বাংলাদেশের দূর্যোগপ্রবণ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও প্লাবনের ঝুঁকি বহুগুনে বেড়েছে। বঙ্গোপসাগরের গ্রাসে থাকা এই জনপদ রক্ষায় এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে অন্তত ২০ হাজার পরিবার বসতভিটা হারানোর চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া কৃষি, জেলে ও পর্যটন ব্যবসা নির্ভর একটা বিরাট জনগোষ্ঠী পেশা হারানোর শঙ্কায় রয়েছে। একাধিক মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়ন করা ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা ও জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়ের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে এমন শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তনজনিত কারণে সাগর-নদীতে পানির উচ্চতা বাড়ায় ইতোমধ্যে ২০২২ সাল থেকে জলোচ্ছ্বাস ঝুঁকিতে বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসরত অন্তত ছয় হাজার পরিবার বর্ষাকালে বাড়িঘরে থাকতে পারছেন না। বর্ষা মৌসুমের পুরো সময়টা পূর্ণিমা-অমাবস্যায় বসতভিটায় অনবরত পানি ঢুকছে। স্বাভাবিক জোয়ার এখন তাঁদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। এছাড়া অন্তত ৫০ কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ বিপন্নের ঝুঁকিতে রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড যদিও কয়েক দশক ধরে উপকূলীয় পোল্ডার ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছে। কিন্তু এসব বাঁধে নতুন করে প্রবল ভাঙন শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী হিসেবে ম্যানগ্রোভ ও নন-ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলও গড়ে তোলা হয়, যা প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়াল হিসেবে কাজ করত; যা এখন উজাড় হয়ে গেছে। বর্তমানে এসব বাঁধ ও বনাঞ্চল যতটুকুই আছে তাও জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, দখল ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়া নির্বাহী প্রকেšশলীর কার্যালয়ের দেয়া তথ্যানুসারে, বর্তমানে কলাপাড়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে সাগরঘেঁষা ৪৮, উপকূলীয় ৪৭/১ ও রাবনাবাদ পাড়ের ৫৪/এ পোল্ডারের বেড়িবাঁধের বাইরের এবং ভেতরের জনগোষ্ঠী। এই তিনটি পোল্ডারের অন্তত ১২০-১৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে সমুদ্রমুখী বাঁধ, নদীতীর প্রতিরক্ষা বাঁধ, অভ্যন্তরীণ পানি নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধী উঁচু প্রতিরক্ষা বাঁধ রয়েছে। কিন্তু সকল বাঁধের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নেই। কুয়াকাটার ৪৮ নম্বর পোল্ডারের ৩৮ দশমিক ০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধটি ২০২১ সালে পুনরাকৃতিকরণের নামে রক্ষণাবেক্ষনের কাজ করা হয়। উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি) এই কাজ নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। শত কোটি ব্যয় করা হলেও যথাযথভাবে বাঁধটির উন্নয়ন করা হয়নি বলে এন্তার অভিযোগ রয়েছে। উল্টো বাঁধটির মাটির জায়গায় বালু দেয়া হয়েছে। বাঁধের বাইরের প্রতিরক্ষা সবুজ দেয়াল বনাঞ্চল উজাড় করে মাটির বাঁধকে জলোচ্ছ্বাস ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে। পর্যটনকর্মী কেএম বাচ্চু জানান, আমরা বহুবার প্রতিবাদ করেছি । তারপরও যথাযথভাবে সিডিউল মেনে সাগরপাড়ের এই বেড়িবাঁধটির উন্নয়ন কাজ করা হয়নি।
আমরা কলাপাড়াবাসী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া, ভূমি ধস, ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের কারণে কলাপাড়ার এসব বাঁধ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ৫০ শতাংশ বাঁধ জলোচ্ছ্বাসে প্লাবনের শঙ্কা রয়েছে। অধিকাংশ বাঁধে কংক্রিট সুরক্ষা নেই। এসব বাঁধ পানি উন্নয়ন বোর্ড অস্থায়ীভাবে জরুরি প্রটেকশনের নামে কোথায় জিও ব্যাগ, কোথাও জিও টিউব এবং কোথাও কংক্রিটের কিছু ব্লক স্থাপন করছে। কোন কোন স্পটে ক্ষুদ্র উপ-বেড়িবাঁধ ও স্থানীয় প্রতিরক্ষা বাঁধও রয়েছে। এসব অস্থায়ী সমাধান। আর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে জলোচ্ছ্বাসের প্রাথমিক ঝাপটা ঠেকানের মতো ম্যানগ্রোভ-ননম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলখ্যাত সবুজ দেয়াল বিলীন হয়ে যাওয়ায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এমনিতেই এশাধিক মেগাপ্রকল্পের উন্নয়নে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জেলে ও কৃষি পেশার অন্তত ২০ হাজার পরিবার পেশা হারানোর শঙ্কায় পড়েছে। এর মধ্যে রাবনাবাদ চ্যনেল নির্ভর জেলে পেশার মানুষ অধিকাংশ। মাছও মেলে না, জালও ফেলতে পারছেন না। পাঁচজুনিয়া গ্রামের বাসীন্দা নাজিয়া-রিন্টু দম্পতি জানান, তাঁদের তিন সন্তানসহ পাঁচ জনের সাজানো-গোছানো সংসারে এখন অচলাবস্থা হয়েছে। চাষাবাদ ছিল, পুকুর ছিল, গবাদিপশু পালতেন। সব শেষ। বিদ্যুত প্লান্ট নির্মানের নামের তাদের জমিজমাসহ হারিয়েছেন। বসতভিটা নেই। বেকার অবস্থায় মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এ দম্পতি জানালেন ওষানকার ২৭৫ টি পরিবার এখন পর্যন্ত পাঁচ বছর ধরে ভাসছেন। আশ্রয়হারা হয়ে গেছে। সবাই কর্মহীন। এমন হাজারো পরিবারে উন্নয়নের কারণে দুরবস্থা নেমে এসেছে। বাঁধের পাশে, নদীরপাড়ে গিয়ে অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন। তাও এখন ঝুঁকিতে। কারণ কলাপাড়া উপকূলের ৭৬ শতাংশ বেড়িবাঁধের পোল্ডারের অংশ জলোচ্ছ্বাস ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪/এ পোল্ডারের রাবনাবাদের অংশ পায়রা বন্দর ও একাধিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের কারণে চারটি ইউনিয়নের মানুষের জলোচ্ছ্বাস ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ পানি উন্নয়ন বোর্ড এই বেড়িবাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ করছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্তমানে রাবনাবাদ, আন্ধারমানিক নদী ও বঙ্গোপসাগরঘেঁষা বেড়িবাঁধের অংশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন। স্থানীয় বাসীন্দারা বলেছেন কলাপাড়ার উপকূলীয় গঙ্গামতি, কুয়াকাটা, চরাঞ্চল, সমুদ্র সংলগ্ন নিম্নভূমি এবং বেড়িবাঁধের বাইরের উপকূলীয় বেষ্টনী এলাকায় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছিল তাও নেই। নদী-সাগর ভাঙনে এবং মানুষের নিধনে এসব বনের কেওড়া, গেওয়া, গরান, ছইলা, গোলপাতাসহ সব উজাড় হয়ে গেছে। ফলে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও হারিয়ে ফেলেছেন উপকূলের মানুষ। আর বর্তমানে বনউজাড়, দখল, রিসোর্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ, নদীভাঙন, লবনাক্ততা বৃদ্ধি, জলবায়ূর পরিবর্তনজনিত পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় এখানকার ঝুঁকি বহুগুনে বাড়ছে। কিন্তু এতো কিছুর পরও গাছ কাটা, মাটি কাটা, বালু উত্তোলন, দখল, বনভূমি রূপান্তরের তান্ডব থেমে নেই। এক কথায় বর্তমানে কলাপাড়া উপকূলের বাঁধ দ্রুত দুর্বল হচ্ছে, নদী ভাঙন বেড়েছে, বনাঞ্চল সঙ্কুচিত হয়ে গেছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে মানুষের জীবন ও সম্পদের দূর্যোগ ঝুঁকি বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, শুধু বাঁধ দিয়ে উপকূল রক্ষা করা সম্ভব নয়। তারা বলেছেন, বাঁধের বাইরের ম্যানগ্রোভ বনই প্রথম প্রতিরক্ষা দেয়াল। এতে জলোচ্ছ্বাসকালে ঢেউয়ের শক্তি কমায়। বাধাগ্রস্ত করে। জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা হ্রাস করে। মাটির ক্ষয় রোধ কওে, বাঁধের আযু বাড়ে। মূলত বন ধ্বংস হলে বেড়িবাঁধের ওপর চাপ বহুগুনে বেড়ে যায়। বাড়ে বাঁধের ঝুঁকি।
এসব পরিবেশবিনাশী ও অপরিকল্পিত কর্মকান্ডের কারণে অদূরভবিষ্যতে ফের সিডর, আইলা, আম্পান, রেমালের মতো ঘুর্ণঝড় আঘাত হানলে কলাপাড়ার গোটা উপকূল বিপর্যস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাইলে কৃষি, মৎস্য ও পর্যটন নির্ভর সমৃদ্ধ উপজেলা কলাপাড়ার মানুষ চরম দুরবস্থায় পড়তে পারে। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকি সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধি, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বিলীন, নদীভাঙন, লবণাক্তা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত পর্যটন ও অপরিকল্পিত সরকারি উন্নয়ন বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পিত পরিবেশ প্রতিবেশ জীববৈচিত্র বান্ধব উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালিত করা জরুরি প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে এই উপজেলাকে ঘিরে সরকারের যেসব উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে যেমন উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন সংস্থা (সিইআইপি), পায়রা কুয়াকাটা সমন্বিত মহাপরিকল্পনা, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী এবং জলবায়ু-স্থিতিস্থাপক বাঁধ উন্নয়ন কর্মকান্ডকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি প্রয়োজন। একমাত্র সমন্বিত উপকূল ব্যবস্থাপনাই কলাপাড়াকে টেকসইভাবে রক্ষা করতে পারেব বলে পরিবেশ কর্মীসহ বিশেষজ্ঞদের মতামত।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তনজনিত কারণে সাগর-নদীতে পানির উচ্চতা বাড়ায় ইতোমধ্যে ২০২২ সাল থেকে জলোচ্ছ্বাস ঝুঁকিতে বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসরত অন্তত ছয় হাজার পরিবার বর্ষাকালে বাড়িঘরে থাকতে পারছেন না। বর্ষা মৌসুমের পুরো সময়টা পূর্ণিমা-অমাবস্যায় বসতভিটায় অনবরত পানি ঢুকছে। স্বাভাবিক জোয়ার এখন তাঁদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। এছাড়া অন্তত ৫০ কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ বিপন্নের ঝুঁকিতে রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড যদিও কয়েক দশক ধরে উপকূলীয় পোল্ডার ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছে। কিন্তু এসব বাঁধে নতুন করে প্রবল ভাঙন শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী হিসেবে ম্যানগ্রোভ ও নন-ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলও গড়ে তোলা হয়, যা প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়াল হিসেবে কাজ করত; যা এখন উজাড় হয়ে গেছে। বর্তমানে এসব বাঁধ ও বনাঞ্চল যতটুকুই আছে তাও জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, দখল ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়া নির্বাহী প্রকেšশলীর কার্যালয়ের দেয়া তথ্যানুসারে, বর্তমানে কলাপাড়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে সাগরঘেঁষা ৪৮, উপকূলীয় ৪৭/১ ও রাবনাবাদ পাড়ের ৫৪/এ পোল্ডারের বেড়িবাঁধের বাইরের এবং ভেতরের জনগোষ্ঠী। এই তিনটি পোল্ডারের অন্তত ১২০-১৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে সমুদ্রমুখী বাঁধ, নদীতীর প্রতিরক্ষা বাঁধ, অভ্যন্তরীণ পানি নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধী উঁচু প্রতিরক্ষা বাঁধ রয়েছে। কিন্তু সকল বাঁধের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নেই। কুয়াকাটার ৪৮ নম্বর পোল্ডারের ৩৮ দশমিক ০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধটি ২০২১ সালে পুনরাকৃতিকরণের নামে রক্ষণাবেক্ষনের কাজ করা হয়। উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি) এই কাজ নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। শত কোটি ব্যয় করা হলেও যথাযথভাবে বাঁধটির উন্নয়ন করা হয়নি বলে এন্তার অভিযোগ রয়েছে। উল্টো বাঁধটির মাটির জায়গায় বালু দেয়া হয়েছে। বাঁধের বাইরের প্রতিরক্ষা সবুজ দেয়াল বনাঞ্চল উজাড় করে মাটির বাঁধকে জলোচ্ছ্বাস ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে। পর্যটনকর্মী কেএম বাচ্চু জানান, আমরা বহুবার প্রতিবাদ করেছি । তারপরও যথাযথভাবে সিডিউল মেনে সাগরপাড়ের এই বেড়িবাঁধটির উন্নয়ন কাজ করা হয়নি।
আমরা কলাপাড়াবাসী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া, ভূমি ধস, ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের কারণে কলাপাড়ার এসব বাঁধ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ৫০ শতাংশ বাঁধ জলোচ্ছ্বাসে প্লাবনের শঙ্কা রয়েছে। অধিকাংশ বাঁধে কংক্রিট সুরক্ষা নেই। এসব বাঁধ পানি উন্নয়ন বোর্ড অস্থায়ীভাবে জরুরি প্রটেকশনের নামে কোথায় জিও ব্যাগ, কোথাও জিও টিউব এবং কোথাও কংক্রিটের কিছু ব্লক স্থাপন করছে। কোন কোন স্পটে ক্ষুদ্র উপ-বেড়িবাঁধ ও স্থানীয় প্রতিরক্ষা বাঁধও রয়েছে। এসব অস্থায়ী সমাধান। আর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে জলোচ্ছ্বাসের প্রাথমিক ঝাপটা ঠেকানের মতো ম্যানগ্রোভ-ননম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলখ্যাত সবুজ দেয়াল বিলীন হয়ে যাওয়ায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এমনিতেই এশাধিক মেগাপ্রকল্পের উন্নয়নে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জেলে ও কৃষি পেশার অন্তত ২০ হাজার পরিবার পেশা হারানোর শঙ্কায় পড়েছে। এর মধ্যে রাবনাবাদ চ্যনেল নির্ভর জেলে পেশার মানুষ অধিকাংশ। মাছও মেলে না, জালও ফেলতে পারছেন না। পাঁচজুনিয়া গ্রামের বাসীন্দা নাজিয়া-রিন্টু দম্পতি জানান, তাঁদের তিন সন্তানসহ পাঁচ জনের সাজানো-গোছানো সংসারে এখন অচলাবস্থা হয়েছে। চাষাবাদ ছিল, পুকুর ছিল, গবাদিপশু পালতেন। সব শেষ। বিদ্যুত প্লান্ট নির্মানের নামের তাদের জমিজমাসহ হারিয়েছেন। বসতভিটা নেই। বেকার অবস্থায় মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এ দম্পতি জানালেন ওষানকার ২৭৫ টি পরিবার এখন পর্যন্ত পাঁচ বছর ধরে ভাসছেন। আশ্রয়হারা হয়ে গেছে। সবাই কর্মহীন। এমন হাজারো পরিবারে উন্নয়নের কারণে দুরবস্থা নেমে এসেছে। বাঁধের পাশে, নদীরপাড়ে গিয়ে অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন। তাও এখন ঝুঁকিতে। কারণ কলাপাড়া উপকূলের ৭৬ শতাংশ বেড়িবাঁধের পোল্ডারের অংশ জলোচ্ছ্বাস ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪/এ পোল্ডারের রাবনাবাদের অংশ পায়রা বন্দর ও একাধিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের কারণে চারটি ইউনিয়নের মানুষের জলোচ্ছ্বাস ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ পানি উন্নয়ন বোর্ড এই বেড়িবাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ করছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্তমানে রাবনাবাদ, আন্ধারমানিক নদী ও বঙ্গোপসাগরঘেঁষা বেড়িবাঁধের অংশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন। স্থানীয় বাসীন্দারা বলেছেন কলাপাড়ার উপকূলীয় গঙ্গামতি, কুয়াকাটা, চরাঞ্চল, সমুদ্র সংলগ্ন নিম্নভূমি এবং বেড়িবাঁধের বাইরের উপকূলীয় বেষ্টনী এলাকায় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছিল তাও নেই। নদী-সাগর ভাঙনে এবং মানুষের নিধনে এসব বনের কেওড়া, গেওয়া, গরান, ছইলা, গোলপাতাসহ সব উজাড় হয়ে গেছে। ফলে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও হারিয়ে ফেলেছেন উপকূলের মানুষ। আর বর্তমানে বনউজাড়, দখল, রিসোর্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ, নদীভাঙন, লবনাক্ততা বৃদ্ধি, জলবায়ূর পরিবর্তনজনিত পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় এখানকার ঝুঁকি বহুগুনে বাড়ছে। কিন্তু এতো কিছুর পরও গাছ কাটা, মাটি কাটা, বালু উত্তোলন, দখল, বনভূমি রূপান্তরের তান্ডব থেমে নেই। এক কথায় বর্তমানে কলাপাড়া উপকূলের বাঁধ দ্রুত দুর্বল হচ্ছে, নদী ভাঙন বেড়েছে, বনাঞ্চল সঙ্কুচিত হয়ে গেছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে মানুষের জীবন ও সম্পদের দূর্যোগ ঝুঁকি বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, শুধু বাঁধ দিয়ে উপকূল রক্ষা করা সম্ভব নয়। তারা বলেছেন, বাঁধের বাইরের ম্যানগ্রোভ বনই প্রথম প্রতিরক্ষা দেয়াল। এতে জলোচ্ছ্বাসকালে ঢেউয়ের শক্তি কমায়। বাধাগ্রস্ত করে। জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা হ্রাস করে। মাটির ক্ষয় রোধ কওে, বাঁধের আযু বাড়ে। মূলত বন ধ্বংস হলে বেড়িবাঁধের ওপর চাপ বহুগুনে বেড়ে যায়। বাড়ে বাঁধের ঝুঁকি।
এসব পরিবেশবিনাশী ও অপরিকল্পিত কর্মকান্ডের কারণে অদূরভবিষ্যতে ফের সিডর, আইলা, আম্পান, রেমালের মতো ঘুর্ণঝড় আঘাত হানলে কলাপাড়ার গোটা উপকূল বিপর্যস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাইলে কৃষি, মৎস্য ও পর্যটন নির্ভর সমৃদ্ধ উপজেলা কলাপাড়ার মানুষ চরম দুরবস্থায় পড়তে পারে। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকি সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধি, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বিলীন, নদীভাঙন, লবণাক্তা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত পর্যটন ও অপরিকল্পিত সরকারি উন্নয়ন বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পিত পরিবেশ প্রতিবেশ জীববৈচিত্র বান্ধব উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালিত করা জরুরি প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে এই উপজেলাকে ঘিরে সরকারের যেসব উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে যেমন উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন সংস্থা (সিইআইপি), পায়রা কুয়াকাটা সমন্বিত মহাপরিকল্পনা, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী এবং জলবায়ু-স্থিতিস্থাপক বাঁধ উন্নয়ন কর্মকান্ডকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি প্রয়োজন। একমাত্র সমন্বিত উপকূল ব্যবস্থাপনাই কলাপাড়াকে টেকসইভাবে রক্ষা করতে পারেব বলে পরিবেশ কর্মীসহ বিশেষজ্ঞদের মতামত।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন