বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবার লাগামছাড়া হওয়ার শঙ্কা

আপলোড সময় : ২৫-০৭-২০২৬ ০৩:৩৮:৩০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৫-০৭-২০২৬ ০৪:০৮:০৭ অপরাহ্ন
বিশ্বের তেলবাজার এত দিন নানা ধাক্কা সামলে স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছে। তবে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এবার সেই স্থিতিশীলতা সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

এবারের তেল সরবরাহ-সংকট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকট, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সেই সংকট মোকাবিলায় নানা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ফলে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের চাপ থেকে অনেকটাই রক্ষা পেয়েছেন।

যুদ্ধ চলাকালে অপরিশোধিত তেলের দাম অনেকটাই বেড়েছে ঠিক। তবে যতটা বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, ততটা বাড়েনি। ২০২২ সালে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৮ ডলার উঠেছিল, এবার দাম সে পর্যন্ত ওঠেনি। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের ঠিক আগে তেলের দাম সর্বকালীন রেকর্ড ১৪৬ ডলারে উঠে যায়, এবার তেলের দাম তার চেয়ে অনেক নিচেই ছিল।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত আরও তীব্র হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আরসিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক কৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফটের বলেন, ‘সংঘাত আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এত দিন ধারণা ছিল, বাজার যেকোনো সংকটের বিকল্প পথ খুঁজে নেবে—এবার সেই ধারণা বদলে যেতে পারে।’

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম মে মাসের পর এই প্রথম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরে অবশ্য দাম কিছুটা কমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার এবং ডিজেলের দাম ৫ দশমিক ২০ ডলারের ওপরে। একই সঙ্গে বন্ড বাজার থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ এখন সবচেয়ে বেশি।

গত পাঁচ মাস ধরে যেসব কারণে তেলের দাম খুব একটা বাড়েনি, সেগুলোর বেশির ভাগই এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে, বা কার্যত বিলীন হয়ে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে নতুন করে বড় উল্লম্ফনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তেল পরিবহনে নতুন সংকট

আগে: লোহিত সাগর হয়ে সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে তেল পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছিল।

এখন: গুরুত্বপূর্ণ দুটি সমুদ্রপথেই সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

জেপি মরগানের তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলার কারণে ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাজার বিকল্প পথ খুঁজে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরে পাঠানো শুরু করেছে। স্বাভাবিক সময়ে এই তেল পারস্য উপসাগরমুখী হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু ক্যাপিটাল ইকোনমিকস বলছে, সেই বিকল্প ব্যবস্থাও এখন ঝুঁকির মুখে। বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের অবরোধের কারণে সৌদি আরবের প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

জেপি মরগানের বৈশ্বিক পণ্যবাজার কৌশল বিভাগের প্রধান নাতাশা কানেভা বলেন, সৌদি আরব চাইলে সুয়েজ খাল হয়ে উত্তরের পথে তেল পাঠাতে পারে। তবে গভীরতার সীমাবদ্ধতার কারণে বড় আকারের পূর্ণ বোঝাই তেলবাহী জাহাজ এ পথে চলতে পারে না। ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তর করে ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকা ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে চার সপ্তাহের যাত্রা বেড়ে প্রায় আট সপ্তাহে দাঁড়ায়।
সংকটের পরিধি বাড়ছে

আগে: তেল সরবরাহ–সংকট মূলত মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

এখন: রাশিয়াও বৈশ্বিক জ্বালানি–সংকটের বড় অংশীদার।

ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার ও কৃষ্ণসাগরে অবস্থিত কাসপিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়ামের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।

এসব হামলার ফলে রাশিয়ায় জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটি ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপোর হিসাবে, নিষেধাজ্ঞার আগে রাশিয়া প্রতিদিন ৮ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করত, বিশ্বের মোট ডিজেল রপ্তানির যা প্রায় ১২ শতাংশ। এই জ্বালানির বড় একটি অংশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এক ধাক্কায় কমে গেছে।

এদিকে কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের হামলায় অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ এমন সময়ে ব্যাহত হচ্ছে, যখন বাজার এমনিতেই চাপে আছে। কাসপিয়ান পাইপলাইন দিয়ে তুলনামূলক কম তেল পরিবহন হলেও এর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১৭ লাখ ব্যারেল তেল বৈশ্বিক বাজারে না-ও আসতে পারে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালির বিকল্প রুটগুলো ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে।


বাংলাস্কুপ/ ডেস্ক/এনআইএন

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :