চাঁদপুরে হবে ৮ হাজার একর জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প

আপলোড সময় : ০৫-০৯-২০২৬ ১১:২৭:৫১ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৫-০৯-২০২৬ ১১:২৭:৫১ পূর্বাহ্ন
চাঁদপুরে বিদ্যুৎ সংকট কমাতে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। জেলার ৭ থেকে ৮ হাজার একর জমিতে অ্যাগ্রোভোল্টাইক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে একই জমিতে সৌর প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষিকাজও চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে। প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

সরকারের এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অবশ্য জমি নিয়ে। ৭ থেকে ৮ হাজার একর জমি ছোট কোনো পরিসর নয়। এত বড় প্রকল্পের জন্য কোন এলাকার জমি ব্যবহার করা হবে, সেগুলো কৃষিজমি কি না, জমির মালিকানা কীভাবে নির্ধারণ হবে এবং কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বয় কীভাবে করা হবে- এসব বিষয়ে এখনও বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। ফলে প্রকল্পটি ঘোষণার পাশাপাশি বাস্তবায়নের কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, চাঁদপুরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে জেলার কয়েকটি বড় জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখান থেকে উপযুক্ত স্থান বাছাই করে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

শুক্রবার (৪সেপ্টেম্বর) মতলব উত্তর উপজেলার বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আয়োজিত এক চক্ষু শিবিরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাহেলা ওসমান সিকদার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং প্রাইম ব্যাংক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ওই চক্ষু শিবিরের আয়োজন করা হয়।

অ্যাগ্রোভোল্টাইক পদ্ধতির মূল ধারণা হলো একই জমিতে কৃষি ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা। সাধারণ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্যানেল বসানোর কারণে জমির নিচের অংশে কৃষিকাজের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। কিন্তু এগ্রোভোল্টাইক ব্যবস্থায় প্যানেল এমনভাবে স্থাপন করার পরিকল্পনা থাকে, যাতে নিচে বা মাঝের জায়গায় নির্দিষ্ট ধরনের কৃষিকাজ চালানো যায়।

চাঁদপুরের প্রস্তাবিত প্রকল্পের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা বলা হচ্ছে। এতে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, অন্যদিকে জমিতে কৃষিকাজ অব্যাহত থাকবে- এমনটাই পরিকল্পনা।

চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, এ প্রকল্পে শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হবে না, সৌর প্যানেলের নিচের জমিতে কৃষিকাজও করা যাবে। অর্থাৎ একই জমি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনও অব্যাহত থাকবে।

তবে কোন ধরনের ফসল সেখানে উৎপাদন করা হবে কিংবা সৌর প্যানেলের কারণে কৃষি উৎপাদন কতটা প্রভাবিত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। একইভাবে প্রকল্পের জন্য চিহ্নিত জমির কতটুকু কৃষিজমি, কতটুকু সরকারি জমি বা অন্য ধরনের জমি- সেটিও স্পষ্ট নয়।

চাঁদপুরে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে মানুষের ভোগান্তির খবর এসেছে। শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির কারণে সমস্যায় পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয়ভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিডা চেয়ারম্যানের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সুযোগ থাকবে। ফলে শুধু চাঁদপুর নয়, দেশের অন্য এলাকাতেও এর সুফল পৌঁছাতে পারে।

আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি আশা করছেন তারা।

তবে এখানে সময়সীমাটিও গুরুত্বপূর্ণ। বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি নির্বাচন, কারিগরি সমীক্ষা, পরিবেশগত ও অন্যান্য অনুমোদন, অর্থায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জাতীয় গ্রিডে সংযোগ—সবকিছুই করতে হবে। এসব ধাপ কত দ্রুত শেষ করা যাবে, তার ওপর প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্ভর করবে।

এ কারণে বিডা চেয়ারম্যান নিজেও বাস্তবায়নের কঠিন দিকটি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, যেকোনো কিছু বলা খুব সহজ, কিন্তু বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন। তবে আমরা চেষ্টা করছি, যত দ্রুত আপনাদের জন্য এটা করা যায়, তত দ্রুত করার।

প্রকল্পটির সম্ভাব্য আয়তন ৭ থেকে ৮ হাজার একর বা তারও বেশি বলা হলেও নির্দিষ্ট কোনো স্থান এখনও চূড়ান্ত হয়নি। কয়েকটি বড় জায়গা চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। সেখান থেকে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করা হবে।

চাঁদপুরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্প স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি খাসজমি খুঁজে ইপিজেড করার সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।

বিডা চেয়ারম্যান জানান, প্রায় দুই মাস আগে প্রধানমন্ত্রী চাঁদপুরে এসে ইপিজেড করার বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার কথা বলেছিলেন। এরপর একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরকারের কী পরিমাণ খাসজমি আছে এবং সেখানে ইপিজেড করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করছে।

নতুন করে জমি অধিগ্রহণ না করে সরকারি খাসজমি ব্যবহার করাই অগ্রাধিকার পাচ্ছে বলে জানান তিনি।

তবে ইপিজেডের জন্য শুধু জমি থাকলেই হবে না। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সুবিধা, সড়ক যোগাযোগ, জমি উন্নয়নের ব্যয় এবং উৎপাদিত পণ্য সহজে সড়ক বা নৌপথে চট্টগ্রামে নেওয়ার সুযোগ আছে কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।

চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, নতুন করে জমি অধিগ্রহণের পরিবর্তে সরকারি জমি ব্যবহার করে ইপিজেড করা যায় কি না, তা দেখা হচ্ছে।

চাঁদপুরের এসব উন্নয়ন উদ্যোগের অগ্রগতি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়মিত জানানোর কথাও জানিয়েছেন বিডা চেয়ারম্যান। প্রতি তিন মাস পরপর এসব কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে বলে জানান তিনি।

অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ও ইপিজেড- দুই উদ্যোগই এখন পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে। বাস্তবে কোন জমিতে প্রকল্প হবে, কত জমি ব্যবহার করা হবে, অর্থায়ন কীভাবে হবে এবং কাজ কবে শুরু হবে- এসব বিষয়ে পরবর্তী ধাপে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

চাঁদপুরের জন্য এই দুটি উদ্যোগের সম্ভাবনা বড়। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়তে পারে, একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। আবার ইপিজেড হলে রপ্তানিমুখী শিল্প ও নতুন বিনিয়োগের পথ খুলতে পারে।

তবে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে জমি নির্বাচন থেকে শুরু করে কৃষি, পরিবেশ, অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ- সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। বিশেষ করে ৭ থেকে ৮ হাজার একর জমিতে সৌর প্যানেল বসানোর মতো বড় প্রকল্পে ‘একই জমিতে কৃষি ও বিদ্যুৎ’- এই ধারণাটি বাস্তবে কতটা কার্যকর করা যায়, সেটিই হবে প্রকল্পটির অন্যতম বড় পরীক্ষা।

চাঁদপুরে এখন তাই শুধু প্রকল্প ঘোষণাই নয়, অপেক্ষা বাস্তবায়নের।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :