ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে চীনের আগ্রহ, সমঝোতার চেষ্টা সামিটের

আপলোড সময় : ২৬-০৭-২০২৬ ০৩:০১:২৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৬-০৭-২০২৬ ০৪:১৮:৪৩ অপরাহ্ন
দেশের দুই ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) একটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সারা দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনকে ঘিরে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি একাধিক প্রতিষ্ঠান এ প্রকল্পে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আলোচনায় রয়েছে চীনের চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিএনইই) এবং দেশের সামিট গ্রুপ।
যুগান্তর এক প্রতিবেদনে জানায়, তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনের আগ্রহ নিয়ে সিএনইইর একটি প্রতিনিধিদল বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছে। চলতি সপ্তাহেই তারা জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করবে।

একই সময়ে সামিট গ্রুপও বাতিল হওয়া চুক্তি পুনর্বহালের লক্ষ্যে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রচলিত প্রক্রিয়ার বাইরে বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ পেতে দেশি-বিদেশি কম্পানিগুলোর মধ্যে জোর তৎপরতা চলছে।
সূত্র বলছে, তৃতীয় এফএসআরইউ নিয়ে আগের চুক্তি বাতিলের পর সরকারকে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছে সামিট গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করায় তারা বিষয়টি হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং মামলাটি এখনো বিচারাধীন।

সামিটের ঘনিষ্ঠরা মনে করছেন, বিএনপি সরকার চাইলে আদালতের বাইরে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান সম্ভব। তবে জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাবে এখন পর্যন্ত তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, দেশের গ্যাস সংকট মোকাবেলায় গত চার বছর ধরে তৃতীয় ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সামিটের চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি সৌদি আরামকোর সঙ্গে চলমান আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়। পরে চলতি জুলাইয়ে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে ১২টি দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) পাঠানো হলেও অজ্ঞাত কারণে সেই প্রক্রিয়াও বাতিল করা হয়।

এর মধ্যেই সিএনইইর প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর এবং সামিটের সমঝোতা প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
জানা গেছে, চীনের সিএমসি গ্রুপের মাধ্যমে সিএনইই বাংলাদেশে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সরকারের এক শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকও প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আগ্রহী বলে জানা যায়। খুব শিগগিরই সিএনইই জ্বালানি বিভাগের কাছে তাদের প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারে। ওই উপস্থাপনায় জ্বালানি বিভাগের নীতিনির্ধারকেরা উপস্থিত থাকবেন। এরপরই পরিষ্কার হবে প্রতিষ্ঠানটি কী ধরনের প্রস্তাব নিয়ে প্রকল্পে অংশ নিতে চায়। তবে আরএফপি প্রক্রিয়া বাতিলের পর সরাসরি এ উদ্যোগ কেন নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

চলতি মাসে সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানি পেট্রোবাংলাকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, সরকার চাইলে সমঝোতার ভিত্তিতে তারা আবারও তৃতীয় এফএসআরইউ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রস্তুত। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বাতিল হওয়া চুক্তি পুনর্বহাল করা হলে মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে নতুন টার্মিনাল চালু করা সম্ভব। সমঝোতা হলে তারা হাইকোর্টে চলমান মামলাও প্রত্যাহার করে নেবে।

২০২৪ সালের ৩০ মার্চ বিশেষ আইনের আওতায় সামিটকে তৃতীয় ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের নভেম্বরে টার্মিনালটি চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পেট্রোবাংলা সেই চুক্তি বাতিল করে। পরে বিষয়টি আদালতে নিয়ে যায় সামিট গ্রুপ।

গত ১৩ জুলাই মামলার শুনানিতে সামিট আদালতের কাছে পেট্রোবাংলার সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ চাইলেও হাইকোর্ট সেই আবেদন গ্রহণ করেননি। মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী আগস্টের মাঝামাঝি নির্ধারিত রয়েছে।

সামিট এলএনজি কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সায়েদুল আলম সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আদালতের বাইরে সরকারের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এতে মামলার কোনো আইনি জটিলতা সৃষ্টি হবে না। অন্যদিকে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, সামিটের প্রস্তাবের বিষয়ে মতামত জানতে জ্বালানি বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে, তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সরকারি কর্মকর্তা দাবি করেন, সামিট গ্রুপ অতীত সরকারের সময় জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। তাদের ভাষ্য, বিশেষ আইনের আওতায় একাধিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ নানা সুবিধা পেয়েছিল সামিট। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রধান কার্যালয় সিঙ্গাপুরে স্থানান্তর করলেও ব্যবসা পরিচালনা করে বাংলাদেশে। এসব কারণে বর্তমান সরকারের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাব নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ নেই বলে তারা জানান।

অন্তর্বর্তী সরকার চলতি বছরের শুরুতে সৌদি আরামকোর সঙ্গে এফএসআরইউ প্রকল্প নিয়ে সমঝোতার উদ্যোগ নিলেও জাতীয় নির্বাচনের কারণ দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তখন চুক্তি করতে রাজি হয়নি। পরে বুয়েটের উপাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি প্রকল্পটি পর্যালোচনা করে। কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আরামকো প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের বিপরীতে কঠোর শর্ত দিয়েছে। ১৮ মাসে প্রকল্প শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে তারা ৩০ মাস সময় লাগবে বলে জানায়। এ কারণে আরামকোর সঙ্গে আলোচনা বাতিল করে নতুন করে জি-টু-জি পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করার সুপারিশ করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় গত মাসে জ্বালানি বিভাগ ওমান, সৌদি আরব, আজারবাইজান, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, কাজাখস্তানসহ বিভিন্ন দেশের ১২টি প্রতিষ্ঠানকে আরএফপি পাঠায়। পাশাপাশি ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দূতাবাসসহ সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশনগুলোকেও চিঠি দেওয়া হয়। তবে পরে পুরো প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়। বর্তমানে চীনের সিএনইইর সম্ভাব্য প্রস্তাব নিয়েই বেশি আলোচনা চলছে।

বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকেই আসে প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এ অবস্থায় একটি টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

এদিকে নতুন গ্যাস সংযোগের জন্য সরকারের কাছে ১ হাজার ৮৫৭টি আবেদন জমা রয়েছে। এর মধ্যে ৫৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিমান্ড নোটের অর্থ জমা দেওয়ার চার বছর পরও গ্যাস সংযোগ পায়নি।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :