দিনদিন বাড়ছে চাহিদা

রসে ভরা মধুপুরের আনারসের সুনাম সারাদেশে

আপলোড সময় : ০৩-০৭-২০২৬ ০২:১৫:৩৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৩-০৭-২০২৬ ০২:১৫:৩৮ অপরাহ্ন
টাঙ্গাইলের মধুপুরে দিনদিন বাড়ছে আনারস চাষ। প্রায় ৮ দশক পর জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে মধুপুর গড়ের রসালো ফল আনারস। লাল মাটির বনাঞ্চল হিসেবে যেমন মধুপুরের খ্যাতি আছে; তেমনই আনারসেরও আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশজুড়ে আছে সুনাম। চলতি বছরেও ভালো ফলনের আশা করছেন চাষিরা। কৃষি বিভাগ বলছে, চাষিদের সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে।

জানা যায়, এখন জলডুগি আনারসের মৌসুম। জুন-জুলাই মাসে এ ফলের বাজার জমে। মধুপুর গড় এলাকার জলডুগি যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। ভোর থেকে শুরু হয় বেচাকেনা। চলে সারাদিন। এখন প্রতিটি আনারস আকারভেদে ১৫-৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। গুণে-মানে, স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় হওয়ায় চাহিদাও আছে ব্যাপক।

চাষিরা জানান, আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে আনারসের দাম। অতিবৃষ্টি, বৈরী আবহাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে দাম কমে যায়। তখন কৃষকের কপালে দেখা যায় হতাশার ভাঁজ। এ জন্য আনারস প্রক্রিয়াজাতকরণ, হিমাগার, জুস, জেলিসহ আনারসকেন্দ্রিক পণ্য তৈরি করা গেলে পাওয়া যাবে ন্যায্যমূল্য।

স্থানীয়রা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টাঙ্গাইলে কৃষি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে আনারস প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। তার বক্তব্যে কৃষকের মধ্যে নতুন আশা সৃষ্টি হয়েছে। নতুন করে দেখা দিয়েছে স্বপ্ন। বিদেশে রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ হলে কৃষকেরা পাবেন ন্যায্যমূল্য, বাড়বে বহুমুখি ব্যবহার। প্রসার ঘটবে বিশ্বব্যাপী।

ইতিহাস বলছে, উপজেলার আউশনারা ইউনিয়নের ভেরেনা সাংমা নামের ব্যক্তি ষাটের দশকের শেষদিকে ভারতের মেঘালয় থেকে কয়েকটি জায়ান্টকিউ জাতের আনারসের চারা মধুপুর গড়ে এনে রোপণ করেন। প্রথমবারেই ভালো ফলন হয়। খেতেও সুস্বাদু ছিল। পরে আরও জমিতে চাষ করেন। তার দেখাদেখি অন্যরাও আনারস চাষ করতে থাকেন। এরপর থেকে মধুপুর গড়ে দিনদিন বাড়ছে চাষাবাদ। ফলন বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃষকেরাও লাভবান হচ্ছেন।

এদিকে ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর মধুপুরের আনারস জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর ফলে খুশি হন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। এ আনারস এখন মধুপুরের অর্থনীতির প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার আনারস বেচাকেনা হয়ে থাকে। মধুপুর গড়ের জলছত্র হচ্ছে আনারসের সবচেয়ে বড় বাজার। এ ছাড়া মোটের বাজার ও গারো বাজার আছে। এসব বাজারে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পাইকার আসেন আনারস কিনতে। ময়মনসিংহ, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর, ঢাকা, সিলেট, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, বরিশাল, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা আসেন। প্রতিদিন বাজারে প্রচুর বেচাকেনা হয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে যাচ্ছে মধুপুরের আনারস। বর্তমানে আনারসের দাম ভালো থাকলেও অন্য সময়ে দাম পাওয়া যায় না। প্রক্রিয়াজাত ও বিদেশে রপ্তানি হলে আনারসের দাম বেশি পাওয়া যাবে। আনারস চাষের সুনাম ধরে রাখতে জৈবিক উপায়ে চাষ করে বৈদেশিক বাণিজ্য ধরতে পারলে ফিরে আসবে ঐতিহ্য। এতে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য আর বাংলাদেশ পাবে বৈদেশিক মুদ্রা। প্রক্রিয়াজাত ও শিল্পকারখানা করতে পারলে বাড়বে দাম ও চাহিদা সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থানের।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় চলতি মৌসুমে ৭ হাজার ৭৭৩ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ১৮২ মেট্রিক টন। এর মধ্যে মধুপুরে ৬ হাজার ৯৪৩ হেক্টর জমিতে আনারস আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ১৩২ মেট্রিক টন। এর মধ্যে জলডুগি এবং ক্যালেন্ডার প্রজাতির আনারস চাষ হয়েছে বেশি। এ ছাড়া ফিলিপাইন থেকে আমদানি করা জাত এমডি-টুও আবাদ হয়েছে।

কৃষক ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘এবার আমি ২ একর জমিতে আনারস আবাদ করেছি। আমার আনারস কেমিক্যালমুক্ত। যার ফলে প্রতি পিস আকারভেদে ৩০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ বছর আনারসের দাম ভালো হওয়ায় আমরা বেশ লাভবান হচ্ছি। প্রতি বিঘায় আনারসের খরচ ৬০-৭০ হাজার টাকা। এতে ভালো দাম পাওয়া গেলে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়।’

কৃষক কাবিল উদ্দিন বলেন, ‘১০ বিঘা জমিতে আনারস চাষ করেছি। বাজার ভালো থাকলে আনারসের আবাদ করে লাভবান হওয়া যায়। একটি আনারসে ১২-১৩ টাকা খরচ হয়। আশা করছি এবার আনারসের ফলন ভালো হবে।’

মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রকিব আল রানা বলেন, ‘লাল মাটির আনারস স্বাদে, গুণে, মানে ভালো হওয়ায় সারাদেশেই এর চাহিদা আছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আশা করছি এ বছর ফলন ভালো হবে। প্রতি হেক্টরে ৩৫ মেট্রিক টন পর্যন্ত উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ বছর জলডুগি আনারস প্রায় ৫শ কোটি টাকা বিক্রি হতে পারে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হয়।’

মধুপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জুবায়ের হোসেন বলেন, ‘মধুপুরের জিআই পণ্য আনারস সারাদেশেই যাচ্ছে। আনারসকেন্দ্রিক শিল্পকারখানা এবং বিদেশে রপ্তানি করা গেলে কৃষকেরা উপকৃত হবেন।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আশেক পারভেজ বলেন, ‘মধুপুরের আনারসের নিরাপদ উৎপাদন, সঠিক বাজারজাতকরণ এবং বিদেশে রপ্তানি বিষয়ে একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। আমরা আনারস চাষিদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছি। সারাবছরই কমবেশি আনারস চাষ হয়ে থাকে।’
 
বাংলাস্কুপ/ প্রতিনিধি/এনআইএন 

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :