৩ বছরে ববিতে ৭ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, অধিকাংশই প্রেমঘটিত

আপলোড সময় : ২৪-০৭-২০২৬ ১২:০৪:০৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৪-০৭-২০২৬ ১২:০৪:০৯ অপরাহ্ন
২০২৩ সালের ১৯ জুলাই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন আনন্দবাজার এলাকার একটি মেস থেকে অর্ধগলিত এক ছাত্রীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঠিক তার তিন বছর পর, গত ২১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের খালপাড় এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে পুনরায় অর্ধগলিত এক ছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়। এই দুই ঘটনার মাঝে গলায় ফাঁস নিয়ে আরও পাঁচটি মৃত্যুসহ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় হারিয়েছে মোট সাতজন শিক্ষার্থী। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর বেশিরভাগই ঘটেছে বিয়ে-বহির্ভূত প্রেমঘটিত বিষয়কে কেন্দ্র করে।

এখন থেকে তিন বছর আগে, ২০২৩ সালে যার অর্ধগলিত লাশ বদ্ধ কক্ষে পাওয়া গিয়েছিল, তার নাম শাহরিন রিভানা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস নেয়া ওই শিক্ষার্থী কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এলেও প্রথম বর্ষ শেষ হওয়ার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। পরিবারের বরাতে পুলিশ জানিয়েছিল, ডিপ্রেশনের কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। রিভানা পিরোজপুর জেলার সোহাগদল এলাকার বাসিন্দা আলতাফ মাসুম ইসলাম শাহীনের মেয়ে।

২০২৪ সালের ১৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী বৃষ্টি রানী সরকার নামে এক শিক্ষার্থীর কক্ষের দরজা বন্ধ দেখে মেসের সহপাঠীরা জানালা দিয়ে তাকিয়ে তাকে গলায় ফাঁস দেয়া অবস্থায় ঝুলতে দেখেন। উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত বৃষ্টির বাড়ি সাতক্ষীরায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন কর্ণকাঠির এমএম টাওয়ারের ষষ্ঠ তলায় একটি মেসে থাকতেন। ঘটনাস্থলে দেখা যায়, বৃষ্টি রানী রাতের খাবার বাইরে থেকে কিনে এনেছিলেন। ধারণা করা হচ্ছিল, কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই হঠাৎ সিদ্ধান্তে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর প্রেমিককেও শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মানসিক চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের একটি বিভাগের শিক্ষার্থী।

স্বামীর সঙ্গে হাতের বালা কিনে দেয়া নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে স্বামীর কর্মস্থল বরগুনায় আত্মহত্যা করেন ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী দেবশ্রী রায়। ২০২৪ সালের ১৭ মার্চ ঘরের দরজা ভেঙে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। দেবশ্রীর গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরায় হলেও তার শ্বশুরবাড়ি খুলনায়। তবে তিনি বরগুনা গার্লস স্কুলের সহকারী শিক্ষক স্বামী অঙ্কন রায়ের সঙ্গে বরগুনাতেই থাকতেন। দেবশ্রীর সহপাঠীদের ভাষ্যমতে, তিনি অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের ছিলেন।

তিন মাসের মাথায় ৯ জুন, ২০২৪ সালে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর। তাপসী রাবেয়া বসরী (তৎকালীন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল) হলের রিডিং রুমের বারান্দায় গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে পড়েন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শেফা নূর ইবাদি। সহপাঠীরা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আন্দোলন-সংগ্রাম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এই শিক্ষার্থী স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করতে পারেননি। তার পৈতৃক বাড়ি পটুয়াখালী জেলায়। প্রেমিকের সঙ্গে বিবাদকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন প্রতিবাদী কণ্ঠের এই শিক্ষার্থী। গলায় ফাঁস নেয়ার সময় প্রেমিক ছিলেন ভিডিও কলের অপরপ্রান্তে।

৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যখন নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে তরুণ সমাজ এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই প্রাণের প্রদীপ নিভে যায় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুপর্ণা দাসের। মৃত্যুর আগের দিন নিজ বাড়ি বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার সোনামুখী গ্রামে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে তাকে উদ্ধার করে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শুভ বৈরাগীর ঝুলন্ত লাশ চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি গোপালগঞ্জের বৌলতলীতে নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর আগে ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে শুভ দাবি করেন, প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে প্রেমিকার পরিবারের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অপমান এবং সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার কারণে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তিনি তার মৃত্যুর জন্য কয়েকজন ব্যক্তি ও সমাজব্যবস্থাকে দায়ী করে আত্মহত্যায় প্ররোচনার বিচার দাবি করলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো বিচার হয়নি। পরিবর্তন হয়নি সমাজব্যবস্থার।

সর্বশেষ ২১ জুলাই, প্রায় তিন-চার দিন আগের মরদেহ থেকে দুর্গন্ধ বের হলে বাসার অন্যান্য সদস্যরা কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পান। পরে পুলিশের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে অর্ধগলিত অবস্থায় ঝুলন্ত উচ্ছ্বাস কর্মকার নামে এক শিক্ষার্থীর লাশ দেখতে পাওয়া যায়। তার মেসটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছুটা দূরে খালপাড়-সংলগ্ন নির্জন এলাকায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী। উচ্ছ্বাসের বাড়ি খুলনা জেলার খালিশপুরে।

ক্যাম্পাসে চঞ্চল ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় এই শিক্ষার্থী পূর্বে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়স্থ খুলনা জেলা ছাত্রকল্যাণ সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় এক বছর বেসরকারি চাকরি করার পর সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে আবারও পড়াশোনায় মনোযোগী হন। তবে সরকারি চাকরির নিয়োগ আর পাওয়া হয়নি তার। মৃত্যুর রহস্য এখনো জানা যায়নি। মৃত্যুর আগে তার ফেসবুক আইডি ডিঅ্যাকটিভ পাওয়া যায়। প্রেমিকার ভাষ্যমতে, মৃত্যুর আগে ১৮ জুলাই থেকে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে তার কথা বন্ধ ছিল।

শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ বলেন, আমরা এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি, আজও করেছি। উচ্ছ্বাসের মৃত্যুর বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষে আমরা বলতে পারব, আসল ঘটনা কী।

শিক্ষার্থীদের জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই পদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রামে আছে কি না, তা দেখতে হবে। যদি না থাকে, তাহলে পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ দিতে হবে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুর রহমান এক সাক্ষাৎকারে আত্মহত্যার ব্যাপারে বলেছিলেন, শরীরে যেমন অসুখ হয়, তেমনি মনেরও অসুখ হতে পারে। তাই মনকে অবহেলা করা উচিত নয়। যে কোনো সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পরিবারের কেউ মানসিক সমস্যায় ভুগলে তাকে অবহেলা না করে যত্ন ও সহায়তা দিতে হবে। আমাদের দেশে প্রতিবছর ১২ থেকে ১৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। সবাই সচেতন হলে এই মৃত্যুগুলো অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে মানসিক রোগের চিকিৎসা এখন অনেক সহজলভ্য। একজন মানসিক রোগী যেন ধীরে ধীরে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত না হন, সে জন্য পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া আত্মহত্যা প্রতিরোধে সাংবাদিকদেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। জনগণের সামনে আত্মহত্যার ক্ষতিকর দিকগুলো এমনভাবে তুলে ধরতে হবে, যাতে মানসিকভাবে বিপন্ন যে কেউ আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে না পড়েন।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :