একসময় যে বয়লারে জ্বলত ঝুট, সেই বয়লারেই এখন জ্বলছে কাঠ। কারণ গ্যাস নেই, আর ঝুটের দামও নাগালের বাইরে। ফলে জ্বালানি সংকটের মুখে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ না করে কোনোভাবে কারখানা সচল রাখতে নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে এখন কাঠই হয়ে উঠেছে অনেক কারখানার বিকল্প জ্বালানি।
নরসিংদীর চৌয়ালা শিল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক কারখানার বয়লারে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। ধোঁয়ায় ভারী হয়ে উঠছে আশপাশের পরিবেশ। শ্রমিকরা কাঠ কেটে বয়লারে দিচ্ছেন, আর সেই আগুনে কোনোভাবে সচল রাখার চেষ্টা চলছে শিল্পের চাকা।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য বলছে, জেলার অন্তত ১০০টি ছোট-বড় টেক্সটাইল কারখানায় বর্তমানে জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ৫০টি কারখানা আংশিক উৎপাদন সচল রাখতে কাঠ পোড়াচ্ছে। আর ঝুটের দাম বেড়ে যাওয়ায় আরও প্রায় ৫০টি কারখানা কাঠকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বেছে নিয়েছে।
হক টেক্সটাইলের বয়লার অপারেটর মো. সাখাওয়াত বলেন, আগে বয়লার চালাতে ঝুট ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ঝুটের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন কাঠ পোড়াতে হচ্ছে। প্রতিদিন একটি কারখানাতেই ১২ হাজার টাকার বেশি কাঠ পোড়ানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।
শুধু হক টেক্সটাইল নয়, ইউনিফিল টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন কারখানাতেও একই চিত্র। ইউনিফিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপক কাউসার হোসেন বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে কাঠ ব্যবহার করছেন। এরপরও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। গ্যাস সংকটের কারণে ক্রেতাদের অর্ডার পর্যন্ত বাতিল করতে হচ্ছে।
তার দাবি, শুধু নরসিংদী শহরেই সম্প্রতি প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি কারখানা আবার কাঠ ব্যবহার শুরু করেছে। পুরো জেলার চিত্র আরও বড়।
তবে শিল্প টিকিয়ে রাখার এই বিকল্প ব্যবস্থাই এখন নতুন করে তৈরি করছে পরিবেশগত শঙ্কা।
নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ বদরুল হুদা বলেন, যেসব কারখানা ঝুট ব্যবহার করে, তাদের জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহারের অনুমতি নেই। সরকারি বা বেসরকারি গাছ কাটার ক্ষেত্রেও বন বিভাগের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব নিয়ম মানা হচ্ছে না।
পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে কাঠের ব্যবহার সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এদিকে কাঠের আগুনে কয়েকটি কারখানা কোনোভাবে উৎপাদন চালিয়ে গেলেও গ্যাসের সংকটে জেলার শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বা ব্যাহত হয়েছে। কোথাও পুরোপুরি বন্ধ, কোথাও চলছে সীমিত পরিসরে।
নরসিংদীতে ছোট-বড় মিলিয়ে তিন হাজারেরও বেশি শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার ৫০০টি টেক্সটাইল, ডাইং, সাইজিং, স্পিনিং ও তৈরি পোশাক কারখানা। প্রায় ৪০০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরাসরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য এসব কারখানায় ১০ থেকে ১৫ পিএসআই চাপের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস প্রয়োজন।
কিন্তু বর্তমানে অনেক শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। ফলে কারখানার মেশিন বন্ধ, বয়লার বন্ধ, উৎপাদন বন্ধ। এতে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শ্রমিকরা।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশন, নরসিংদীর চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া লিটন বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে নরসিংদী ও মাধবদীর প্রায় ৮০ শতাংশ মিল বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকের সুদ, ইউটিলিটি বিলসহ অন্যান্য খরচ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, নরসিংদী দেশের কাপড়ের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করে। তাই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
আর আবেদ টেক্সটাইল প্রসেসিং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনের হিসাবে, গ্যাস সংকটের কারণে নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
শুধু উৎপাদন বন্ধ নয়- মাস শেষে শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকের সুদ, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিলসহ নানা খরচ পরিশোধ করা নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় উদ্বেগ। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ও শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন শিল্পমালিকরা।
তিতাস গ্যাসের নরসিংদী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আবাসিক-বাণিজ্যিক গ্রাহক, ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা এবং শিল্প ইউনিটসহ জেলায় মাসে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৩ কোটি ঘনমিটার।
তিতাস গ্যাসের নরসিংদী কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. মাকসুদুর রহমান বলেন, সংকটের কারণে কারখানা মালিকদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
প্রশ্ন এখন একটাই- গ্যাসের সংকট কতদিন থাকবে?
কারণ গ্যাস না থাকলে কারখানার মেশিন থেমে যায়। ঝুটের দাম বাড়লে বয়লারের খরচ বাড়ে। আর কাঠ পোড়ালে বাড়ে পরিবেশের ঝুঁকি। সব মিলিয়ে নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে এখন টিকে থাকার লড়াই চলছে এক অদ্ভুত সমীকরণে- গ্যাস নেই, তাই জ্বলছে কাঠ; কিন্তু এই আগুনে কতদিন টিকে থাকবে শিল্পের চাকা?
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
নরসিংদীর চৌয়ালা শিল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক কারখানার বয়লারে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। ধোঁয়ায় ভারী হয়ে উঠছে আশপাশের পরিবেশ। শ্রমিকরা কাঠ কেটে বয়লারে দিচ্ছেন, আর সেই আগুনে কোনোভাবে সচল রাখার চেষ্টা চলছে শিল্পের চাকা।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য বলছে, জেলার অন্তত ১০০টি ছোট-বড় টেক্সটাইল কারখানায় বর্তমানে জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ৫০টি কারখানা আংশিক উৎপাদন সচল রাখতে কাঠ পোড়াচ্ছে। আর ঝুটের দাম বেড়ে যাওয়ায় আরও প্রায় ৫০টি কারখানা কাঠকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বেছে নিয়েছে।
হক টেক্সটাইলের বয়লার অপারেটর মো. সাখাওয়াত বলেন, আগে বয়লার চালাতে ঝুট ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ঝুটের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন কাঠ পোড়াতে হচ্ছে। প্রতিদিন একটি কারখানাতেই ১২ হাজার টাকার বেশি কাঠ পোড়ানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।
শুধু হক টেক্সটাইল নয়, ইউনিফিল টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন কারখানাতেও একই চিত্র। ইউনিফিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপক কাউসার হোসেন বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে কাঠ ব্যবহার করছেন। এরপরও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। গ্যাস সংকটের কারণে ক্রেতাদের অর্ডার পর্যন্ত বাতিল করতে হচ্ছে।
তার দাবি, শুধু নরসিংদী শহরেই সম্প্রতি প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি কারখানা আবার কাঠ ব্যবহার শুরু করেছে। পুরো জেলার চিত্র আরও বড়।
তবে শিল্প টিকিয়ে রাখার এই বিকল্প ব্যবস্থাই এখন নতুন করে তৈরি করছে পরিবেশগত শঙ্কা।
নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ বদরুল হুদা বলেন, যেসব কারখানা ঝুট ব্যবহার করে, তাদের জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহারের অনুমতি নেই। সরকারি বা বেসরকারি গাছ কাটার ক্ষেত্রেও বন বিভাগের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব নিয়ম মানা হচ্ছে না।
পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে কাঠের ব্যবহার সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এদিকে কাঠের আগুনে কয়েকটি কারখানা কোনোভাবে উৎপাদন চালিয়ে গেলেও গ্যাসের সংকটে জেলার শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বা ব্যাহত হয়েছে। কোথাও পুরোপুরি বন্ধ, কোথাও চলছে সীমিত পরিসরে।
নরসিংদীতে ছোট-বড় মিলিয়ে তিন হাজারেরও বেশি শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার ৫০০টি টেক্সটাইল, ডাইং, সাইজিং, স্পিনিং ও তৈরি পোশাক কারখানা। প্রায় ৪০০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরাসরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য এসব কারখানায় ১০ থেকে ১৫ পিএসআই চাপের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস প্রয়োজন।
কিন্তু বর্তমানে অনেক শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। ফলে কারখানার মেশিন বন্ধ, বয়লার বন্ধ, উৎপাদন বন্ধ। এতে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শ্রমিকরা।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশন, নরসিংদীর চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া লিটন বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে নরসিংদী ও মাধবদীর প্রায় ৮০ শতাংশ মিল বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকের সুদ, ইউটিলিটি বিলসহ অন্যান্য খরচ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, নরসিংদী দেশের কাপড়ের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করে। তাই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
আর আবেদ টেক্সটাইল প্রসেসিং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনের হিসাবে, গ্যাস সংকটের কারণে নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
শুধু উৎপাদন বন্ধ নয়- মাস শেষে শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকের সুদ, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিলসহ নানা খরচ পরিশোধ করা নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় উদ্বেগ। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ও শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন শিল্পমালিকরা।
তিতাস গ্যাসের নরসিংদী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আবাসিক-বাণিজ্যিক গ্রাহক, ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা এবং শিল্প ইউনিটসহ জেলায় মাসে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৩ কোটি ঘনমিটার।
তিতাস গ্যাসের নরসিংদী কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. মাকসুদুর রহমান বলেন, সংকটের কারণে কারখানা মালিকদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
প্রশ্ন এখন একটাই- গ্যাসের সংকট কতদিন থাকবে?
কারণ গ্যাস না থাকলে কারখানার মেশিন থেমে যায়। ঝুটের দাম বাড়লে বয়লারের খরচ বাড়ে। আর কাঠ পোড়ালে বাড়ে পরিবেশের ঝুঁকি। সব মিলিয়ে নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে এখন টিকে থাকার লড়াই চলছে এক অদ্ভুত সমীকরণে- গ্যাস নেই, তাই জ্বলছে কাঠ; কিন্তু এই আগুনে কতদিন টিকে থাকবে শিল্পের চাকা?
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন