​রংপুরে চার খুনের রহস্যে নতুন মোড়

রাত ২টা ৪০ মিনিটে বোনকে ফোন করেছিলেন নিহত প্রীতিলতা

আপলোড সময় : ২৮-০৮-২০২৬ ০১:৩২:৩৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৮-০৮-২০২৬ ০১:৩২:৩৫ অপরাহ্ন
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক বিবৃতির সঙ্গে সংগৃহীত তথ্যের একাধিক অসংগতি ও অমিল খুঁজে পেয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। হত্যাকাণ্ডের সময়রেখা, ফরেনসিক আলামত এবং পারিপার্শ্বিক ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংস্থাটি পুরো বিষয়টি বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত প্রমাণের ভিত্তিতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) প্রকাশিত আসকের প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। এর আগে সংস্থাটির দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত ২৪ ও ২৫ আগস্ট রংপুরে সরেজমিন তদন্ত চালায়। তারা নিহতদের স্বজন, প্রতিবেশী, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার, স্থানীয় থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), মর্গ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করেন।

আসকের প্রতিবেদনে ঘটনার সময়রেখা নিয়ে বড় ধরনের একটি প্রশ্নের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তীর বরাতে জানা যায়, গত ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টায় তার বোনের সঙ্গে স্বাভাবিক কথা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে প্রীতিলতার মুঠোফোন থেকে পূজার নম্বরে একটি কল এসেছিল, যা তিনি সে সময় ধরতে পারেননি। অন্যদিকে পুলিশের দেওয়া ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ রাতের দিকে অভিযুক্তরা বাসার ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবনের সময় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা হয় এবং এরপর ভোরে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটে।

আসকের মতে, রাত ২টা ৪০ মিনিটের এই রহস্যজনক ফোনকলটি কে করেছিল, তখন ফোনের ভৌগোলিক অবস্থান কোথায় ছিল এবং এরপর কখন পরিবারের সব ফোন বন্ধ হয়ে যায়—তা কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) ও ডিজিটাল ফরেনসিকের মাধ্যমে অবিলম্বে যাচাই করা প্রয়োজন। পুলিশের দাবি করা সময়ের সঙ্গে এই ফোনকলের সময়ের কোনো গরমিল রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা তদন্তের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

পুলিশ কমিশনারের দাবি অনুযায়ী, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় পরিচয় গোপন রাখতে চারজনকে একে একে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় এবং খুনের পর আসামিরা ওই বাসায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করে খাবার খেয়েছিল। আসক এই ব্যাখ্যার সত্যতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন ফরেনসিক পরীক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য, অভিযুক্তরা যদি দীর্ঘ সময় বাসায় অবস্থান করে এবং খাবার খায়, তবে ঘরের আসবাব, রান্নাঘর, পাত্র, বাথরুম ও স্পর্শকাতর স্থানগুলো থেকে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, ত্বকের কোষ ও চুলসহ প্রয়োজনীয় জৈবিক আলামত সংগ্রহ ও মেলানো হয়েছে কি না, তা আদালতের সামনে স্পষ্ট করা উচিত।

এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের রাতে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংস্থাটি। পুলিশের পক্ষ থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা এড়ানোর আশঙ্কার কথা বলা হলেও, ঠিক কখন, কীভাবে এবং কারা এই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল, তা প্রযুক্তিগতভাবে প্রমাণ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

তথ্যানুসন্ধানকালে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের পরিবারের সঙ্গেও কথা বলেন আসক প্রতিনিধিরা। সিদ্ধার্থের বাবা আটকের সময় ছেলের পোশাক বদল ও ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং অপর অভিযুক্ত সীমান্তের পরিবারও তাদের বক্তব্য তুলে ধরে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সঙ্গে আসক প্রতিনিধিরা সরাসরি কথা বলতে না পারলেও মর্গের কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। মর্গের সহকারীরা মরদেহে পচনের লক্ষণ ও আঘাতের কথা জানালেও যৌন নির্যাতনের দৃশ্যমান কোনো আলামত দেখেননি বলে জানান। তবে আসক স্পষ্ট করেছে যে মর্গের কর্মীদের চাক্ষুষ ধারণাই শেষ কথা নয়; বরং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, আঘাতের ধরন ও নির্যাতনের বিষয়গুলো সিআইডির ল্যাব ও ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিক রাসায়নিক প্রতিবেদনের মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে হবে।

রংপুর ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং বিভ্রান্তি এড়াতে সব আলামত যাচাই করা হচ্ছে। তবে আসকের মতে, সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হওয়া সংশয় দূর করতে এবং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে অনুমানের ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি সূত্রের নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক তদন্ত আবশ্যক।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচকে/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :