​বাংলাদেশে ১৮ জন রাষ্ট্রপতি: কে, কতদিন দায়িত্বে ছিলেন?

আপলোড সময় : ১৩-০৮-২০২৬ ০৪:০৩:৩৬ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৩-০৮-২০২৬ ০৫:১৭:৩৪ অপরাহ্ন
বাংলাদেশের সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুন পদত্যাগ করেন। আপাতত অস্থায়ীভাবে এই দায়িত্ব পালন করছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১৮ জন ব্যক্তি ২২ মেয়াদে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে ১০ জনই তাদের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি এবং সাতজন পদত্যাগ করেছিলেন।

রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালে দুজন নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্দোলনের কারণে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন কিংবা বঙ্গভবন ছাড়তে হয় আটজনকে।

বাংলাদেশের ১৮ জন রাষ্ট্রপতির নাম ও তাদের কার্যকাল—

শেখ মুজিবুর রহমান
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করে শপথ নিয়েছিল মুজিবনগর সরকার। তিনি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত এই পদে ছিলেন তিনি। তবে দেশে ফিরে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

তিন বছর পর সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করে দেশে রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকার প্রবর্তন করা হয় এবং ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পুনরায় রাষ্ট্রপতি হন শেখ মুজিবুর রহমান। ফলে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম ও পঞ্চম রাষ্ট্রপতি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। নিহত হবার আগ পর্যন্ত তিনি পদটিতে বহাল ছিলেন।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম
শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় তার পরিবর্তে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি পর্যন্ত সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

আবু সাঈদ চৌধুরী
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি লন্ডন থেকে ফিরে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হন। তাকে অবহেলায় রাখা হয়েছে এমন চিন্তা থেকে উদ্ভূত প্রেক্ষাপটে মাত্র দুই বছরের মাথায় ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন তিনি।

মুহম্মদুল্লাহ
আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর স্পিকার মুহম্মদুল্লাহ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত অর্থাৎ এক মাসের কিছু বেশি সময় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে শপথ নিয়ে ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন মুহম্মদুল্লাহ।

খন্দকার মোশতাক আহমেদ
শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদীয় মন্ত্রী। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানের পর ছয়ই নভেম্বর তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তিনি মোট ৮১ দিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন।

আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম
খন্দকার মোশতাক আহমেদের পর ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। দেড় বছর পর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি।

জিয়াউর রহমান
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন তৎকালীন সেনাপ্রধান এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে একদল সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার আগ পর্যন্ত পদটিতে বহাল ছিলেন তিনি।

আবদুস সাত্তার
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালের ৩০ মে উপরাষ্ট্রপতি থেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি আবদুস সাত্তার। পরে বিতর্কিত এক নির্বাচনে ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে ২০শে নভেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

মাত্র চার মাস পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।

আবুল ফজল মোহাম্মদ আহ্‌সান উদ্দীন চৌধুরী
আবদুস সাত্তারকে অপসারণের তিনদিন পর ২৭ মার্চ বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহ্‌সান উদ্দীন চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন। মাত্র ৯ মাস পর ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর ক্ষমতা থেকে সরে যান তিনি।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো সামরিক শাসন জারি করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৬ সালের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন তিনি। ১৯৮৬ সালে বিতর্কিত একটি নির্বাচন আয়োজন করে আবারো রাষ্ট্রপতি হন এবং শেষে প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন।

সাহাবুদ্দিন আহমদ
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। পরে সব বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ একটি 'নিরপেক্ষ নির্দলীয় কেয়ারটেকার' সরকার গঠন করেন, যার একমাত্র দায়িত্ব ছিল তিন মাসের মধ্যে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। দায়িত্ব শেষে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে সরে যান তিনি।

পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবারও রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নেন তিনি। ফলে ১২ ও ১৪ তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাহাবুদ্দিন আহমদ।

আব্দুর রহমান বিশ্বাস
বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ বিদায় নেয়ার পরে রাষ্ট্রপতি হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। নিজের মেয়াদ পূর্ণ করে ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর বিদায় নেন তিনি।

একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী
বাংলাদেশের ১৫তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর শপথ নেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। বিএনপি সংসদে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা আনায় মাত্র সাত মাসের মাথায় ২০০২ সালের ২১ জুন পদত্যাগ করেন তিনি।

মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার
একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন স্পিকার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার।

ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ
২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ।

রাজনৈতিক উত্তাল পরিস্থিতিতে ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্বও নেন।  পদের মেয়াদ শেষ হবার পরও আরও দুই বছর অর্থাৎ ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

মো. জিল্লুর রহমান
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান মো. জিল্লুর রহমান। ২০১৩ সালের ২০ মার্চ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মো. জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে বহাল ছিলেন।

মো. আবদুল হামিদ
বাংলাদেশে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন মো. আবদুল হামিদ। জিল্লুর রহমানের অসুস্থাবস্থায় ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ স্পিকার থেকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।

আওয়ামী লীগ সরকারে থাকাকালীন ২০ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত অস্থায়ী এবং একই বছরের ২৪ এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত দুই মেয়াদে পদটিতে বহাল ছিলেন তিনি।

মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন
সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই মেয়াদের দায়িত্ব পালন শেষে মো. আবদুল হামিদের পদত্যাগের পর ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। পরে শারীরিক জটিলতার কারণ দেখিয়ে ২০২৬ সালের ২৪শে জুলাই পদত্যাগ করেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন।

নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদের দায়িত্ব পালন করছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

সূত্র: বিবিসি

বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :