প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের টানে প্রতি বছর টাঙ্গুয়ার হাওরে ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক। বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশি, মেঘালয়ের পাহাড়ের ছায়া, নীল আকাশ আর হিজল-করচের সৌন্দর্য মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের।
তবে এই আনন্দভ্রমণই কখনো কখনো পরিণত হচ্ছে স্বজন হারানোর বেদনায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকদের পানিতে ডুবে মৃত্যু, নৌযান থেকে পড়ে নিখোঁজ হওয়া এবং নৌযান-সংক্রান্ত দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। চলতি আগস্টেই মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে দুই পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। ৭ আগস্ট ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় গোসল করতে নেমে মারা যান ৭২ বছর বয়সী আলী আকবর খান।
আর ২৭ আগস্ট লামাগাঁও বাজারের পাশে মানাই নদীতে পর্যটকবাহী নৌকা থেকে পানিতে নেমে মারা যান ২৪ বছর বয়সী আব্দুল মাজেদ পিকলু।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব দুর্ঘটনার পেছনে শুধু পর্যটকদের অসাবধানতাই দায়ী নয়; রয়েছে অপরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থা, নৌযানের নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি, পর্যটকদের যথাযথ নিরাপত্তা নির্দেশনা না দেওয়া এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।
একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার:
রাজশাহী নগরের নওদাপাড়ার বাসিন্দা শিক্ষার্থী আবদুল মাজেদ (২৪) কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে বৃহস্পতিবার টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে আসেন। সকালে তাহিরপুর ঘাট থেকে হাউসবোটে হাওরের উদ্দেশে রওনা দেন তারা।
পথে লামাগাঁও এলাকার একটি স্থানীয় বাজারের ঘাটে বোটটি থামে। এ সময় কয়েকজন বন্ধু কেনাকাটার জন্য বোট থেকে নামেন। এরই মধ্যে গোসল করতে বোট থেকে পানিতে ঝাঁপ দেন মাজেদ। কিন্তু এরপর তিনি আর পানির ওপরে ভেসে ওঠেননি। পরে স্থানীয় লোকজন প্রায় তিন ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে তার মরদেহ উদ্ধার করেন।
এর আগে গত ৬ জুন পরিবারের সঙ্গে টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে এসে নৌকার ইঞ্জিনে পড়ে মারা যায় ধর্মপাশা উপজেলার কামলাবাজ গ্রামের শিশু মৌমাতা সরকার (৮)। গত ৩০ মে হাওরে বেড়াতে এসে নৌকার ছাদে উচ্চ শব্দে গান বাজানোর সঙ্গে দলবেঁধে নাচছিল তামিম ইসলাম (১৭)। একপর্যায়ে হঠাৎ পানিতে পড়ে ডুবে যায় সে। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়া গত বছরের ১৫ আগস্ট মা-বাবার সঙ্গে সিলেট থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে এসে নৌকার জানালা দিয়ে পানিতে পড়ে যায় পাঁচ বছর বয়সী শিশু মাসুম আহমদ।
লাইফ জ্যাকেট থাকলেও ব্যবহার নিশ্চিত নয়:
টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো বিশাল জলাভূমিতে পর্যটকদের নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান শর্ত পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করা। অথচ ২০২৪ সালের একটি দুর্ঘটনায় নিহত পর্যটক লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই পানিতে নেমেছিলেন বলে জানিয়েছিলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে নৌযানে লাইফ জ্যাকেট রাখা আর পর্যটককে তা পরানো কি একই বিষয়?
প্রশাসনের নতুন নির্দেশনায় পর্যটকবাহী নৌযানে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় রিং ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভ্রমণের আগে পর্যটকদের আচরণবিধি জানানো এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পর্যটক পরিবহন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব নির্দেশনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
নিয়ন্ত্রণহীন নৌযান, নেই অভিন্ন ব্যবস্থাপনা:
টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযানের সংখ্যা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব নৌযানের নিবন্ধন, নিরাপত্তা, ধারণক্ষমতা, চালকের দক্ষতা ও জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম ওপর কার্যকর নজরদারি নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
এ পরিস্থিতিতে চলতি আগস্টে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) সীমার মধ্যে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযানের প্রবেশ ও চলাচল নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে নৌযান নিবন্ধনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রশাসনের নির্দেশনায় নৌযানের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১০০ ফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও লাইফবয় রাখা, জরুরি যোগাযোগের নম্বর প্রদর্শন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পর্যটক পরিবহন বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নৌযান নিবন্ধনের জন্য ১০৭টি আবেদন করেছে। নিবন্ধনের পর নৌযানগুলোকে নিরাপত্তা কার্যক্রম নিশ্চিত করা, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী না নেওয়া এবং বিরূপ আবহাওয়ায় ভ্রমণ বন্ধ রাখাসহ বিভিন্ন শর্ত মানতে হবে।
দুর্ঘটনার পর উদ্ধারেই বড় পরীক্ষা:
টাঙ্গুয়ার হাওর বিশাল জলরাশি। এখানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করা এবং প্রশিক্ষিত ডুবুরি দিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গত ২৭ আগস্ট আব্দুল মাজেদ পিকলু পানিতে ডুবে যাওয়ার পর স্থানীয়রা প্রায় তিন ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে তার মরদেহ উদ্ধার করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
পর্যটন মৌসুমে হাওরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে স্থায়ী অথবা দ্রুত মোতায়েনযোগ্য উদ্ধার দল, নৌ অ্যাম্বুলেন্স, প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড এবং পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুর্ঘটনা ঠেকানোর বদলে ঘটনার পর ব্যবস্থা?
টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে সাধারণত উদ্ধার অভিযান, মরদেহ হস্তান্তর ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়েই আলোচনা হয়। কিন্তু দুর্ঘটনার আগে ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে কতটা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এই প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে আড়ালেই থেকে যায়।
ওয়াচ টাওয়ার, হাউসবোট নোঙর করার স্থান ও জনপ্রিয় গোসলের জায়গাগুলোতে পানির গভীরতা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, সাঁতার নিষেধাজ্ঞা ও লাইফগার্ডের উপস্থিতি সম্পর্কে দৃশ্যমান নির্দেশনা থাকা জরুরি। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও সাঁতার না জানা পর্যটকদের পানিতে নামা নিয়ন্ত্রণে নৌযান কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণ করা প্রয়োজন। শুধু ‘সাবধানে চলুন’ ধরনের সতর্কবার্তা দিয়ে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।
পর্যটন, নাকি ঝুঁকির বাণিজ্য?
টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। পরিকল্পিত ও নিরাপদ পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি হতে পারে। কিন্তু পর্যটন যদি পরিকল্পনাহীনভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে একদিকে হাওরের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে পর্যটকদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
প্রশাসনের সাম্প্রতিক ১৩ দফা নির্দেশনায় উচ্চস্বরে গান-বাজনা ও পার্টি নিষিদ্ধ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, সেপটিক ট্যাংক, লাইফ জ্যাকেট, লাইফবুয় ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনাই ইঙ্গিত দেয়, টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবস্থাপনাগত ঘাটতি ছিল।
দরকার সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা:
স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক আহাম্মদ কবির বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওরের পর্যটনকে নিরাপদ করতে হলে শুধু নৌযান নিবন্ধন করলেই হবে না। প্রয়োজন পর্যটন মৌসুমের আগে প্রতিটি নৌযানের ফিটনেস যাচাই, চালক ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ, ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গোসল নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বক্ষণিক উদ্ধারব্যবস্থা।’
তিনি আরো বলেন, ‘হাওরের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পটগুলোতে প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড নিয়োগ, দ্রুতগামী উদ্ধার নৌযান ও ডুবুরি দল প্রস্তুত রাখা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা দরকার। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর নতুন করে নির্দেশনা জারি করার চেয়ে দুর্ঘটনার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া বেশি জরুরি।’
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণকে কেন্দ্র করে অকাল মৃত্যু রোধে হাওরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের টহল জোরদার এবং লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার কঠোর নিয়ম প্রণয়ন করা জরুরি। হাউসবোটের ছাদ ও জানালায় রেলিং স্থাপনের পাশাপাশি পর্যটক ও হাউসবোট মালিক—উভয়ের জন্যই সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা নিশ্চিত করতে হবে।’
প্রকৃত মৃত্যুর হিসাব নেই:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত শুধু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে টাঙ্গুয়ার হাওরে অন্তত ছয়জন পর্যটকের পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে এর বাইরে হাউসবোটের ইঞ্জিনে পড়ে এক শিশুর মৃত্যুসহ আরো কয়েকটি দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটেছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন সংশ্লিষ্ট বেশির ভাগ মৃত্যুর ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহতের স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। ফলে পর্যটন সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর প্রকৃত ও নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান পুলিশের কাছে নেই। এতে প্রতিবছর টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে এসে কতজন পর্যটকের মৃত্যু হচ্ছে, তার সঠিক হিসাবও অজানা থেকে যাচ্ছে।
মধ্যনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম শাহাবুদ্দিন শাহীন বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওরে যারা ঘুরতে আসেন, তাদের অনেকেই সাঁতার জানেন না। ফলে অসাবধানতাবশত পানিতে নেমে পড়েন। এতে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এসব মৃত্যু রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
তবে এই আনন্দভ্রমণই কখনো কখনো পরিণত হচ্ছে স্বজন হারানোর বেদনায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকদের পানিতে ডুবে মৃত্যু, নৌযান থেকে পড়ে নিখোঁজ হওয়া এবং নৌযান-সংক্রান্ত দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। চলতি আগস্টেই মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে দুই পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। ৭ আগস্ট ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় গোসল করতে নেমে মারা যান ৭২ বছর বয়সী আলী আকবর খান।
আর ২৭ আগস্ট লামাগাঁও বাজারের পাশে মানাই নদীতে পর্যটকবাহী নৌকা থেকে পানিতে নেমে মারা যান ২৪ বছর বয়সী আব্দুল মাজেদ পিকলু।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব দুর্ঘটনার পেছনে শুধু পর্যটকদের অসাবধানতাই দায়ী নয়; রয়েছে অপরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থা, নৌযানের নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি, পর্যটকদের যথাযথ নিরাপত্তা নির্দেশনা না দেওয়া এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।
একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার:
রাজশাহী নগরের নওদাপাড়ার বাসিন্দা শিক্ষার্থী আবদুল মাজেদ (২৪) কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে বৃহস্পতিবার টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে আসেন। সকালে তাহিরপুর ঘাট থেকে হাউসবোটে হাওরের উদ্দেশে রওনা দেন তারা।
পথে লামাগাঁও এলাকার একটি স্থানীয় বাজারের ঘাটে বোটটি থামে। এ সময় কয়েকজন বন্ধু কেনাকাটার জন্য বোট থেকে নামেন। এরই মধ্যে গোসল করতে বোট থেকে পানিতে ঝাঁপ দেন মাজেদ। কিন্তু এরপর তিনি আর পানির ওপরে ভেসে ওঠেননি। পরে স্থানীয় লোকজন প্রায় তিন ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে তার মরদেহ উদ্ধার করেন।
এর আগে গত ৬ জুন পরিবারের সঙ্গে টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে এসে নৌকার ইঞ্জিনে পড়ে মারা যায় ধর্মপাশা উপজেলার কামলাবাজ গ্রামের শিশু মৌমাতা সরকার (৮)। গত ৩০ মে হাওরে বেড়াতে এসে নৌকার ছাদে উচ্চ শব্দে গান বাজানোর সঙ্গে দলবেঁধে নাচছিল তামিম ইসলাম (১৭)। একপর্যায়ে হঠাৎ পানিতে পড়ে ডুবে যায় সে। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়া গত বছরের ১৫ আগস্ট মা-বাবার সঙ্গে সিলেট থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে এসে নৌকার জানালা দিয়ে পানিতে পড়ে যায় পাঁচ বছর বয়সী শিশু মাসুম আহমদ।
লাইফ জ্যাকেট থাকলেও ব্যবহার নিশ্চিত নয়:
টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো বিশাল জলাভূমিতে পর্যটকদের নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান শর্ত পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করা। অথচ ২০২৪ সালের একটি দুর্ঘটনায় নিহত পর্যটক লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই পানিতে নেমেছিলেন বলে জানিয়েছিলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে নৌযানে লাইফ জ্যাকেট রাখা আর পর্যটককে তা পরানো কি একই বিষয়?
প্রশাসনের নতুন নির্দেশনায় পর্যটকবাহী নৌযানে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় রিং ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভ্রমণের আগে পর্যটকদের আচরণবিধি জানানো এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পর্যটক পরিবহন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব নির্দেশনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
নিয়ন্ত্রণহীন নৌযান, নেই অভিন্ন ব্যবস্থাপনা:
টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযানের সংখ্যা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব নৌযানের নিবন্ধন, নিরাপত্তা, ধারণক্ষমতা, চালকের দক্ষতা ও জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম ওপর কার্যকর নজরদারি নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
এ পরিস্থিতিতে চলতি আগস্টে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) সীমার মধ্যে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযানের প্রবেশ ও চলাচল নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে নৌযান নিবন্ধনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রশাসনের নির্দেশনায় নৌযানের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১০০ ফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও লাইফবয় রাখা, জরুরি যোগাযোগের নম্বর প্রদর্শন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পর্যটক পরিবহন বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নৌযান নিবন্ধনের জন্য ১০৭টি আবেদন করেছে। নিবন্ধনের পর নৌযানগুলোকে নিরাপত্তা কার্যক্রম নিশ্চিত করা, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী না নেওয়া এবং বিরূপ আবহাওয়ায় ভ্রমণ বন্ধ রাখাসহ বিভিন্ন শর্ত মানতে হবে।
দুর্ঘটনার পর উদ্ধারেই বড় পরীক্ষা:
টাঙ্গুয়ার হাওর বিশাল জলরাশি। এখানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করা এবং প্রশিক্ষিত ডুবুরি দিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গত ২৭ আগস্ট আব্দুল মাজেদ পিকলু পানিতে ডুবে যাওয়ার পর স্থানীয়রা প্রায় তিন ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে তার মরদেহ উদ্ধার করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
পর্যটন মৌসুমে হাওরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে স্থায়ী অথবা দ্রুত মোতায়েনযোগ্য উদ্ধার দল, নৌ অ্যাম্বুলেন্স, প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড এবং পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুর্ঘটনা ঠেকানোর বদলে ঘটনার পর ব্যবস্থা?
টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে সাধারণত উদ্ধার অভিযান, মরদেহ হস্তান্তর ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়েই আলোচনা হয়। কিন্তু দুর্ঘটনার আগে ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে কতটা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এই প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে আড়ালেই থেকে যায়।
ওয়াচ টাওয়ার, হাউসবোট নোঙর করার স্থান ও জনপ্রিয় গোসলের জায়গাগুলোতে পানির গভীরতা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, সাঁতার নিষেধাজ্ঞা ও লাইফগার্ডের উপস্থিতি সম্পর্কে দৃশ্যমান নির্দেশনা থাকা জরুরি। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও সাঁতার না জানা পর্যটকদের পানিতে নামা নিয়ন্ত্রণে নৌযান কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণ করা প্রয়োজন। শুধু ‘সাবধানে চলুন’ ধরনের সতর্কবার্তা দিয়ে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।
পর্যটন, নাকি ঝুঁকির বাণিজ্য?
টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। পরিকল্পিত ও নিরাপদ পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি হতে পারে। কিন্তু পর্যটন যদি পরিকল্পনাহীনভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে একদিকে হাওরের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে পর্যটকদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
প্রশাসনের সাম্প্রতিক ১৩ দফা নির্দেশনায় উচ্চস্বরে গান-বাজনা ও পার্টি নিষিদ্ধ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, সেপটিক ট্যাংক, লাইফ জ্যাকেট, লাইফবুয় ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনাই ইঙ্গিত দেয়, টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবস্থাপনাগত ঘাটতি ছিল।
দরকার সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা:
স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক আহাম্মদ কবির বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওরের পর্যটনকে নিরাপদ করতে হলে শুধু নৌযান নিবন্ধন করলেই হবে না। প্রয়োজন পর্যটন মৌসুমের আগে প্রতিটি নৌযানের ফিটনেস যাচাই, চালক ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ, ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গোসল নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বক্ষণিক উদ্ধারব্যবস্থা।’
তিনি আরো বলেন, ‘হাওরের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পটগুলোতে প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড নিয়োগ, দ্রুতগামী উদ্ধার নৌযান ও ডুবুরি দল প্রস্তুত রাখা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা দরকার। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর নতুন করে নির্দেশনা জারি করার চেয়ে দুর্ঘটনার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া বেশি জরুরি।’
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণকে কেন্দ্র করে অকাল মৃত্যু রোধে হাওরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের টহল জোরদার এবং লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার কঠোর নিয়ম প্রণয়ন করা জরুরি। হাউসবোটের ছাদ ও জানালায় রেলিং স্থাপনের পাশাপাশি পর্যটক ও হাউসবোট মালিক—উভয়ের জন্যই সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা নিশ্চিত করতে হবে।’
প্রকৃত মৃত্যুর হিসাব নেই:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত শুধু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে টাঙ্গুয়ার হাওরে অন্তত ছয়জন পর্যটকের পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে এর বাইরে হাউসবোটের ইঞ্জিনে পড়ে এক শিশুর মৃত্যুসহ আরো কয়েকটি দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটেছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন সংশ্লিষ্ট বেশির ভাগ মৃত্যুর ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহতের স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। ফলে পর্যটন সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর প্রকৃত ও নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান পুলিশের কাছে নেই। এতে প্রতিবছর টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে এসে কতজন পর্যটকের মৃত্যু হচ্ছে, তার সঠিক হিসাবও অজানা থেকে যাচ্ছে।
মধ্যনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম শাহাবুদ্দিন শাহীন বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওরে যারা ঘুরতে আসেন, তাদের অনেকেই সাঁতার জানেন না। ফলে অসাবধানতাবশত পানিতে নেমে পড়েন। এতে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এসব মৃত্যু রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন