​হাসি নেই পানচাষিদের মুখে

আপলোড সময় : ১৮-০৮-২০২৬ ০১:০৫:৩০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৮-০৮-২০২৬ ০১:০৫:৩০ অপরাহ্ন
বরজে পান উৎপাদন হচ্ছে, হাটে সরবরাহও কম নয়—তবু হাসি নেই রাজশাহীর পানচাষিদের মুখে। একদিকে সার, কীটনাশক, বাঁশ, খড়, শ্রমিকের মজুরি ও সেচসহ পানবরজের আনুষঙ্গিক খরচ বেড়েছে; অন্যদিকে বাজারে মিলছে না প্রত্যাশিত দাম। ফলে দীর্ঘদিনের শ্রম ও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেও উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন চাষিরা। এতে পান চাষে লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা দিন দিন তীব্র হচ্ছে।

রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার অন্যতম বড় পানবাজার মৌগাছি হাটে গেলেই কৃষকদের এই হতাশার চিত্র চোখে পড়ে। ভোর থেকে বিভিন্ন এলাকা থেকে ভ্যান, অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনে করে পান নিয়ে হাটে আসছেন চাষিরা। ক্রেতাদের সঙ্গে দরদাম করেও অনেকে কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারদরের অসামঞ্জস্য নিয়ে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট)  সকালে দুর্গাপুরের শ্যামপুর পান হাটে দেখা যায়, বিভিন্ন আকার ও মানের পান নিয়ে কৃষকেরা ক্রেতাদের অপেক্ষায় রয়েছেন। বর্তমানে এক বিড়া অর্থাৎ ৬৪টি ছোট আকারের পান ২০ থেকে ২৫ টাকা, মাঝারি আকারের পান ৩৫ থেকে ৫০ টাকা এবং তুলনামূলক ভালো মানের বড় পান ৭০ থেকে ৮০ টাকা বিড়া দরে বিক্রি হচ্ছে।

চাষিরা জানান, গত সপ্তাহে পানের দাম আরও কম ছিল। চলতি হাটে কিছুটা দাম বাড়লেও তা উৎপাদন খরচের তুলনায় এখনো অপ্রতুল। বরজ থেকে এক বিড়া পান তুলতেই প্রায় ৭ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হলে প্রকৃত উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যায়।

মোহনপুরের কেশরহাট এলাকার পানচাষি রফিক ইসলাম বলেন, দুই বিঘা জমিতে পানবরজ করতে তার তিন লাখ টাকারও বেশি খরচ হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ৩৫ টাকা বিড়া দরে পান বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচই উঠছে না বলে জানান তিনি।

তার ভাষায়, পান চাষে বিনিয়োগ অনেক বেশি। রোগবালাই বা পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে অতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগ করতে হয়। আবার অতিবৃষ্টি বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন করে অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে বাজারে ভালো দাম না পেলে লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না।

মৌগাছি এলাকার পানচাষি জাহাঙ্গীর বলেন, ১৫ দিন আগেও পানের দাম বর্তমানের চেয়ে কম ছিল। এখন কিছুটা বাড়লেও কৃষকের খরচের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। তার দাবি, এক বিড়া পানের দাম অন্তত ১০০ টাকার ওপরে থাকলে চাষিরা কিছুটা লাভের মুখ দেখতে পারবেন।

চাষিদের অভিযোগ, উৎপাদন পর্যায়ে তারা যে দাম পান এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পান যে দামে বিক্রি হয়, তার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে পান ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর কারণে কৃষক ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও অভিযোগ তাদের।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ৫ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছে। এ বছর পানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮৬ হাজার ৮২৪ টন।

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, চলতি মৌসুমে পানের উৎপাদন তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে চাহিদা না বাড়ায় দাম কমেছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সাধারণত পানের দাম কিছুটা কম থাকে। শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়ে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, উৎপাদনের তুলনায় কোনো পণ্যের চাহিদা কম থাকলে স্বাভাবিকভাবেই তার দাম কমে যায়। বর্তমানে পানের উৎপাদন বেশি এবং বাজারে চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় কৃষক কম দাম পাচ্ছেন।

রাজশাহীর পান স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি একসময় দেশের বাইরেও রপ্তানি হতো। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাজশাহীর পানের বড় একটি বাজার সংকুচিত হয়েছে। ফলে উৎপাদন বাড়লেও অতিরিক্ত পান বাজারে সরবরাহ হয়ে দাম কমে যাচ্ছে।

কৃষকদের মতে, পান সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজার সম্প্রসারণ এবং রপ্তানির সুযোগ পুনরায় তৈরি করা গেলে এই সংকট অনেকটাই কমতে পারে।

কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে পানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ, পরিবহন ও রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে হবে। তা না হলে ঐতিহ্যবাহী এ অর্থকরী ফসলের সঙ্গে যুক্ত হাজারো কৃষক ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

বাংলা স্কুপ/প্রতিনিধি/এইচবি/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :