গহনার গ্রাম মহেশপুরে স্বাবলম্বী হাজারো নারী-পুরুষ

আপলোড সময় : ১৮-০৮-২০২৬ ০২:৩০:৩৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৮-০৮-২০২৬ ০২:৩২:৩৭ অপরাহ্ন
সংসারের কাজের ফাঁকে ঘরে বসেই গহনা তৈরি করে আয় করছেন ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার হাজার হাজার নারী। কেউ তৈরি করছেন কানের দুল, কেউ আংটি, আবার কেউ তৈরি করছেন আধুনিক ডিজাইনের চিক, সীতাহার ও রুলি। নারীদের পাশাপাশি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন স্থানীয় পুরুষরাও।

দীর্ঘদিনের চর্চায় সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে গড়ে উঠেছে ইমিটেশনের গহনা তৈরির বড় একটি শিল্প। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার নারী-পুরুষ সরাসরি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একদিকে যেমন সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান, অন্যদিকে ঘরে বসে আয় করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন গ্রামের নারীরা।

স্থানীয়ভাবে এসব এলাকা এখন পরিচিতি পেয়েছে ‘ইমিটেশনের গহনার গ্রাম’ হিসেবে। এখানকার তৈরি গহনার মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা আসেন গহনা কিনতে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব গহনা যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে।

মহেশপুর পৌরসভার নৌদা গ্রামের গৃহবধূ সোনিয়া খাতুন প্রায় ১৪-১৫ বছর ধরে গহনা তৈরির কাজ করছেন। তিনি বলেন, সংসারের কাজের ফাঁকে প্রতিদিন গহনা তৈরির কাজ করি। এতে প্রায় ৫০০ টাকা আয় হয়। আমার মতো এই গ্রামের হাজার হাজার নারী গহনা তৈরির কাজ করেন। বিয়ের পর এই গ্রামে এসে কাজটি শিখেছি। আগে কিছুই পারতাম না, এখন প্রায় সব ধরনের গহনা তৈরি করতে পারি।

একই গ্রামের গৃহবধূ রহিমা বলেন, আমাদের এলাকায় প্রায় ২০ বছর আগে গহনা তৈরির কাজ শুরু হয়। তখন থেকেই আমি এ কাজের সঙ্গে জড়িত। সংসারের কাজ শেষ করে প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা কাজ করি। এতে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়।

শুধু নারীরাই নন, গহনা তৈরি, নকশা, রং করা, বাজারজাতকরণসহ বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় পুরুষরাও। ছোট-বড় মিলিয়ে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি কারখানা।

কারখানা মালিক শান্ত বলেন, আমার কারখানায় ৫-৬ জন কর্মচারী কাজ করেন। প্রায় ৭-৮ বছর ধরে আমি এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। প্রতি মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকার গহনা বিক্রি হয়। রং করার কাজ ছাড়া গহনা তৈরির প্রায় সব কাজই এখানে করা হয়।

আরেক কারখানা মালিক ইমরান হোসেন বলেন, সিটি গোল্ডের গহনা তৈরির কারণে আমাদের এলাকার হাজার হাজার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া গেলে ব্যবসাটি আরও বড় করা সম্ভব। এতে আরও মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

তিনি আরও বলেন, গহনা তৈরির বেশিরভাগ কাঁচামাল ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। সব সময় কাঁচামাল পাওয়া যায় না। এসব কাঁচামাল দেশে উৎপাদনের ব্যবস্থা করা গেলে আমাদের জন্য অনেক সুবিধা হবে।

স্থানীয় সিটি গোল্ড ব্যাবসায়ী রিপনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০৪ সালের দিকে মহেশপুর উপজেলায় ‘সিটি গোল্ড’ নামে ইমিটেশনের গহনা তৈরির কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে এর পরিধি বাড়তে থাকে। বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে অর্ধশতাধিক কারখানায় তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ইমিটেশনের গহনা।একসময় যেখানে ছোট আকারের কানের দুল কিংবা আংটি তৈরির মধ্যেই কাজ সীমাবদ্ধ ছিল, বর্তমানে সেখানে তৈরি হচ্ছে আধুনিক নকশার বিভিন্ন গহনা। কারিগরদের দক্ষতা ও স্থানীয় শ্রমশক্তিকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্প এখন মহেশপুরের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ, নিয়মিত কাঁচামালের সরবরাহ এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে মহেশপুরের এই শিল্প আরও বড় পরিসরে বিকশিত হতে পারে। এতে স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি দেশের চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সীমান্তবর্তী এলাকার হাজারো মানুষের হাতে তৈরি এসব গহনা শুধু সাজসজ্জার উপকরণ নয় এখন তা হয়ে উঠেছে কর্মসংস্থান, নারীর স্বাবলম্বীতা ও স্থানীয় অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।

মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, মহেশপুরের চারটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার নারী ও পুরুষ সিটি গোল্ডের গহনা তৈরির সঙ্গে জড়িত। এই শিল্পকে কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :