চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলে পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ। কোথাও ঘরের উঠানে পানি, কোথাও ডুবে গেছে চলাচলের রাস্তা। নিরাপদ খাবার পানি সংগ্রহ, রান্নাবান্না কিংবা সন্তানদের স্কুলে পাঠানো—সবকিছুতেই তৈরি হয়েছে বাধা। এরই মধ্যে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ৩ হাজার পরিবার। অতিরিক্ত পানিতে বিভিন্ন এলাকা ডুবে যাওয়ায় ২৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।
ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পাশাপাশি প্লাবিত এলাকায় ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা দেয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলা ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পদ্মা নদীর পাঙ্খা গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ২১ দশমিক ৭৯ মিটার। এ নদীর বিপৎসীমা ২২ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ২৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি।
এ ছাড়া মহানন্দা নদীর খালঘাট গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা ১৯ দশমিক ৪৬ মিটার। এ নদীর বিপৎসীমা ২০ দশমিক ৫৫ মিটার। অন্যদিকে, পুনর্ভবা নদীর রহনপুর গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৫২ মিটার। এ নদীর বিপৎসীমা ২১ দশমিক ৫৫ মিটার।
পদ্মার পানি বাড়ায় সদর উপজেলার নারায়ণপুর ও আলাতুলি ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ৮০০ পরিবার এবং শিবগঞ্জের দুর্লভপুর, উজিরপুর ও পাঁকা ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ১০০ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় আমবাগানসহ বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ তলিয়ে গেছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, পাঁচ ইউনিয়নে মোট ১৩০ দশমিক ৪০ হেক্টর ফসলি জমি আক্রান্ত হয়েছে। এসব জমিতে রোপা আমন, আউশ, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা, কলা, হলুদসহ বিভিন্ন ফসল রয়েছে।
পানির কারণে সদর উপজেলার দুই ইউনিয়নে ১২টি এবং শিবগঞ্জের তিন ইউনিয়নে ১৭টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠানে উঁচু স্থানে বিকল্প পাঠদানের ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে।
প্লাবিত এলাকার বাসিন্দারা জানান, পানির উৎসগুলো ডুবে যাওয়ায় নিরাপদ খাবার পানি সংগ্রহে দূরদূরান্তে যেতে হচ্ছে। এতে নারী, শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ বেড়েছে। ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় রান্নাবান্না, গবাদিপশু পালন ও দৈনন্দিন কাজেও নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, পদ্মার পানি বাড়ায় পুরো এলাকা ডুবে গেছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়িতে পানি নিয়েই বসবাস করছে। গবাদিপশু নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন তারা।
আরেক বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম জানান, অনেকের ঘরে পানি উঠে যাওয়ায় রান্না করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ ঘরের ভেতর মাচা তৈরি করে তার ওপর রান্নার ব্যবস্থা করছেন। দ্রুত ত্রাণসহায়তা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
প্লাবিত এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, বন্যার পানিতে চলাচলের কারণে মানুষের শরীরে চুলকানি দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগও বাড়ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রকিবুল ইসলাম বলেন, পূর্বাভাস অনুযায়ী শনিবার পর্যন্ত পদ্মার পানি বাড়তে পারে। এরপর পানি কমার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে পানি বিপৎসীমার নিচে থাকায় বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ আফজাল রাজন জানান, পানিবন্দী পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। শুক্রবার থেকে তাদের প্রত্যেককে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ শুরু হয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্লভপুর, উজিরপুর ও পাঁকা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণ দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব পানিবন্দী পরিবারের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেয়া হবে।’
জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শাহীন সুলতানা জানান, সদর ও শিবগঞ্জের ২৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠে যাওয়ায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। তবে কিছু এলাকায় উঁচু স্থানে বিকল্প পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, আক্রান্ত জমির যেসব রোপা আমন ধান প্রায় ৮০ শতাংশ পেকে গেছে, সেগুলো দ্রুত কেটে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। আগামী দুই-একদিনের মধ্যে পানি কমে গেলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা কম থাকবে।
এ দিকে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকায় ডায়রিয়া ও কলেরার বিস্তার ঠেকাতে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন ও কলেরার স্যালাইন সরবরাহ করা হচ্ছে। চর্মরোগের চিকিৎসায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ওষুধও পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি সাপে কাটা রোগীদের জন্য জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে।
তবে নদীর পানি কমার অপেক্ষায় থাকলেও এরই মধ্যে পানিবন্দী মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে স্থবিরতা। নিরাপদ পানি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবিকা—সবকিছু স্বাভাবিক রাখতে এখন দ্রুত ও সমন্বিত সহায়তার দিকেই তাকিয়ে আছেন প্লাবিত এলাকার মানুষ।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পাশাপাশি প্লাবিত এলাকায় ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা দেয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলা ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পদ্মা নদীর পাঙ্খা গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ২১ দশমিক ৭৯ মিটার। এ নদীর বিপৎসীমা ২২ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ২৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি।
এ ছাড়া মহানন্দা নদীর খালঘাট গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা ১৯ দশমিক ৪৬ মিটার। এ নদীর বিপৎসীমা ২০ দশমিক ৫৫ মিটার। অন্যদিকে, পুনর্ভবা নদীর রহনপুর গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৫২ মিটার। এ নদীর বিপৎসীমা ২১ দশমিক ৫৫ মিটার।
পদ্মার পানি বাড়ায় সদর উপজেলার নারায়ণপুর ও আলাতুলি ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ৮০০ পরিবার এবং শিবগঞ্জের দুর্লভপুর, উজিরপুর ও পাঁকা ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ১০০ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় আমবাগানসহ বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ তলিয়ে গেছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, পাঁচ ইউনিয়নে মোট ১৩০ দশমিক ৪০ হেক্টর ফসলি জমি আক্রান্ত হয়েছে। এসব জমিতে রোপা আমন, আউশ, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা, কলা, হলুদসহ বিভিন্ন ফসল রয়েছে।
পানির কারণে সদর উপজেলার দুই ইউনিয়নে ১২টি এবং শিবগঞ্জের তিন ইউনিয়নে ১৭টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠানে উঁচু স্থানে বিকল্প পাঠদানের ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে।
প্লাবিত এলাকার বাসিন্দারা জানান, পানির উৎসগুলো ডুবে যাওয়ায় নিরাপদ খাবার পানি সংগ্রহে দূরদূরান্তে যেতে হচ্ছে। এতে নারী, শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ বেড়েছে। ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় রান্নাবান্না, গবাদিপশু পালন ও দৈনন্দিন কাজেও নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, পদ্মার পানি বাড়ায় পুরো এলাকা ডুবে গেছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়িতে পানি নিয়েই বসবাস করছে। গবাদিপশু নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন তারা।
আরেক বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম জানান, অনেকের ঘরে পানি উঠে যাওয়ায় রান্না করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ ঘরের ভেতর মাচা তৈরি করে তার ওপর রান্নার ব্যবস্থা করছেন। দ্রুত ত্রাণসহায়তা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
প্লাবিত এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, বন্যার পানিতে চলাচলের কারণে মানুষের শরীরে চুলকানি দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগও বাড়ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রকিবুল ইসলাম বলেন, পূর্বাভাস অনুযায়ী শনিবার পর্যন্ত পদ্মার পানি বাড়তে পারে। এরপর পানি কমার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে পানি বিপৎসীমার নিচে থাকায় বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ আফজাল রাজন জানান, পানিবন্দী পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। শুক্রবার থেকে তাদের প্রত্যেককে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ শুরু হয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্লভপুর, উজিরপুর ও পাঁকা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণ দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব পানিবন্দী পরিবারের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেয়া হবে।’
জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শাহীন সুলতানা জানান, সদর ও শিবগঞ্জের ২৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠে যাওয়ায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। তবে কিছু এলাকায় উঁচু স্থানে বিকল্প পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, আক্রান্ত জমির যেসব রোপা আমন ধান প্রায় ৮০ শতাংশ পেকে গেছে, সেগুলো দ্রুত কেটে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। আগামী দুই-একদিনের মধ্যে পানি কমে গেলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা কম থাকবে।
এ দিকে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকায় ডায়রিয়া ও কলেরার বিস্তার ঠেকাতে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন ও কলেরার স্যালাইন সরবরাহ করা হচ্ছে। চর্মরোগের চিকিৎসায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ওষুধও পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি সাপে কাটা রোগীদের জন্য জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে।
তবে নদীর পানি কমার অপেক্ষায় থাকলেও এরই মধ্যে পানিবন্দী মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে স্থবিরতা। নিরাপদ পানি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবিকা—সবকিছু স্বাভাবিক রাখতে এখন দ্রুত ও সমন্বিত সহায়তার দিকেই তাকিয়ে আছেন প্লাবিত এলাকার মানুষ।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন