​শেয়ার ইস্যুতে আইনি পথে হাঁটবে আশুগঞ্জ পাওয়ার

আপলোড সময় : ০৬-০৯-২০২৬ ০১:৩৭:৩৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৬-০৯-২০২৬ ০২:৩৬:৩০ অপরাহ্ন
গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের (এপিএসসিএল) কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সরকারি প্রতিষ্ঠানটির ওই কর্মকর্তারা একটি বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ প্রকল্পে রাষ্ট্রের স্বার্থ উপেক্ষা করার পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযুক্তরা দায় এড়াতে চাইলেও বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।

আলোচ্য প্রকল্পটির নাম ইউনাইটেড-আশুগঞ্জ ২০০ মেগাওয়াট মডুলার পাওয়ার প্ল্যান্ট। এটি আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড এবং বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড গ্রুপের ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজেস অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগ। এটি সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানায় স্থাপিত বাংলাদেশের প্রথম বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যার প্রকল্প ব্যয় ১ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা।

জানা যায়,  ২০১৩ সালের চুক্তির পর দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৫ সালের ৮ মে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। ওই বছরের ৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উদ্বোধন করেন। 

অভিযোগ উঠেছে, এই প্রকল্পের শেয়ার পরিবর্তন করে সরকারের অংশ কমানো হয়েছে। এছাড়া ইউনাইটেডের কর্মকর্তারা ১৬টি জেনারেটর দ্বিগুণ দাম দেখিয়ে আমদানি করেছেন, যার কারণে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৫০০ কোটি টাকার বেশি। এই দুর্নীতির সঙ্গে ওই প্রকল্পের এপিএসসিএল অংশের পিডিসহ উর্ধ্বতন কর্মকতারা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে যাঁদের নাম নেয়া হয়েছে তাঁরা হলেন: ইউনাইটেড-আশুগঞ্জ ২০০ মেগাওয়াট মডুলার পাওয়ার প্ল্যান্টের এপিএসসিএল অংশের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বপালনকারী অজিত কুমার সরকার ও নূর মোহাম্মদ। এছাড়া এপিএসসিএলের সাবেক নির্বাহী পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ক্ষিতীশ চন্দ্র বিশ্বাস এবং সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাঃ আব্দুল মজিদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই কর্মকর্তারা আওয়ামী শাসনামলে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সভাপতিসহ বিভিন্ন পদে ছিলেন এবং অনিয়ম-দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিলেন, যা বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি প্রমাণ পেয়েছে বলে দাবি করা হয়।

এপিএসসিএলের চেয়ারম্যান বরাবর গত ১১ জুলাই চিঠি দেন আশুগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা মো. কবির সিকদার। চিঠির অনুলিপি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং বিদ্যুৎবিভাগের সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে বলে জানা যায়।

এ বিষয়ে যোগযোগ করা হলে কবির সিকদার বাংলাস্কুপকে জানান, আমি যা অভিযোগ দিয়েছি, তা যথার্থ। অভিযোগের সঙ্গে এসংক্রান্ত নথিপত্র বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠিয়েছি। আমি আশা করি, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে।

চিঠিতে অভিযোগকারী দাবি করেন, ইউনাইটেড-আশুগঞ্জ ২০০ মেগাওয়াট মডুলার পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রকল্পটির শুরুতে এপিএসসিএলের ২৯% এবং ইউনাইটেডের ৭১% শেয়ার ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এপিএসসিএলের শেয়ার মাত্র ৭% এ নেমে আসে এবং বিপরীতে ইউনাইটেডের শেয়ার বৃদ্ধি পেয়ে ৯৩% এ গিয়ে দাঁড়ায়।

পাওয়ার প্ল্যান্টটিতে রয়েছে ফিনল্যান্ডের বিখ্যাত 'ওয়ার্টসিলা' (Wartsila) কোম্পানির তৈরি মোট ১৬টি জেনারেটর (প্রতিটির ক্ষমতা ৮.৫ মেগাওয়াট)। অভিযোগকারীর ভাষ্য, জেনারেটরগুলো সরাসরি ফিনল্যান্ড থেকে আমদানি করার কথা থাকলেও, একটি মধ্যস্থতাকারী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়। ইউনাইটেড গ্রুপ হংকংয়ে একটি অফশোর/শাখা অফিস খোলে। হংকংয়ের সেই অফিসটি ফিনল্যান্ড থেকে জেনারেটরগুলো মাত্র ৬০ মিলিয়ন ডলারে ক্রয় করে। 

পরবর্তীতে, বাংলাদেশে অবস্থিত মূল ইউনাইটেড কোম্পানি তাদের নিজস্ব হংকং অফিস থেকে একই জেনারেটরগুলো ১২০ মিলিয়ন ডলারে রি-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে ক্রয় দেখিয়ে বাংলাদেশে এনে আশুগঞ্জে স্থাপন করে। চিঠিতে বলা হয়, এর ফলে জেনারেটরের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ দাম দেখানো হয়, যার কারণে সরকারের আনুমানিক ৬০ মিলিয়ন ইউএস ডলার (বা প্রায় ৬ কোটি ডলার/৫১০ কোটি টাকা) আর্থিক ক্ষতি হয়। এই অতিরিক্ত টাকা পাচার হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।

চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রকল্পটির শুরু থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত এপিএসসিএল অংশের প্রকল্প পরিচালক (Project Director) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অজিত কুমার সরকার (প্রাক্তন পিডি) এবং নূর মোহাম্মদ (পরবর্তী পিডি)।

শেয়ারের এই বিশাল ব্যবধান তৈরি হওয়া এবং জেনারেটর ক্রয়ের নামে কোটি কোটি ডলারের এই আর্থিক অনিয়ম ও ওভার-ইনভয়েসিংয়ের সাথে এই দুজন জড়িত ছিলেন কিনা, কিংবা তাদের কোনো গাফিলতি বা যোগসাজশ ছিল কিনা, তা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবি জানান অভিযোগকারী।

চিঠিতে অভিযোগকারী আরো বলেন, এসব অনিয়মের সংগে পরবর্তীতে এপিএসসিএলের নির্বাহী পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ক্ষিতীশ চন্দ্র বিশ্বাস (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) এবং তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোহাঃ আব্দুল মজিদ- যিনি পরবর্তীতে নির্বাহী পরিচালক (পরিচালন ও সংরক্ষণ) হিসাবে পূর্ণকালীন এবং নির্বাহী পরিচালক (অর্থ, এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) হিসাবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে সম্প্রতি অবসর গ্রহণকারী- এর সংশ্লিষ্টতা আছে বলে জনশ্রুতি আছে। 

তবে এপিএসসিলের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাংলাস্কুপকে মুঠোফোনে অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। 

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে মঙ্গলবার মুঠোফোনে কথা হয় ওই প্রকল্পে পিডির দায়িত্বপালনকারী অজিত কুমার সরকারের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি অবসরে রয়েছি। তাই এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমি যা করেছি, তৎকালীন বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নির্দেশেই করেছি এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি জানতেন। আপনি বিদ্যুৎ বিভাগের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলুন। সব পেয়ে যাবেন।

আর নূর মোহাম্মদ দাবি করেছেন, তিনি কখনই ওই প্রকল্পের পিডির দায়িত্বে ছিলেন না। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন এপিএসসিএলের বোর্ড চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার।

এদিকে, এপিএসসিএলের কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ আবুল মনসুর মঙ্গলবার বিকেলে বাংলাস্কুপকে জানান, তিনি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন ২০১৫ সালে। চুক্তির সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না। তাই চুক্তির শর্তাবলীর বিষয়ে অবগত নন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে কোম্পানি সচিব বলেন, ইউনাইটেড ও আশুগঞ্জের ওই যৌথ প্রকল্পে মাত্র ৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে আমাদের। বিষয়টি বর্তমান বোর্ড অবহিত হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জানা যায়, ইউনাইটেড-আশুগঞ্জ ২০০ মেগাওয়াট মডুলার পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রকল্পের চুক্তির সময় এপিএসসিএলের পর্ষদ চেয়ারম্যান ছিলেন বিদ্যুৎ বিভাগের তৎকালীন যুগ্মসচিব মো. আনোয়ার হোসেন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন মো. নুরুল আলম। চুক্তিটি  স্বাক্ষর করেন এপিএসসিএলের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) মো. মাহফুজুল হক।

চিঠিতে আরো অভিযোগ করা হয়, ইউনাইটেড-আশুগঞ্জ ২০০ মেগাওয়াট মডুলার পাওয়ার প্ল্যান্টের ঠিক পাশেই এপিএসসিএলের জায়গায় United Jamalpur Power Ltd. (HFO ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র) এর জন্য HFO সরবরাহ ডিপো তৈরি করেছে ইউনাইটেড কোম্পানি। সেখান থেকে ছোট লরি (লোডেড অবস্থায় ৬৪ টন) এবং বড় লরিতে (লোডেড অবস্থায় ৭৪ টন) নিয়মিত তাদের জামালপুর পাওয়ার প্লান্টে HFO সরবরাহ করে যাচ্ছে। কিন্তু এপিএসসিএলের নতুন নির্মিত রাস্তা ইউনাইটেডের গাড়ির হিসাব করে নির্মাণ করা হয়নি। রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে এপিএসসিএলের গাড়ি, ধান-চালের ট্রাক, পদ্মা তেলের ডিপোর গাড়ির হিসাবে, এলাকাবাসীর গাড়ির হিসাবে গড়ে ১০-১৫ টন ধরে। এপিএসসিএলের প্লান্টের ভারী মালামাল কালেভদ্রে আসে। কিন্তু ইউনাইটেডের গাড়ি/লরি চলছে টানা সারাবছর, সারা মাস। এত বড় গাড়ির জন্য রাস্তায় জ্যাম লাগে নিয়মিত, অন্য ছোট-বড় গাড়ি-যানবাহন, সাধারণ মানুষের চলাচলে সমস্যা হয়। বেড়ে গেছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

এছাড়া এপিএসসিএলের স্টাফ কলোনি এবং সি-টাইপ কলোনির মাঝখানের রোডের চ্যানেলের উপরের কালভার্টটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে এসব অতিরিক্ত ভারী লরির জন্য। এর জন্য রাস্তার লাইফ টাইম/স্থায়িত্ব কমপক্ষে ২০-৩০ বছর কমে গেছে। ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ রাস্তা নির্মাণে কোন আর্থিক সহযোগিতা করেনি, বরং মাত্রাতিরিক্ত ওজনের লরি নিয়মিত চালাচ্ছে। এর জন্য তারা কোন ক্ষতিপূরণও দেয় না। চিঠিতে অভিযোগকারী বলেন, ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষের ক্ষতিপূরণ, রাস্তা পুন:নির্মাণ, মেরামত ইত্যাদির জন্য মুদ্রাস্ফীতি হিসাব করে এপিএসসিএলকে কমপক্ষে ৩০-৫০ কোটি টাকা দেয়া দরকার। কিন্তু এপিএসসিএল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে নির্বিকার।

অভিযোগের বিষয়ে ইউনাইটেড গ্রুপের কর্মকর্তা মো. শামীমের সঙ্গে গত কয়েকদিন যোগাযোগ করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এসব অভিযোগ নিয়ে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাস্কুপের প্রতিবেদক কথা বলেন বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) ও এপিএসসিএলের বোর্ড চেয়ারম্যান মো. সবুর হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, এপিএসসিএলের বোর্ড চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেয়ার পর শেয়ারসংক্রান্ত অসঙ্গতি আমার নজরে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে বোর্ডের অন্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আমরা আইনি পথে হাঁটব। কেনাকাটা সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি আমরা খতিয়ে দেখছি। দুর্নীতির বিষয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান 'জিরো টলারেন্স'। কেউ দুর্নীতি করে থাকলে পার পাবে না। 

বাংলাস্কুপ/বিশেষ প্রতিবেদক/এইচবি/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :