চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় তীব্র গরমে গ্রামাঞ্চলে ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ভয়াবহ লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো। যার ফলে বিভিন্ন জেলার গ্রাহকেরা ক্ষুব্ধ। এ অবস্থায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের হামলা ও ভাঙচুরের আশঙ্কায় জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের কাছে জরুরি নিরাপত্তা চেয়েছে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো। সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর হাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোনও ব্যবস্থা নেই; তারা কেবল জাতীয় গ্রিড থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুৎ গ্রাহকদের মাঝে বণ্টন করে। কিন্তু সরবরাহ তীব্রভাবে কমে যাওয়ায় গ্রাহক অসন্তোষ এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
নিরাপত্তা চেয়েছে নীলফামারী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি:
নীলফামারীর ডোমারে দীর্ঘ ও অনিয়মিত লোডশেডিংয়ে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষের মধ্যেই বিদ্যুৎ স্থাপনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার এবং রাতকালীন পুলিশ টহলের ব্যবস্থা করতে ডোমার থানায় লিখিত আবেদন করেছে নীলফামারী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডোমার জোনাল অফিস। ৯ আগস্ট ডোমার জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এ.কে.এম. আলাউদ্দিনের স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে এ অনুরোধ জানানো হয়। ১১ আগস্ট বিষয়টি নিশ্চিত করেন ডোমার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মো: হাবিবুল্লাহ।
চিঠিতে বলা হয়, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ঘাটতির কারণে বরাদ্দ অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে গরমের সময়ে গ্রাহকদের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা জোরদার প্রয়োজন। এ জন্য ডোমার জোনাল অফিসের আওতাধীন ডোমার জোনাল অফিস, উপকেন্দ্র-১ (আন্ধারুর মোড়) এবং চিলাহাটী অভিযোগ কেন্দ্রে রাতকালীন সার্বক্ষণিক পুলিশ টহল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার অনুরোধ করা হয়েছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, এসব স্থাপনা বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই স্থাপনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখাও সহজ হবে। ডোমার থানার ওসি মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, সাদা পোশাকে অফিসে পুলিশ সদস্য মোতায়েন আছে আমাদের টহল অভিযান অব্যাহত আছে।
গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা চেয়েছে ওজোপাডিকো:
গোপালগঞ্জে দিনে-রাতে সমানতালে চলছে তীব্র লোডশেডিং। জেলা শহরের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি একেবারেই নাজুক হয়ে পড়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৭ ঘণ্টাই থাকছে না বিদ্যুৎ। প্রচণ্ড গরমে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) গ্রাহকরা। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের কার্যালয় ও উপকেন্দ্রে ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের হামলার শঙ্কা করছে ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষ। জেলা পুলিশ সুপারের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ওজোপাডিকোর গোপালগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ নিরাপত্তা চাওয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়, ওজোপাডিকোর পাওয়ার হাউজ গোপালগঞ্জ দফতর ক্যাম্পাস এবং চরপাথালিয়ায় অবস্থিত দুটি ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে গোপালগঞ্জ পৌরসভা এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হওয়ায় এবং জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ পাওয়ায় ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দফতর, বৈদ্যুতিক স্থাপনা কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণসহ যেকোনো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটার শঙ্কা রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে যেকোনো ধরনের নাশকতা এড়াতে ওজোপাডিকো গোপালগঞ্জ দফতরের সব স্থাপনা ও উপকেন্দ্রগুলোকে নিয়মিত পুলিশি টহল রুটের আওতায় আনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বিশেষ নজরদারি রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। এ বিষয়ে ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘আমরা আমাদের দফতরসহ সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিরাপত্তা চেয়ে জেলা পুলিশ সুপার বরাবর একটি চিঠি পাঠিয়েছি। বেশ কিছু ধরে চাহিদার চেয়ে কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ায় শহরে লোডশেডিং হচ্ছে। যেখানে চাহিদা ১৮ মেগাওয়াট সেখানে বরাদ্দ পাচ্ছি ৯ থেকে ১০ মেগাওয়াট। যার ফলে আমাদের ঘন ঘন লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এ কারণে গ্রাহকদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। গ্রাহকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে আমাদের অফিস ও উপকেন্দ্রে হামলা করতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। তাই দপ্তর ও উপকেন্দ্রসহ নিজেদের নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সুপারকে চিঠি দিয়েছি।’ এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘আমি এখনও চিঠিটা হাতে পাইনি। চিঠি হাতে পেলে পুলিশের দায়িত্বশীলদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেবো।’
নিরাপত্তা চেয়ে ডিসিকে চিঠি দিলো নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ:
নেত্রকোনায় বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় গ্রাহক পর্যায়ে দিন-রাত মিলিয়ে ৭২ থেকে ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে এই ভয়াবহ সংকটের কারণে স্থানীয় গ্রাহকদের মাঝে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ও হামলার আশঙ্কায় জেলা প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।
১১ আগস্ট দুপুরে চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘লোডশেডিং কমিয়ে আনতে বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। সেইসঙ্গে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে নিরাপত্তা বাড়াতে পুলিশকে জানানো হয়েছে।’
এর আগে সোমবার নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. আকরাম হোসেন জেলা প্রশাসককে এ বিষয়ে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়, নেত্রকোনা ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র থেকে নয়টি ৩৩ কেভি ফিডারের মাধ্যমে নেত্রকোনার ১০টি উপজেলা এবং সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এসব এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিদ্যুতের চাহিদা ১৫৭ মেগাওয়াট। তবে তিন দিন ধরে চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়ায় ব্যাপক লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ আগস্ট রাত ১টায় ১১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৫৫ মেগাওয়াট। ৮ আগস্ট বিকাল ৫টায় ১২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ৬৩ মেগাওয়াট। আর ৯ আগস্ট রাত ১১টায় ১২৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬০ মেগাওয়াট।
চিঠিতে বলা হয়, ১১ কেভি ফিডার দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর বিদ্যুৎ চালু হলে ফ্রিজ, পানির পাম্প, আইপিএসসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম একসঙ্গে চালু হয়। এতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চাহিদা প্রায় দেড় গুণ বেড়ে যায়। ফলে গ্রাহকপর্যায়ে লোডশেডিং ৭২ থেকে ৭৯ শতাংশে পৌঁছেছে। ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন না করার কথা উল্লেখ করেছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এর মধ্যে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমীতে অবস্থিত বিআর পাওয়ারজেনের ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র, আশুগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট এবং আরপিসিএল ময়মনসিংহ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথা বলা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, অতিমাত্রায় লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। মোবাইল ফোনে কর্মকর্তাদের গালিগালাজের পাশাপাশি অফিস ঘেরাও ও ভাঙচুরের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বকেয়া আদায়ে অভিযান পরিচালনার সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর অতর্কিত হামলা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দাবি, গাজীপুরের বরমীর ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী চালু রাখা হলে নেত্রকোনা গ্রিড উপকেন্দ্রে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া সম্ভব হবে। এতে লোডশেডিংও সহনীয় পর্যায়ে রাখা যাবে। এ অবস্থায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন সব অফিস ও ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক সুজন মিয়া বলেন, ‘রাইতে-দিনে মিলায়া ৪ থেইক্যা ৫ ঘণ্টা কারেন থাহে। আয়ে আর যায়। গরমে রাইতে ঘুমাইতাম পারি না। ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করতে পারতাছে না।’ আটপাড়া উপজেলার মোগলহাট্রা গ্রামের আব্দুল গনি বলেন, ‘কারেন্ট থাহে কিনা এইডা অহন কথাই না। অহন হইছে, কারেন্ট কি আইব। ২৪ ঘণ্টায় ৩ কি ৪ ঘণ্টা পাই। ১৮-২০ ঘণ্টা থাহে না। এইডাও ১০ থেকে ২০ মিনিট কইরা একবারে পাই। বাচ্চাদের গরমে অসুখ অইতাছে। ফ্রিজ, ফ্যান চলে না। ভোল্টেজও কম থাহে।”
বিষয়টি স্বীকার করেছেন নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. আকরাম হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু সরবরাহ কম পাওয়ায় আমরা গ্রাহকদের দিতে পারছি না।’ জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, বিভাগীয় কমিশনার স্যার নেত্রকোনায় এসেছিলেন। তাকে বিদ্যুতের বিষয়টি অবগত করেছি। জেলার বিদ্যুৎ অফিসগুলোসহ উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা বিধানে পুলিশকে বলেছি। আশা করছি, দ্রুত লোডশেডিং কমে আসবে।’
নিরাপত্তা চাওয়ার মূল কারণ:
তীব্র গরমের মধ্যে লোডশেডিং না কমিয়ে বিভিন্ন জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন অফিস জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে জরুরি নিরাপত্তা চেয়েছে। কারণ ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে যেকোনো সময় বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র এবং সমিতির কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের আশঙ্কা করছেন তারা। ইতিমধ্যে একাধিক ব্যক্তি ফোন করে অফিসের কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তারা। এজন্য নিরাপত্তা চেয়েছেন।
গ্রাহকদের চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ:
গ্রাহকেরা বলছেন, দিন-রাত মিলিয়ে প্রায় ৭২ থেকে ৭৯ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সন্তানদের পড়াশোনা এবং বাসাবাড়ির ইলেকট্রনিকস জিনিসপত্র, ফ্রিজে রাখা খাবারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে। রাতের বেলায় তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন অনেকে। শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর প্রধানরা বলছেন, বিদ্যুৎ না থাকার কারণে বিক্ষুব্ধ লোকজন যেকোনো সময় বিদ্যুৎ অফিস, জোনাল অফিস কিংবা ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রগুলোতে হামলা ও ভাঙচুর চালাতে পারে বলে বিতরণ সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে। ইতিমধ্যেই দেশের কিছু এলাকায় বিক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের জেরে বিদ্যুৎ কর্মীদের আটকে রেখে অবরুদ্ধ করার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। তাই নিজেদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে।
এছাড়া মধ্যরাতের পর তীব্র অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় যেন কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা নাশকতা না ঘটে, সেজন্য পুলিশি টহল ও বিশেষ নজরদারি চাওয়া হয়েছে। লোডশেডিং না কমার বা বিদ্যুৎ সংকটের নেপথ্য কারণবিতরণ সংস্থাগুলো চাইলেও লোডশেডিং কমাতে পারছে না, কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় চলছে।
লোডশেডিং কমাতে না পারার কারণ কী :
গত কয়েকদিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি ও দুর্ঘটনার পর থেকে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে, ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। আবার কয়লা ও জ্বালানি স্বল্পতা রয়েছে।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাসে বিঘ্ন ঘটায় এবং বকেয়া বিল পরিশোধের জটিলতায় বড় বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (যেমন: পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র) উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের বিভিন্ন কারিগরি ও সরবরাহ সমস্যার কারণে ভারত (যেমন: আদানি পাওয়ার) থেকে বিদ্যুৎ আমদানি পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। তীব্র গরমের কারণে বিদ্যুতের জাতীয় চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। এর বিপরীতে প্রায় ৩,০০০ মেগাবাইটের বেশি ঘাটতি তৈরি হওয়ায় লোডশেডিং সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর প্রধানরা জানিয়েছেন, চাহিদা অনুযায়ী জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ বরাদ্দ না পাওয়া পর্যন্ত তাদের পক্ষে স্থানীয়ভাবে লোডশেডিং কমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ঘাটতি কত:
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং হচ্ছে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি। সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। এর আগের দিন ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয়েছে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। ওই সময় অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা বসিয়ে রাখতে হয়েছিল। দিনের অধিকাংশ সময় এমনটাই করতে হচ্ছে। গ্যাস থেকে উৎপাদন হচ্ছে ৪ হাজার মেগাওয়াটের কম। গ্যাসের সরবরাহ বাড়তে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ালে খরচ আরও বেড়ে যাবে, তাই চালানো হচ্ছে কম। রাতের বেলায় টানা কয়েক ঘণ্টা তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি চালালেও বেশির ভাগ সময় গড়ে দেড় হাজার মেগাওয়াটের কম চলছে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
নিরাপত্তা চেয়েছে নীলফামারী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি:
নীলফামারীর ডোমারে দীর্ঘ ও অনিয়মিত লোডশেডিংয়ে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষের মধ্যেই বিদ্যুৎ স্থাপনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার এবং রাতকালীন পুলিশ টহলের ব্যবস্থা করতে ডোমার থানায় লিখিত আবেদন করেছে নীলফামারী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডোমার জোনাল অফিস। ৯ আগস্ট ডোমার জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এ.কে.এম. আলাউদ্দিনের স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে এ অনুরোধ জানানো হয়। ১১ আগস্ট বিষয়টি নিশ্চিত করেন ডোমার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মো: হাবিবুল্লাহ।
চিঠিতে বলা হয়, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ঘাটতির কারণে বরাদ্দ অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে গরমের সময়ে গ্রাহকদের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা জোরদার প্রয়োজন। এ জন্য ডোমার জোনাল অফিসের আওতাধীন ডোমার জোনাল অফিস, উপকেন্দ্র-১ (আন্ধারুর মোড়) এবং চিলাহাটী অভিযোগ কেন্দ্রে রাতকালীন সার্বক্ষণিক পুলিশ টহল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার অনুরোধ করা হয়েছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, এসব স্থাপনা বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই স্থাপনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখাও সহজ হবে। ডোমার থানার ওসি মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, সাদা পোশাকে অফিসে পুলিশ সদস্য মোতায়েন আছে আমাদের টহল অভিযান অব্যাহত আছে।
গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা চেয়েছে ওজোপাডিকো:
গোপালগঞ্জে দিনে-রাতে সমানতালে চলছে তীব্র লোডশেডিং। জেলা শহরের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি একেবারেই নাজুক হয়ে পড়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৭ ঘণ্টাই থাকছে না বিদ্যুৎ। প্রচণ্ড গরমে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) গ্রাহকরা। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের কার্যালয় ও উপকেন্দ্রে ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের হামলার শঙ্কা করছে ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষ। জেলা পুলিশ সুপারের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ওজোপাডিকোর গোপালগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ নিরাপত্তা চাওয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়, ওজোপাডিকোর পাওয়ার হাউজ গোপালগঞ্জ দফতর ক্যাম্পাস এবং চরপাথালিয়ায় অবস্থিত দুটি ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে গোপালগঞ্জ পৌরসভা এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হওয়ায় এবং জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ পাওয়ায় ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দফতর, বৈদ্যুতিক স্থাপনা কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণসহ যেকোনো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটার শঙ্কা রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে যেকোনো ধরনের নাশকতা এড়াতে ওজোপাডিকো গোপালগঞ্জ দফতরের সব স্থাপনা ও উপকেন্দ্রগুলোকে নিয়মিত পুলিশি টহল রুটের আওতায় আনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বিশেষ নজরদারি রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। এ বিষয়ে ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘আমরা আমাদের দফতরসহ সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিরাপত্তা চেয়ে জেলা পুলিশ সুপার বরাবর একটি চিঠি পাঠিয়েছি। বেশ কিছু ধরে চাহিদার চেয়ে কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ায় শহরে লোডশেডিং হচ্ছে। যেখানে চাহিদা ১৮ মেগাওয়াট সেখানে বরাদ্দ পাচ্ছি ৯ থেকে ১০ মেগাওয়াট। যার ফলে আমাদের ঘন ঘন লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এ কারণে গ্রাহকদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। গ্রাহকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে আমাদের অফিস ও উপকেন্দ্রে হামলা করতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। তাই দপ্তর ও উপকেন্দ্রসহ নিজেদের নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সুপারকে চিঠি দিয়েছি।’ এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘আমি এখনও চিঠিটা হাতে পাইনি। চিঠি হাতে পেলে পুলিশের দায়িত্বশীলদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেবো।’
নিরাপত্তা চেয়ে ডিসিকে চিঠি দিলো নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ:
নেত্রকোনায় বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় গ্রাহক পর্যায়ে দিন-রাত মিলিয়ে ৭২ থেকে ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে এই ভয়াবহ সংকটের কারণে স্থানীয় গ্রাহকদের মাঝে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ও হামলার আশঙ্কায় জেলা প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।
১১ আগস্ট দুপুরে চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘লোডশেডিং কমিয়ে আনতে বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। সেইসঙ্গে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে নিরাপত্তা বাড়াতে পুলিশকে জানানো হয়েছে।’
এর আগে সোমবার নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. আকরাম হোসেন জেলা প্রশাসককে এ বিষয়ে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়, নেত্রকোনা ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র থেকে নয়টি ৩৩ কেভি ফিডারের মাধ্যমে নেত্রকোনার ১০টি উপজেলা এবং সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এসব এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিদ্যুতের চাহিদা ১৫৭ মেগাওয়াট। তবে তিন দিন ধরে চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়ায় ব্যাপক লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ আগস্ট রাত ১টায় ১১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৫৫ মেগাওয়াট। ৮ আগস্ট বিকাল ৫টায় ১২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ৬৩ মেগাওয়াট। আর ৯ আগস্ট রাত ১১টায় ১২৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬০ মেগাওয়াট।
চিঠিতে বলা হয়, ১১ কেভি ফিডার দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর বিদ্যুৎ চালু হলে ফ্রিজ, পানির পাম্প, আইপিএসসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম একসঙ্গে চালু হয়। এতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চাহিদা প্রায় দেড় গুণ বেড়ে যায়। ফলে গ্রাহকপর্যায়ে লোডশেডিং ৭২ থেকে ৭৯ শতাংশে পৌঁছেছে। ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন না করার কথা উল্লেখ করেছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এর মধ্যে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমীতে অবস্থিত বিআর পাওয়ারজেনের ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র, আশুগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট এবং আরপিসিএল ময়মনসিংহ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথা বলা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, অতিমাত্রায় লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। মোবাইল ফোনে কর্মকর্তাদের গালিগালাজের পাশাপাশি অফিস ঘেরাও ও ভাঙচুরের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বকেয়া আদায়ে অভিযান পরিচালনার সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর অতর্কিত হামলা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দাবি, গাজীপুরের বরমীর ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী চালু রাখা হলে নেত্রকোনা গ্রিড উপকেন্দ্রে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া সম্ভব হবে। এতে লোডশেডিংও সহনীয় পর্যায়ে রাখা যাবে। এ অবস্থায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন সব অফিস ও ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক সুজন মিয়া বলেন, ‘রাইতে-দিনে মিলায়া ৪ থেইক্যা ৫ ঘণ্টা কারেন থাহে। আয়ে আর যায়। গরমে রাইতে ঘুমাইতাম পারি না। ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করতে পারতাছে না।’ আটপাড়া উপজেলার মোগলহাট্রা গ্রামের আব্দুল গনি বলেন, ‘কারেন্ট থাহে কিনা এইডা অহন কথাই না। অহন হইছে, কারেন্ট কি আইব। ২৪ ঘণ্টায় ৩ কি ৪ ঘণ্টা পাই। ১৮-২০ ঘণ্টা থাহে না। এইডাও ১০ থেকে ২০ মিনিট কইরা একবারে পাই। বাচ্চাদের গরমে অসুখ অইতাছে। ফ্রিজ, ফ্যান চলে না। ভোল্টেজও কম থাহে।”
বিষয়টি স্বীকার করেছেন নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. আকরাম হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু সরবরাহ কম পাওয়ায় আমরা গ্রাহকদের দিতে পারছি না।’ জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, বিভাগীয় কমিশনার স্যার নেত্রকোনায় এসেছিলেন। তাকে বিদ্যুতের বিষয়টি অবগত করেছি। জেলার বিদ্যুৎ অফিসগুলোসহ উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা বিধানে পুলিশকে বলেছি। আশা করছি, দ্রুত লোডশেডিং কমে আসবে।’
নিরাপত্তা চাওয়ার মূল কারণ:
তীব্র গরমের মধ্যে লোডশেডিং না কমিয়ে বিভিন্ন জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন অফিস জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে জরুরি নিরাপত্তা চেয়েছে। কারণ ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে যেকোনো সময় বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র এবং সমিতির কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের আশঙ্কা করছেন তারা। ইতিমধ্যে একাধিক ব্যক্তি ফোন করে অফিসের কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তারা। এজন্য নিরাপত্তা চেয়েছেন।
গ্রাহকদের চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ:
গ্রাহকেরা বলছেন, দিন-রাত মিলিয়ে প্রায় ৭২ থেকে ৭৯ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সন্তানদের পড়াশোনা এবং বাসাবাড়ির ইলেকট্রনিকস জিনিসপত্র, ফ্রিজে রাখা খাবারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে। রাতের বেলায় তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন অনেকে। শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর প্রধানরা বলছেন, বিদ্যুৎ না থাকার কারণে বিক্ষুব্ধ লোকজন যেকোনো সময় বিদ্যুৎ অফিস, জোনাল অফিস কিংবা ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রগুলোতে হামলা ও ভাঙচুর চালাতে পারে বলে বিতরণ সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে। ইতিমধ্যেই দেশের কিছু এলাকায় বিক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের জেরে বিদ্যুৎ কর্মীদের আটকে রেখে অবরুদ্ধ করার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। তাই নিজেদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে।
এছাড়া মধ্যরাতের পর তীব্র অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় যেন কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা নাশকতা না ঘটে, সেজন্য পুলিশি টহল ও বিশেষ নজরদারি চাওয়া হয়েছে। লোডশেডিং না কমার বা বিদ্যুৎ সংকটের নেপথ্য কারণবিতরণ সংস্থাগুলো চাইলেও লোডশেডিং কমাতে পারছে না, কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় চলছে।
লোডশেডিং কমাতে না পারার কারণ কী :
গত কয়েকদিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি ও দুর্ঘটনার পর থেকে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে, ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। আবার কয়লা ও জ্বালানি স্বল্পতা রয়েছে।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাসে বিঘ্ন ঘটায় এবং বকেয়া বিল পরিশোধের জটিলতায় বড় বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (যেমন: পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র) উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের বিভিন্ন কারিগরি ও সরবরাহ সমস্যার কারণে ভারত (যেমন: আদানি পাওয়ার) থেকে বিদ্যুৎ আমদানি পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। তীব্র গরমের কারণে বিদ্যুতের জাতীয় চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। এর বিপরীতে প্রায় ৩,০০০ মেগাবাইটের বেশি ঘাটতি তৈরি হওয়ায় লোডশেডিং সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর প্রধানরা জানিয়েছেন, চাহিদা অনুযায়ী জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ বরাদ্দ না পাওয়া পর্যন্ত তাদের পক্ষে স্থানীয়ভাবে লোডশেডিং কমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ঘাটতি কত:
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং হচ্ছে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি। সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। এর আগের দিন ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয়েছে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। ওই সময় অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা বসিয়ে রাখতে হয়েছিল। দিনের অধিকাংশ সময় এমনটাই করতে হচ্ছে। গ্যাস থেকে উৎপাদন হচ্ছে ৪ হাজার মেগাওয়াটের কম। গ্যাসের সরবরাহ বাড়তে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ালে খরচ আরও বেড়ে যাবে, তাই চালানো হচ্ছে কম। রাতের বেলায় টানা কয়েক ঘণ্টা তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি চালালেও বেশির ভাগ সময় গড়ে দেড় হাজার মেগাওয়াটের কম চলছে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন