অভাবকে জয় করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন নৃগোষ্ঠীর নারীরা

আপলোড সময় : ০৯-০৮-২০২৬ ০২:৩৭:৫৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৯-০৮-২০২৬ ০৪:২১:৫৬ অপরাহ্ন
একসময় আরতি মার্ডির সকাল শুরু হতো কাজের খোঁজে বের হওয়ার তাড়া দিয়ে। একদিন কাজ না করলে চুলোয় হাঁড়ি উঠত না। খাস-জমির ওপর ছাপড়া ঘর, স্বামী দিনমজুর, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ—সব মিলিয়ে প্রতিটি দিন ছিল টিকে থাকার লড়াই। সেই আরতিই এখন নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন স্বাবলম্বী সংসার। বাড়িতে তিনটি গাভী, পাঁচটি ছাগল, হাঁস-মুরগি পাশাপাশি করেন সবজি ও ধান চাষ। সব মিলিয়ে তার সম্পদের মূল্য এখন প্রায় ১২ লাখ টাকা।

আরতি মার্ডি শুধু নিজের জীবনই বদলাননি, হয়ে উঠেছেন আশপাশের প্রান্তিক আদিবাসী নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণা। আজ বিশ্ব আদিবাসী দিবস। এদিন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নারগুন ইউনিয়নের কহরপাড়া গ্রামের আরতির জীবন বদলের গল্প যেন বলে দেয় সুযোগ, প্রশিক্ষণ, পুঁজি ও সহায়তা পেলে প্রান্তিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষও নিজেদের জীবন বদলে দিতে পারেন।

আরতির বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। স্বামী-সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের পরিবার। স্বামী দিনমজুর। একসময় নিজেদের কোনো ভিটেমাটিও ছিল না। খাস-জমিতে ছাপড়া তুলে কোনো রকমে বসবাস করতেন তারা। অভাবের সংসারে আরতি একদিন কাজে যেতে না পারলে সেদিন চুলোয় হাঁড়ি উঠত না। এর মধ্যে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো ছিল আরও বড় চাপ।

জীবনের সেই কঠিন সময়ে ২০১৯ সালের অক্টোবরে ঠাকুরগাঁওয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিওর ‘পাথওয়েজ টু প্রসপারিটি ফর এক্সট্রিমলি পুওর পিপল (পিপিইপিপি)’ প্রকল্পের জরিপ শুরু হয়। এর মাধ্যমে আরতি ‘প্রসপারিটি বনফুল ইকো গ্রাম কমিটি’র সদস্য হন। নিয়মিত সভায় অংশ নিয়ে আয়বর্ধক কাজ, সঞ্চয়, কৃষি ও পশুপালনসহ নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন তিনি। করোনাকালে প্রসপারিটি প্রকল্প থেকে আরতি ও তার কমিউনিটির অন্য সদস্যদের ৯ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়। সংসারের প্রয়োজন মিটিয়ে অবশিষ্ট টাকা দিয়ে একটি ছাগল কেনেন আরতি। সেই ছোট বিনিয়োগই হয়ে ওঠে তার ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু।

পর্যায়ক্রমে প্রকল্পের কমিউনিটি মোবিলাইজেশন কম্পোনেন্টের মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন সেবার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পান সরকারি ঘর। প্রাণিসম্পদ অফিস থেকেও গাভী পালনের জন্য পান অনুদান। তার ছোট ছেলে ইএসডিও থেকে তিন মাসের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।

২০২৪ সালের আগস্টে প্রসপারিটি প্রকল্প থেকে উচ্চমূল্যের নিরাপদ সবজি চাষের জন্য ১২ হাজার টাকা সহায়তা পান আরতি। ৫৫ শতাংশ জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষ করে সব খরচ বাদ দিয়ে লাভ করেন প্রায় ৬০ হাজার টাকা। এরপর ইএসডিও থেকে প্রথম দফায় ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে আরও ৫০ শতাংশ জমি বন্ধক নেন। সেখানে সবজির পাশাপাশি ধান চাষ শুরু করেন।

বর্তমানে তার বাড়িতে তিনটি গাভি, পাঁচটি ছাগল, পাঁচটি হাঁস ও ১৫টি মুরগি রয়েছে। আছে সবজি ও ধান চাষের পাশাপাশি পারিবারিক পুষ্টিবাগান। এসব কর্মকাণ্ড থেকে মাসে আয় করেন প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। স্বামী-সন্তানসহ পরিবারের মাসিক আয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। সাত দফায় মোট ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তা কাজে লাগিয়ে বর্তমানে গড়ে তুলেছেন প্রায় ১২ লাখ টাকার সম্পদ। পেয়েছেন ইএসডিওর ‘শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তা’র পুরস্কারও।

আরতি মার্ডি বলেন, একসময় আমাদের সংসারে খুব কষ্ট ছিল। একদিন কাজ না করলে চুলোয় হাঁড়ি উঠত না। সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালাতে অনেক কষ্ট হতো। ইএসডিওর সহায়তা ও পরামর্শ পাওয়ার পর ধীরে ধীরে গরু-ছাগল পালন, সবজি ও ধান চাষ শুরু করি। এখন আমার নিজের কিছু সম্পদ হয়েছে, সংসারেও স্বচ্ছলতা এসেছে। আগে যেখানে প্রতিদিনের খাবারের চিন্তা করতে হতো, এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারছি।

একই ইউনিয়নের নালাডাঙ্গী আদিবাসী এলাকার শান্তি মার্ডির জীবনও বদলে গেছে। দিনমজুর স্বামী সুভাষ মুর্মু ও দুই সন্তানকে নিয়ে একসময় অভাব-অনটনে দিন কাটত তার। ইএসডিওর পিপিইপিপি প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হলে তারা গড়ে তোলেন ‘শাপলা ইকো গ্রাম কমিটি। নিয়মিত সভায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান ও পরামর্শ নেন শান্তি।

বর্তমানে তার বাড়িতে রয়েছে সাতটি গবাদিপশু। পরে প্রকল্পের কর্মীদের পরামর্শে শুরু করেন ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি। এ কাজে ইএসডিও তাকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেয়। সেই অর্থ দিয়ে ঘরসহ ছয়টি সেট নির্মাণ করে কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন তিনি। প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে কৃষকদের কাছে বিক্রি করে মাসে আয় করছেন প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।

শান্তি মার্ডি বলেন, একসময় স্বামীর সামান্য আয়ে সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হতো। ইএসডিওর পরামর্শ ও সহায়তায় ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি শুরু করি। এখন নিজের উৎপাদিত কেঁচো সার বিক্রি করে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করছি। এই আয় সংসারের কাজে লাগছে, পাশাপাশি নিজেরও একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। আগে শুধু অভাবের চিন্তা ছিল, এখন নিজের উদ্যোগে আরও ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখি।

আরতি ও শান্তির মতো আদিবাসী পল্লির মিনতি সরেন, চিন্তামনি মুর্মু, জসপিনা মুর্মু, সখিনা সরেন ও সুমি হাসদার জীবনেও পরিবর্তন এসেছে ইএসডিওর কার্যক্রমে। সংস্থাটি ঠাকুরগাঁওয়ের পাঁচ উপজেলার মধ্যে তিনটি উপজেলা ও ১৬টি ইউনিয়নে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জীবনমান উন্নয়ন, নিজস্ব ভাষার চর্চা ও আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে দেওয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পল্লির মিনতি সরেন, চিন্তামনি মুর্মু, জসপিনা মুর্মু, সখিনা সরেন ও সুমি হাসদার বলেন, আগের তুলনায় আমাদের জীবন অনেকটাই বদলে গেছে। আমরা এখন নিজেদের কাজের মাধ্যমে আয় করার চেষ্টা করছি, সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারছি। ইএসডিওর প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সহযোগিতা আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। আমরা শুধু নিজেদের জীবন পরিবর্তনের জন্য নয়, আমাদের পল্লির অন্য পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নেও কাজ করে যেতে চাই।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নিয়ে কাজ করা সংস্থাটির টেকনিক্যাল অফিসার মো. জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং সরকারি সেবার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমরা চাই, আদিবাসী পরিবারের মানুষ নিজেরাই যেন তাদের উন্নয়নের পথ তৈরি করতে পারেন। আরতি মার্ডি ও শান্তি মার্ডির মতো অনেক নারী এখন নিজেদের উদ্যোগে আয় করছেন।

টেকনিক্যাল অফিসার (কমিউনিটি মোবিলাইজেশন) ও টিম লিডার মোছা. মোসলেমা খাতুন বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে শুধু সহায়তা দেওয়া নয়, তাদের নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা তৈরি করা। এজন্য আমরা তাদের আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড, কৃষি, পশুপালন, পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিভিন্ন সরকারি সেবার সঙ্গে সংযোগ তৈরির বিষয়ে কাজ করছি। তিনি আরও বলেন, আরতি মার্ডি ও শান্তি মার্ডির মতো নারীদের পরিবর্তন আমাদের কাজের বড় একটি সাফল্য। তারা এখন নিজেরা আয় করছেন, সম্পদ গড়ে তুলছেন এবং পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভূমিকা রাখছেন। তাদের এই পরিবর্তন দেখে অন্য নারীরাও উৎসাহিত হচ্ছেন। আমরা চাই, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পল্লির আরও বেশি পরিবার এই উন্নয়নের ধারায় যুক্ত হোক এবং নিজেদের জীবনমান নিজেরাই পরিবর্তন করতে সক্ষম হোক।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 


 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :