে দেওয়া হলেও তেহরান তাতে সায় দেয়নি বলে জানান তিনি।
কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেইন ও রাশিয়া—উভয় দেশের খাদ্য, সার ও জ্বালানি রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়েও জাতিসংঘ কাজ করতে আগ্রহী বলে জানান মহাসচিব। তবে সে জন্য যে সব পক্ষের ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’ প্রয়োজন, সে কথাও তিনি বলেন।
‘পরাশক্তিগুলোকে ক্ষমতার সীমা বুঝতে হবে’
ব্রিকস সম্মেলনে ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের নেতারা উপস্থিত থাকায় তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা তৈরির চেষ্টা করবেন কি না—এমন প্রশ্নে গুতেরেস বলেন, তিনি সবার সঙ্গেই কথা বলেছেন।
তবে তার মতে, মূল সমস্যা হচ্ছে পরাশক্তিগুলোর বিভাজন।
“পরাশক্তিগুলো বিভক্ত থাকলে কোনো সম্মান থাকে না। সবাই মনে করে, তারা যা খুশি করতে পারে,” বলেন তিনি।
সুদানের উদাহরণ টেনে গুতেরেস বলেন, দেশটির সংঘাতে বহু দেশ জড়িয়ে পড়েছে। সুদানের সংঘাত মূলত সে দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারত, কিন্তু ‘দায়মুক্তির’ ধারণার কারণে অনেক বাইরের দেশও এতে জড়িয়ে পড়েছে।
ইউক্রেইন যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে গুতেরেস বলেন, রাশিয়া সাড়ে চার বছর আগে ইউক্রেনে হামলা চালানোর পরও সংঘাত চলছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়ছে।
“আমার মনে হয়, পরাশক্তিগুলোর নিজেদের ক্ষমতার সীমা বোঝার সময় এসেছে। এটি বিশ্বকে আরও শান্তিপূর্ণ হতে সহায়তা করবে,” বলেন গুতেরেস।
ইউক্রেইনে ভারতের ভূমিকার প্রশংসা
ইউক্রেইন ও রশিয়ার যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি আনার চেষ্টায় ভারত মধ্যস্থতার জন্য প্রস্তুত থাকার কথা বলেছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে গুতেরেস বলেন, ইউক্রেইনের যুদ্ধ ও উপসাগরীয় পরিস্থিতি—দুই ক্ষেত্রেই তাদের আলোচনায় শান্তির প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
তবে অবিলম্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না হলেও নৌ চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে তারা ‘একমত’ হয়েছেন।
ভারতের মধ্যস্থতার চেষ্টার প্রশংসা করে গুতেরেস বলেন, পক্ষগুলোর সঙ্গে নয়াদিল্লির নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে, যা পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, বড় সমস্যা হলো আস্থার ঘাটতি। কোনো পক্ষই বিশ্বাস করে না যে অন্য পক্ষ চুক্তি বাস্তবায়ন করবে।
“প্রকৃত মধ্যস্থতাকারী, শান্তির বার্তাবাহক ও সেতুবন্ধনকারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর ভারত ছাড়া এ ক্ষেত্রে আর কোনো দেশ ভালো অবস্থানে নেই।”
‘নিরাপত্তা পরিষদ এখনকার বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’
ব্রিকস সম্মেলনে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। জাতিসংঘ সংস্কার করে এগিয়ে যাওয়া উচিত, নাকি পুরো বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো প্রয়োজন—এমন প্রশ্নে গুতেরেস বলেন, জাতিসংঘে মৌলিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
তার মতে, বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৪৫ সালের বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে নয়।
এতে জাতিসংঘের বৈধতা ও কার্যকারিতা—দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
একইভাবে ব্রেটন উডস ব্যবস্থা বর্তমান উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর বাস্তবতা প্রতিফলিত করে না। বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এসব দেশের প্রতিনিধিত্ব ‘স্পষ্টতই কম’ বলে মন্তব্য করেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
তিনি বলেন, “আমাদের ১৯৪৫ সালের বিশ্ব বাস্তবতার পরিবর্তে আজকের বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্ষমতার কাঠামো ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার প্রক্রিয়াগুলো পুনর্বিন্যাস করতে হবে।”
তার মতে, এটি শুধু সংস্কারের বিষয় নয়; বরং প্রয়োজন একটি ‘ব্যাপক পুনর্গঠন’।
তবে তিনি এও বলেছেন, জাতিসংঘকে প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন না।
‘জাতিসংঘ ভেঙে পড়েনি’
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ অচল হয়ে গেলেও পুরো জাতিসংঘ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি বলে মনে করেন গুতেরেস।
তিনি বলেন, সীমিত সম্পদ ও বিভিন্ন ধরনের কাটছাঁটের মধ্যেও জাতিসংঘের কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়নি। বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাগুলোতেও প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে যাচ্ছে এবং মানুষকে সহায়তা করছে।
বিশ্বের বিপজ্জনক এলাকাগুলোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী কার্যক্রমও যে চলছে, সে কথাও তিনি মনে করিয়ে দেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নীতিমালার আওতায় আনার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন গুতেরেস।
তিনি বলেন, জাতিসংঘেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্যানেল এবং প্রথম বৈশ্বিক সংলাপের আয়োজন করেছে।
গুতেরেসের ভাষায়, এসব উদাহরণ প্রমাণ করে যে জাতিসংঘ এখনো ‘জীবনীশক্তিতে পূর্ণ’ এবং নিজেদের কাজের পদ্ধতি ও কাঠামো অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে সংস্কার করার সক্ষমতা রাখে।
তবে মূল সমস্যা রয়ে গেছে ক্ষমতার কাঠামোতে। গুতেরেস বলেন, বর্তমান বিশ্বে ক্ষমতার সম্পর্ক ‘বিকৃত’ হওয়ায় বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
গাজায় যা ঘটছে ‘ভয়াবহ ও অগ্রহণযোগ্য’
গাজায় ইসরায়েলের অভিযানকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বিবেচনা করেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে গুতেরেস বলেন, ‘গণহত্যা’ একটি আইনি সংজ্ঞা, যা আদালতের বিবেচনার বিষয়।
তবে গাজায় যা ঘটছে, তা ‘ভয়াবহ’ এবং ‘একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, “এটি আন্তর্জাতিক আইনের অধীন সব নীতির লঙ্ঘন।”
তবে জাতিসংঘ যে এ ঘটনাকে আইনগতভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছে না, সে কথাও তিনি বলেন।
গুতেরেস বলেন, জাতিসংঘ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলারও নিন্দা জানিয়েছে।
গাজায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়া এবং জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের হত্যার পরও কোনো দেশ যদি জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের প্রবেশে বাধা দেয় বা মহাসচিবকে প্রবেশ করতে না দেয়, তাহলে কী হবে—এমন প্রশ্নে গুতেরেস বলেন, জাতিসংঘের তা থামানোর ক্ষমতা নেই।
তার ভাষায়, এটাই ‘মূল সমস্যা’। পরাশক্তিগুলোর বিভাজনের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে ইসরায়েল, ইরান বা অন্য কোনো দেশ মনে করতে পারে যে তারা ‘যা খুশি’ করতে পারে।
“আন্তর্জাতিক আইনের এসব লঙ্ঘনের জন্য কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করার মত কোনো ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে নেই।”
উত্তরসূরি হিসেবে চান নারী মহাসচিব
চলতি বছর জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার কথা। গুতেরেসের আরও এক মেয়াদ দায়িত্বে থাকার প্রয়োজন আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি বলেন, “না, আমার আরেক মেয়াদ একেবারেই প্রয়োজন নেই।”
উত্তরসূরি হিসেবে কোনো নারীকে দেখতে চান কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পদে নারীর থাকা স্বাভাবিক এবং এটি লিঙ্গসমতার বিষয়।
গুতেরেস জানান, গত ১০ বছরে জাতিসংঘের ১৭০টি নেতৃত্বের পদে নারী-পুরুষ সমতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীদের ৫৫ শতাংশ এখন নারী।
সব জায়গায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কর্মীদের ক্ষেত্রেও সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান মহাসচিব।
তিনি বলেন, “একজন নারীকে মহাসচিব হিসেবে দেখতে পেলে আমি খুব খুশি হব।”
সবচেয়ে বড় সাফল্য, সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা
গত ১০ বছরে নিজের সবচেয়ে বড় সাফল্য ও ব্যর্থতা কী—এমন প্রশ্নে গুতেরেস বলেন, তার সাফল্য বা ব্যর্থতার বিচার অন্যদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।
তবে নিজের কাজের যে বিষয়টি নিয়ে তিনি সবচেয়ে সন্তুষ্ট, তা হলো জাতিসংঘের নীতির প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে গত ১০ বছর সংস্থাটিকে পরিচালনা করতে পারা।
“মানদণ্ডের ক্ষেত্রে আমরা কখনো দ্বৈত নীতি গ্রহণ করিনি,” বলেন তিনি।
গুতেরেস বলেন, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা ও নিরাপত্তা পরিষদসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যে গুরুতর সংস্কার দরকার, ক্ষমতাধর দেশগুলোকে তা বোঝাতে না পারাকে তিনি নিজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যর্থতার কথা বলা হলে গুতেরেস বলেন, সেটি জাতিসংঘের ব্যর্থতা নয়, বরং সদস্য দেশগুলোর ব্যর্থতা।
তার ভাষায়, জাতিসংঘ জলবায়ু পদক্ষেপের লড়াইয়ে সামনের সারিতে রয়েছে। কিন্তু সদস্য দেশগুলো মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর চেয়ে নিজেদের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে যাচ্ছে।
“সদস্য রাষ্ট্রগুলো জাতিসংঘকে যেমন দেখতে চায়, জাতিসংঘ তেমনই হবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অক্ষমতা বা অনিচ্ছার অজুহাত হিসেবে জাতিসংঘকে ব্যবহার করা উচিত নয়।”
৩১ ডিসেম্বরের পর কী করবেন?
জাতিসংঘ মহাসচিবের পদ ছাড়ার পর কী করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে গুতেরেস বলেন, এ বিষয়ে তার এখনো কোনো পরিকল্পনা নেই।
“আমার একেবারেই কোনো ধারণা নেই। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমার যা করার কথা, তা ঠিকভাবে করতে কঠোর পরিশ্রম করছি। এরপর দেখা যাবে।”
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে