শিপইয়ার্ড যেন মৃত্যুপুরী, এক যুগে কেড়ে নিয়েছে ১৪৮ প্রাণ

আপলোড সময় : ১৫-০৮-২০২৬ ০২:৩০:৫৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৫-০৮-২০২৬ ০২:৩০:৫৯ অপরাহ্ন
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড কিংবা জাহাজভাঙা শিল্পে ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই কাজ করছেন এখানকার শ্রমিকরা। গত এক যুগে এই শিল্পে দুর্ঘটনায় ১৪৮ জন নিহত এবং ২৭৯ জন আহত হয়েছেন। একসময় ১৬০টি ছোট-বড় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড থাকলেও বর্তমানে তা কমে ২৩টিতে ঠেকেছে। চালু থাকা ২৩টি ইয়ার্ড গ্রিন হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্ট্যাডিজের (বিলস) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিলস ডিটিডিএ প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, ‘গত ১২ বছরে জাহাজভাঙা শিল্পে ১৪৮ জন নিহতসহ আহত হয়েছেন ২৭৯ জন। এর মধ্যে ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১ জন, আহত ৪০। ২০২৫ সালে দুর্ঘটনায় চার জন নিহত এবং ৫৪ জন আহত হন। ২০২৪ সালে দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত এবং ২২ জন আহত হন। ২০২৩ সালে দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত ও ২৮ জন আহত হয়েছেন। ২০২২ সালে ৭ জন নিহত হন। ২০২১ সালে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ১৩ জন নিহত এবং ৪৩ জন আহত হন। ২০২০ সালে দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহত এবং ২৯ জন আহত হন। ২০১৯ সালে দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৩৪ জন আহত হন। ২০১৮ সালে দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ৪ জন আহত হন। ২০১৭ সালে দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত এবং ২০ জন আহত হন। ২০১৬ সালে দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত এবং ৫ জন আহত হন। ২০১৫ সালে দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহতের ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামে এসব জাহাজভাঙা কারখানা বা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগরের পাড় ঘেঁষে সীতাকুণ্ড উপজেলায়।’

সর্বশেষ শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল নামের একটি কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় দুর্ঘটনা ঘটে। এতে বিষাক্ত গ্যাসে বিষক্রিয়া হয়ে মারা যান ৮ শ্রমিক। যে জাহাজটি কাটা হচ্ছিল সেটি এলএনজি পরিবহন করতো। এ ঘটনায় আরও ১৪ জন শ্রমিক আহতের ঘটনা ঘটে।

জাহাজভাঙা শিল্পে কর্মরত কয়েকজন শ্রমিক জানান, এ জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ কাটার সময় নানাভাবে শ্রমিক আহত-নিহতের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে কেউ কাজ করার সময় রাডার ভেঙে পড়া, ম্যাগনেটের হুক লাগাতে গিয়ে আহত, অগ্নি দুর্ঘটনা, ভারী লোহার খণ্ড পড়া, অক্সিজেন টিউবের জয়েন্ট বিস্ফোরণ, জাহাজ কাটার সময় আগুনের ফুল্কি ছিটকে এবং গ্যাসে বিষক্রিয়ায় আহত-নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড কয়েকজন শ্রমিক দুর্ঘটনা সম্পর্কে বলেন, ‘জাহাজটির এলএনজি ট্যাংক কাটার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। জাহাজের তলায় থাকা একটি ট্যাংক কাটার কাজ চলছিল। শুক্রবার সকালেও শ্রমিকরা সেখানে কাজ করছিলেন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ফোরম্যান সাত-আটজন শ্রমিক ও কাটারম্যান নিয়ে একটি ট্যাংকের চারপাশ গোল করে কাটেন। এরপর সেখান থেকে সরে যান। প্রায় ১০ মিনিট পর গর্তটি পুরোপুরি খোলার জন্য সেখানে গেলে প্রথমে দুই শ্রমিক জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে আরও দুই শ্রমিক গ্যাসে আক্রান্ত হন। এরপর কাটিং ফোরম্যান তাদের উদ্ধারে এগিয়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। কী ঘটেছে, তা দেখতে একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা মুখে মাস্ক পরে সেখানে যান। তিনিও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।’

শুভ দাস নামে এক নিহত শ্রমিকের ভাই জানান, আহত শ্রমিকরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাননি। কারখানাটিতে নিজস্ব কোনও অ্যাম্বুলেন্স ছিল না। দুর্ঘটনার পর কারখানার প্রধান ফটক বন্ধ রাখা হয়। মালিক পক্ষ বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করে। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে না নেওয়ার কারণে নিহতের সংখ্যা বেড়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

এ প্রসঙ্গে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত বলেন, ‘ঝুঁকি নিয়ে জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকরা কাজ করছেন। এখানে নিরাপত্তার বিষয়টি বড় সমস্যা হয়ে আছে। আজকের এ দুর্ঘটনার জন্য শিপইয়ার্ড মালিকপক্ষের একার অবহেলা নয়, এখানে তদারকিতে দায়িত্বরত সরকারি অনেকগুলো সংস্থা জড়িত আছে। তাদেরও সমান অবহেলা রয়েছে। কোনও ধরনের নিরাপত্তা সামগ্রী ব্যতীত শ্রমিকরা জাহাজ কাটার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে আমি মনে করি।’ 

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সহকারী সচিব নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে সংগঠনের পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। যদিও আইনে আছে ৭ লাখ টাকা করে। একইভাবে যারা আহত আছেন তাদের সুচিকিৎসা যাতে নিশ্চিত হয় সেজন্য চেষ্টা চলছে। দুর্ঘটনার কারণ জানতে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একসময় সীতাকুণ্ড ছোট-বড় প্রায় ১৬০টি স্ক্র্যাপ জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ড ছিল। বর্তমানে ২৩টি ইয়ার্ড চালু আছে। সবকয়টি গ্রিন শিপইয়ার্ড। এসব ইয়ার্ডে কমপক্ষে ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন।’
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 


 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :