চিয়াংমাই, ব্রুনেই কিং, রেড পালমার বিক্রিতে আয় ৮ লাখ টাকা

ব্যতিক্রমী আমে মিনারুলের চমক

আপলোড সময় : ২৫-০৭-২০২৬ ০৩:৫০:৪৭ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৫-০৭-২০২৬ ০৩:৫৪:৫১ অপরাহ্ন
মিনারুল হকের বাগানে এখন আর মৌসুমের সেই কোলাহল নেই। কয়েক সপ্তাহ আগেও থাই চিয়াংমাই, ব্রুনেই কিং, রেড পালমার কিংবা হানিডিউ আমগাছের নিচে ভিড় করতেন ক্রেতারা। কেউ গাছ থেকে পছন্দের আম বেছে নিচ্ছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ আবার আগেই বুকিং দেওয়া আম বুঝে নিচ্ছেন। এখন সেই গাছগুলোর বেশির ভাগই ফলশূন্য। শেষ মৌসুমের বারি-৪ আম ঝুলছে হাতে গোনা কয়েকটি গাছে। সেগুলোও আর কয়েক দিনের অতিথি।

তবে মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই বিক্রি হয়ে গেছে বাগানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আমগুলো। কারণ, এগুলো সাধারণ কোনো আম নয়। কোনোটি কলার মতো লম্বাটে, কোনোটি পাকলেও খোসায় লাল আভা ধরে রাখে, আবার কোনোটি ‘মধুর’ মতো মিষ্টি স্বাদের জন্য পরিচিত। এসব ব্যতিক্রমী আমই বদলে দিয়েছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার খিতাপচর গ্রামের কৃষক মিনারুল হকের (৬০) জীবন।

এবারের মৌসুমে দেশি জাতের আম্রপালি ও বারি-৪ এর পাশাপাশি তাঁদের বাগানে ছিল থাইল্যান্ডের বারোমাসি কাটিমন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, কিউজাই, চিয়াংমাই, হানিডিউ ও কিং অব চাকাপাত, ব্ল্যাক স্টোন, ব্রুনেইয়ের ব্রুনেই কিং, যুক্তরাষ্ট্রের রেড পালমার এবং চীনের রেড আইভরিসহ ১৩ জাতের আম। এসব বিরল আম দেখতে, স্বাদ নিতে ও কিনতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে মানুষ ছুটে এসেছেন। মৌসুমজুড়ে প্রায় ১০ হাজার কেজি আম বিক্রি করে আয় হয়েছে ৮ লাখ টাকার বেশি।

মিনারুল হক বলেন, ‘ভয়ে ভয়ে এসব বিদেশি জাতের আমের চারা লাগিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, আমাদের আবহাওয়ায় ফলন হবে কি না। কিন্তু ফলন যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি ক্রেতারও অভাব হয়নি। আগামী মৌসুমে আরও বড় পরিসরে আমের চাষ করব।’

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বাগানের প্রতিটি জাতের আমেরই রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। আম্রপালি ও বারি-৪ উচ্চ ফলনশীল ও বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয়। বারোমাসি কাটিমন বছরে একাধিকবার ফল দেওয়ার সক্ষমতার জন্য পরিচিত। ব্যানানা ম্যাঙ্গো আকারে লম্বাটে, আর রেড পালমার পাকলে খোসায় লালচে আভা ফুটে ওঠে। অন্যদিকে থাই চিয়াংমাই, থাই কিউজাই, ব্রুনেই কিং, হানিডিউ, ব্ল্যাক স্টোন ও কিং অব চাকাপাত জাতগুলো আকার, রং, স্বাদ, সুগন্ধ এবং পাকার সময়ের দিক থেকে একে অন্যের থেকে ভিন্ন। ফলে মে মাস থেকে মৌসুমের শেষ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে আম সংগ্রহ করা যায়। এতে দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে বিভিন্ন জাতের আম সরবরাহ সম্ভব হয়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মসিউর রহমান বলেন, বারোমাসি কাটিমন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, কিউজাই, চিয়াংমাই, হানিডিউ ও ব্ল্যাক স্টোনসহ বিভিন্ন বিদেশি জাতের আম নিয়ে বারিও গবেষণা করছে। এসব জাতের মধ্যে কয়েকটি বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ভালো সম্ভাবনা দেখিয়েছে। বিশেষ করে ব্যানানা ম্যাঙ্গো ও কাটিমন তুলনামূলক ভালো ফলন দিচ্ছে। তবে অধিকাংশ বিদেশি জাত এখনো সীমিত পরিসরে চাষ হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে চাষ আগে সেগুলোর ফলন, রোগবালাই সহনশীলতা এবং স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজন নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

বরই দিয়ে শুরু: 

ছয় বছর আগেও মিনারুল হকের অধিকাংশ জমি ছিল অনাবাদি। জোয়ারের সময় লোনা পানি ঢুকে পড়ত। আগাছায় ভরা সেই জমিতে চাষাবাদের কথা কেউ ভাবতেন না। অন্যদিকে তাঁর দুই ছেলে তানভীরুল হক ও সাইদুল হক উচ্চমাধ্যমিকের পর চাকরির আশায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেও সফল হচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত তাঁরা চাকরির পেছনে না ছুটে বাবার পরিত্যক্ত জমিতেই ভবিষ্যৎ গড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

মাত্র ৩৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে ৭০টি বরইগাছ লাগিয়ে শুরু হয় তাঁদের যাত্রা। সেই উদ্যোগই আজ ১০ একরজুড়ে বিস্তৃত ‘মেসার্স হক অ্যাগ্রো ফার্ম’-এ পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে বাগানটিতে রয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার ফল গাছ। আমের পাশাপাশি বরই, পেয়ারা, মাল্টা, কলা, ডাব ও সুপারির বাগান রয়েছে। আছে মাছের ঘের, গরু, ছাগল ও হাঁসের খামার। খামারের বর্জ্য থেকেই তৈরি হয় জৈব সার, আবার সেই সারই ব্যবহার করা হয় ফল গাছে। পুরো খামারটি এখন সমন্বিত কৃষিব্যবস্থার একটি উদাহরণ।

তবে এই খামারের সবচেয়ে বড় পরিচিতি ব্যতিক্রমী আম। তানভীরুল হক বলেন, ‘সবাই যখন একই ধরনের আমের চাষ করছেন, তখন আমরা ভেবেছি এমন কিছু করব, যা অন্যদের থেকে আলাদা। তাই বিভিন্ন দেশ থেকে অজনপ্রিয় জাতের আমের চারা সংগ্রহ করেছি। এখন অনেকেই নির্দিষ্ট একটি জাতের আমের খোঁজে আমাদের বাগানে আসেন।’

এখানে ফল বিক্রির জন্য বাজারে যেতে হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা পরিচিতদের মাধ্যমে খবর পেয়ে মানুষ পরিবার নিয়ে সরাসরি বাগানে আসেন। কেউ গাছ থেকে নিজের পছন্দের আম তুলে নেন, কেউ আবার আগেই বুকিং দিয়ে রাখেন। এ বছর মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই প্রায় সব আম বিক্রি হয়ে গেছে।

শুধু আম নয়, একই মৌসুমে পেয়ারা বিক্রি হয়েছে প্রায় ২ লাখ টাকার, বরই ৫ লাখ টাকার, সুপারি ৪ লাখ টাকার, ডাব ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকার এবং কলা প্রায় ১ লাখ টাকার। সব মিলিয়ে গত এক বছরে এই খামার থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা আয় হয়েছে।

এই খামার এখন শুধু একটি পরিবারের আয়ের উৎস নয়, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানেরও জায়গা। এখানে নিয়মিত চারজন শ্রমিক কাজ করেন। মৌসুমে কাজের চাপ বাড়লে আরও শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়।
 
এই বাগানই বদলে দিয়েছে মিনারুল হকের পরিবারের জীবন। একসময় কৃষিকাজই ছিল সংসারের একমাত্র ভরসা। কিন্তু অল্প জমিতে চাষাবাদ করে যা আয় হতো, তা দিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচই মেটানো কঠিন ছিল। অনেক সময় ধারদেনা করেও সংসার চালাতে হয়েছে। ব্যতিক্রমী ফলের বাগান গড়ে তোলার পর ধীরে ধীরে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করে। এখন এই বাগানই তাঁদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস।

মিনারুল হক বলেন, ‘একসময় মানুষ বলত, এই জমিতে কিছুই হবে না। এখন সেই মানুষই বাগান দেখতে আসে, চারা নিয়ে যায়, পরামর্শ চায়। এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।’

জানতে চাইলে বোয়ালখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহানুর ইসলাম বলেন, এই পরিবারের মাসিক আয় এক লাখ টাকার বেশি। তাঁদের সাফল্য দেখে এলাকার অনেক কৃষক এখন ফলের বাগান ও সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলতে আগ্রহী হচ্ছেন।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 
 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :