‘নদী শুধু ঘর নেয়নি, স্বপ্নও কেড়ে নিয়েছে’

আপলোড সময় : ২৮-০৬-২০২৬ ০৩:৩৫:৫৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৮-০৬-২০২৬ ০৩:৩৬:৩৬ অপরাহ্ন
যমুনা যেন এবার শুধু মাটি নয়, মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি আর অস্তিত্বও গিলে খাচ্ছে। প্রতিদিন নদীর বুকে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক বসতভিটা, ফসলি জমি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি পূর্বপুরুষদের কবরও। নদীর তীব্র স্রোতের সামনে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিরাজগঞ্জের সদর, কাজিপুর ও চৌহালী উপজেলার হাজারো মানুষ।

জানা যায়, গত ২ সপ্তাহের টানা নদীভাঙনে শতাধিক বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, দোকানপাট, অসংখ্য গাছপালা এবং শত শত বিঘা আবাদি জমি যমুনার গর্ভে বিলীন হয়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ছে। ঘর হারানোর আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে নদীপাড়ের মানুষের।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশ ইউনিয়নে। একসময় যেখানে ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবারের কোলাহলে মুখর ছিল পুরো চর, সেখানে এখন সর্বত্র ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। স্থানীয়দের ভাষ্য, মাত্র ২ সপ্তাহে অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। যেভাবে নদী তীর ভাঙছে, তাতে আরো শতাধিক পরিবার যেকোনো সময় গৃহহীন হয়ে পড়তে পারে।

একই চিত্র চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়নের চরসলিমাবাদ, ভূতের মোড়, বিনানুই ও ভুসুরিয়া চরাঞ্চলেও। প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলমান ভাঙনে অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল ও দোকানপাট নদীগর্ভে চলে গেছে। কৃষকের বছরের পর বছর পরিশ্রমে গড়ে ওঠা শত শত বিঘা ফসলি জমিও নিমিষেই বিলীন হচ্ছে যমুনার বুকে।

এদিকে, গত ২০ জুন বিকেলে সদর উপজেলার বাহুকা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীতে ধসে পড়েছে। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চালাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি আরো বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর অনেকেই এখন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছে।

চরগিরিশ গ্রামের ভাঙনকবলিত বাসিন্দা আব্দুল মমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এই চরে বাবা-দাদার ভিটা ছিল। জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে ঘর তুলেছিলাম। কয়েক দিনের মধ্যেই সব নদীতে চলে গেল। এখন অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছি।

রফিকুল ইসলাম বলেন, চোখের সামনে সবকিছু নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, কী খাব সেটাই সবচেয়ে বড় চিন্তা।

চরসলিমাবাদের কোহিনুর খাতুন বলেন, আমরা গরিব মানুষ। যা ছিল সব নদী নিয়ে গেছে। সরকারি সহায়তা না পেলে খোলা আকাশের নিচেই থাকতে হবে।

রেজাউল করিমের ভাষায়, নদী শুধু ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়নি, আমাদের স্বপ্নও কেড়ে নিয়েছে। নিজের দেশেই আমরা যেন উদ্বাস্তু হয়ে গেছি। আমাদের পূর্বপুরুষদের কবর আর মসজিদও নদীতে চলে গেছে। এই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

ষাটোর্ধ্ব রশিদ মিয়ার অসহায় আর্তনাদ- জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, কিন্তু এমন অসহায় কখনো লাগেনি। এখন কোথায় যাব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর যমুনার ভাঙন চললেও কার্যকর ও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগে থেকেই চিহ্নিত থাকলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ভাঙন শুরু হওয়ার পর জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নদীর ভয়াল আগ্রাসন ঠেকাতে পারছে না। তাদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় টেকসই তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ ছাড়া এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

চরগিরিশ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আল আমিন সরকার বলেন, একসময় এই চরে অনেক পরিবারের বসবাস ছিল। আগের ভাঙনে প্রায় ১৫০টি পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। গত ২ সপ্তাহের ভাঙনে আরো অন্তত ৩০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আরো শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারাবে।

যমুনার পানি বৃদ্ধির কারণে নদীতীরবর্তী অনেক এলাকায় ভাঙনের আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে। নিচু এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নৌকা ছাড়া চলাচলও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনার পানি ৩ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর পয়েন্টে ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৪৮ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর পয়েন্টে ১৯৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল আমিন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, যমুনার পানি বৃদ্ধির কারণে সদর, কাজিপুর, শাহজাদপুর ও চৌহালীর কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে তীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে স্থায়ী সমাধানের প্রস্তাবও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

যমুনার ভাঙন শুধু জমি বা ঘরবাড়ি কেড়ে নিচ্ছে না, এটি মানুষের শেকড়, স্মৃতি, স্বপ্ন আর ভবিষ্যতও ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন নতুন করে গৃহহীন হচ্ছে পরিবার, বাড়ছে অনিশ্চয়তা। নদীপাড়ের মানুষের এখন একটাই দাবি- অস্থায়ী নয়, টেকসই ও স্থায়ী সমাধান। যেন আর কোনো পরিবারকে চোখের সামনে নিজের ভিটেমাটি হারানোর নির্মম দৃশ্য দেখতে না হয়।
 
বাংলাস্কুপ/ প্রতিনিধি/এনআইএন 

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :