চট্টগ্রামের সাতকানিয়া-লোহাগাড়া এবং কক্সবাজারের চকরিয়া-মাতামুহুরি অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান তামাক চাষ একদিকে খাদ্যশস্যের জমি গ্রাস করছে। ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। অন্যদিকে কৃষক, শ্রমিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য তৈরি করছে গুরুতর স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি। দাদনভিত্তিক ব্যবসায়িক প্রভাব, বিকল্প ফসল চাষে সীমিত সহায়তা এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে তামাকের এই বিস্তার থামানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইনগতভাবে তামাক মাদকদ্রব্যের তালিকাভুক্ত না হলেও এতে থাকা নিকোটিনকে অত্যন্ত আসক্তিকর উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিকোটিনের আসক্তি মাদকাসক্তির মতোই শারীরিক ও মানসিক নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তামাককে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের পাশাপাশি কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরি নদী তীরবর্তী এলাকা, ফাঁসিয়াখালী, হারবাং, ডুলাহাজারা ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে ব্যাপক তামাক চাষ দেখা গেছে। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, সাধারণত নভেম্বর-ডিসেম্বরে তামাকের চারা রোপণ শুরু হয়। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত গাছের বৃদ্ধি ঘটে এবং এপ্রিল-মে মাসে পাতা সংগ্রহ ও শুকানোর কাজ চলে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধান বা সবজি চাষের তুলনায় তামাক কোম্পানিগুলো আগাম অর্থ, সার, বীজ ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করায় অনেক কৃষক এ চাষে ঝুঁকছেন।
কয়েক বছর আগেও যে-সব জমিতে ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা ও আলুসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্য চাষ হতো, সেসব জমির বড় অংশ এখন তামাক চাষের আওতায় চলে এসেছে। তামাক কোম্পানিগুলোর প্রলোভন এবং তুলনামূলক বেশি লাভের আশায় কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে।
সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নের মাহালিয়া বিল এলাকায় কৃষক মো. দেলোয়ার, গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে আরও তিন কানি বেশি জমিতে তামাক চাষ করেছেন। তিনি জানান, চার বছর আগে তামাক কোম্পানির প্রস্তাবে পাঁচ কানি জমিতে তামাক চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি, আট কানি জমিতে এ ফসল আবাদ করছেন। দেলোয়ারের দাবি, তামাক চাষ করে তিনি লাভবান হয়েছেন এবং তার পরিবারের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হয়েছে।
তামাক পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জেনেও কেন? এ চাষ করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোম্পানি বিনামূল্যে বীজ, সার ও কীটনাশক দেয়। সেচের জন্য আর্থিক সহায়তা দেয় এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শও প্রদান করে। পাশাপাশি নির্ধারিত দামে তামাকপাতা কিনে দ্রুত অর্থ পরিশোধ করায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
দেলোয়ারের মতো আরও অনেক কৃষক এবার খাদ্যশস্যের জমিতে তামাক চাষ করেছেন। তাদের ভাষ্য, অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও তামাক কোম্পানিগুলোর নানা সহায়তার কারণে ক্ষতি জেনেও তারা এ চাষে যুক্ত হচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, তামাক কোম্পানির প্রতিনিধি ও দাদন ব্যবসায়ীরা মৌসুমের শুরুতেই কৃষকদের হাতে নগদ অর্থ তুলে দেন। বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমিতে তামাক চাষের শর্ত আরোপ করা হয়।
কৃষকদের দাবি, শুরুতে লাভজনক মনে হলেও উৎপাদন ব্যয়, শ্রম খরচ এবং জমির উর্বরতা কমে যাওয়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদে অনেকেই ক্ষতির মুখে পড়েন। তবে আগাম অর্থের সুবিধার কারণে তারা দাদনের চক্র থেকে বের হতে পারেন না।
কৃষিবিদদের মতে, তামাক গাছ মাটি থেকে প্রচুর পরিমাণ নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান শোষণ করে। ফলে একই জমিতে বছরের পর বছর তামাক চাষ করলে মাটির জৈব গুণ ও উর্বরতা কমে যায়।
এছাড়া অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মাটির স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব পরবর্তী মৌসুমে ধান, ডাল, ভুট্টা ও সবজির উৎপাদনের ওপর পড়ে।
কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম তামাক উৎপাদন এলাকা হিসেবে পরিচিত। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবছর কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়। তবে প্রকৃত চাষের পরিমাণ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক জমি অনানুষ্ঠানিকভাবে তামাক চাষের আওতায় আসায় সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু এলাকায় তামাক চাষ কমলেও দাদন সুবিধার কারণে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া ও মাতামুহুরি অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনও এ চাষ অব্যাহত রয়েছে।
তামাক চাষের সময় কৃষক ও শ্রমিকরা সরাসরি নিকোটিনের সংস্পর্শে আসেন। ভেজা তামাকপাতা সংগ্রহের সময় ত্বকের মাধ্যমে নিকোটিন শরীরে প্রবেশ করে ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ সৃষ্টি করতে পারে। এতে বমিভাব, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও শারীরিক অস্বস্তি দেখা দেয়।
তামাক শুকানোর সময় নির্গত ধোঁয়া ও রাসায়নিক পদার্থ পরিবেশ দূষণ করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে স্থাপিত তামাক শুকানোর ভাঁটির কারণে শিশু ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, কাশি ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে তারা, তামাকপাতা সংগ্রহ ও শুকানোর কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে, যা তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
তামাকপাতা শুকানোর জন্য বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কাঠ ব্যবহৃত হয়। ফলে বন উজাড়ের ঝুঁকি বাড়ে। তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ বৃষ্টির পানির সঙ্গে খাল, নদী ও জলাশয়ে গিয়ে জলজ প্রাণীর জন্যও হুমকি সৃষ্টি করে।
পরিবেশবিদদের মতে, মাতামুহুরি নদী অববাহিকা ও পার্বত্য সংলগ্ন এলাকায় তামাক চাষের সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশে তামাক চাষ সরাসরি নিষিদ্ধ নয়। তবে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩ ও ২০১৫) মূলত তামাকের ব্যবহার, বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বিধান দিয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিকল্প ফসল চাষে উৎসাহ দিলেও পর্যাপ্ত প্রণোদনা, বাজারসংযোগ ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে কৃষকরা তামাক কোম্পানির দাদন ও নিশ্চিত বাজারের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধু সচেতনতামূলক সভা নয়, ভুট্টা, সূর্যমুখী, ডাল, চিনাবাদাম, সবজি ও ফলচাষে আর্থিক সহায়তা এবং বাজার নিশ্চয়তা দিতে হবে। অন্যথায়, তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সচেতনতার অভাবে মানুষ তামাক চাষ করছেন। লাভ বেশি হলেও এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এবং পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। সরকার কৃষি খাতকে সমৃদ্ধ করতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে তামাক একটি নিরুৎসাহিত ফসল।
তিনি বলেন, উপজেলার কয়েকটি এলাকায় কয়েক বছর ধরে তামাক চাষ হচ্ছে এবং এর পরিধি বাড়ছে। তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের নগদ অর্থ, সার ও অন্যান্য সুবিধা দিয়ে আকৃষ্ট করছে। এমনকি কৃষকদের সন্তানদের চাকরির প্রলোভনও দেখানো হচ্ছে।
তামাক নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠন ইপসা-এর হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ও সরকারের বিভিন্ন নীতিমালায় ধীরে ধীরে তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করে বিকল্প ফসলের দিকে কৃষকদের উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এখনও সীমিত। তামাক চাষের প্রকৃত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে হবে। দাদনভিত্তিক চুক্তি চাষের ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিকল্প ফসলের জন্য সহজ ঋণ ও প্রণোদনা বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাক শুকানোর ভাটি নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। রাষ্ট্র ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে এ বিষয়ে জনমত গড়ে তুলতে হবে।
চট্টগ্রাম জেলা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, তামাক চাষ শুধু পরিবেশ ও কৃষির জন্য নয়, কৃষক ও স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। ভেজা তামাকপাতার সংস্পর্শে আসার ফলে শরীরে নিকোটিন শোষিত হয়ে ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ হতে পারে। এতে মাথা ঘোরা, বমিভাব, দুর্বলতা, মাথাব্যথা ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
তিনি আরও বলেন, তামাক শুকানোর ভাটি থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণিকা আশপাশের মানুষের জন্যও স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বাংলাস্কুপ/ প্রতিনিধি/এনআইএন
আইনগতভাবে তামাক মাদকদ্রব্যের তালিকাভুক্ত না হলেও এতে থাকা নিকোটিনকে অত্যন্ত আসক্তিকর উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিকোটিনের আসক্তি মাদকাসক্তির মতোই শারীরিক ও মানসিক নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তামাককে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের পাশাপাশি কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরি নদী তীরবর্তী এলাকা, ফাঁসিয়াখালী, হারবাং, ডুলাহাজারা ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে ব্যাপক তামাক চাষ দেখা গেছে। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, সাধারণত নভেম্বর-ডিসেম্বরে তামাকের চারা রোপণ শুরু হয়। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত গাছের বৃদ্ধি ঘটে এবং এপ্রিল-মে মাসে পাতা সংগ্রহ ও শুকানোর কাজ চলে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধান বা সবজি চাষের তুলনায় তামাক কোম্পানিগুলো আগাম অর্থ, সার, বীজ ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করায় অনেক কৃষক এ চাষে ঝুঁকছেন।
কয়েক বছর আগেও যে-সব জমিতে ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা ও আলুসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্য চাষ হতো, সেসব জমির বড় অংশ এখন তামাক চাষের আওতায় চলে এসেছে। তামাক কোম্পানিগুলোর প্রলোভন এবং তুলনামূলক বেশি লাভের আশায় কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে।
সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নের মাহালিয়া বিল এলাকায় কৃষক মো. দেলোয়ার, গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে আরও তিন কানি বেশি জমিতে তামাক চাষ করেছেন। তিনি জানান, চার বছর আগে তামাক কোম্পানির প্রস্তাবে পাঁচ কানি জমিতে তামাক চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি, আট কানি জমিতে এ ফসল আবাদ করছেন। দেলোয়ারের দাবি, তামাক চাষ করে তিনি লাভবান হয়েছেন এবং তার পরিবারের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হয়েছে।
তামাক পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জেনেও কেন? এ চাষ করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোম্পানি বিনামূল্যে বীজ, সার ও কীটনাশক দেয়। সেচের জন্য আর্থিক সহায়তা দেয় এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শও প্রদান করে। পাশাপাশি নির্ধারিত দামে তামাকপাতা কিনে দ্রুত অর্থ পরিশোধ করায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
দেলোয়ারের মতো আরও অনেক কৃষক এবার খাদ্যশস্যের জমিতে তামাক চাষ করেছেন। তাদের ভাষ্য, অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও তামাক কোম্পানিগুলোর নানা সহায়তার কারণে ক্ষতি জেনেও তারা এ চাষে যুক্ত হচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, তামাক কোম্পানির প্রতিনিধি ও দাদন ব্যবসায়ীরা মৌসুমের শুরুতেই কৃষকদের হাতে নগদ অর্থ তুলে দেন। বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমিতে তামাক চাষের শর্ত আরোপ করা হয়।
কৃষকদের দাবি, শুরুতে লাভজনক মনে হলেও উৎপাদন ব্যয়, শ্রম খরচ এবং জমির উর্বরতা কমে যাওয়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদে অনেকেই ক্ষতির মুখে পড়েন। তবে আগাম অর্থের সুবিধার কারণে তারা দাদনের চক্র থেকে বের হতে পারেন না।
কৃষিবিদদের মতে, তামাক গাছ মাটি থেকে প্রচুর পরিমাণ নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান শোষণ করে। ফলে একই জমিতে বছরের পর বছর তামাক চাষ করলে মাটির জৈব গুণ ও উর্বরতা কমে যায়।
এছাড়া অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মাটির স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব পরবর্তী মৌসুমে ধান, ডাল, ভুট্টা ও সবজির উৎপাদনের ওপর পড়ে।
কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম তামাক উৎপাদন এলাকা হিসেবে পরিচিত। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিবছর কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়। তবে প্রকৃত চাষের পরিমাণ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক জমি অনানুষ্ঠানিকভাবে তামাক চাষের আওতায় আসায় সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু এলাকায় তামাক চাষ কমলেও দাদন সুবিধার কারণে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া ও মাতামুহুরি অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনও এ চাষ অব্যাহত রয়েছে।
তামাক চাষের সময় কৃষক ও শ্রমিকরা সরাসরি নিকোটিনের সংস্পর্শে আসেন। ভেজা তামাকপাতা সংগ্রহের সময় ত্বকের মাধ্যমে নিকোটিন শরীরে প্রবেশ করে ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ সৃষ্টি করতে পারে। এতে বমিভাব, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও শারীরিক অস্বস্তি দেখা দেয়।
তামাক শুকানোর সময় নির্গত ধোঁয়া ও রাসায়নিক পদার্থ পরিবেশ দূষণ করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে স্থাপিত তামাক শুকানোর ভাঁটির কারণে শিশু ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, কাশি ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে তারা, তামাকপাতা সংগ্রহ ও শুকানোর কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে, যা তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
তামাকপাতা শুকানোর জন্য বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কাঠ ব্যবহৃত হয়। ফলে বন উজাড়ের ঝুঁকি বাড়ে। তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ বৃষ্টির পানির সঙ্গে খাল, নদী ও জলাশয়ে গিয়ে জলজ প্রাণীর জন্যও হুমকি সৃষ্টি করে।
পরিবেশবিদদের মতে, মাতামুহুরি নদী অববাহিকা ও পার্বত্য সংলগ্ন এলাকায় তামাক চাষের সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশে তামাক চাষ সরাসরি নিষিদ্ধ নয়। তবে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩ ও ২০১৫) মূলত তামাকের ব্যবহার, বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বিধান দিয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিকল্প ফসল চাষে উৎসাহ দিলেও পর্যাপ্ত প্রণোদনা, বাজারসংযোগ ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে কৃষকরা তামাক কোম্পানির দাদন ও নিশ্চিত বাজারের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধু সচেতনতামূলক সভা নয়, ভুট্টা, সূর্যমুখী, ডাল, চিনাবাদাম, সবজি ও ফলচাষে আর্থিক সহায়তা এবং বাজার নিশ্চয়তা দিতে হবে। অন্যথায়, তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সচেতনতার অভাবে মানুষ তামাক চাষ করছেন। লাভ বেশি হলেও এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এবং পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। সরকার কৃষি খাতকে সমৃদ্ধ করতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে তামাক একটি নিরুৎসাহিত ফসল।
তিনি বলেন, উপজেলার কয়েকটি এলাকায় কয়েক বছর ধরে তামাক চাষ হচ্ছে এবং এর পরিধি বাড়ছে। তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের নগদ অর্থ, সার ও অন্যান্য সুবিধা দিয়ে আকৃষ্ট করছে। এমনকি কৃষকদের সন্তানদের চাকরির প্রলোভনও দেখানো হচ্ছে।
তামাক নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠন ইপসা-এর হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ও সরকারের বিভিন্ন নীতিমালায় ধীরে ধীরে তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করে বিকল্প ফসলের দিকে কৃষকদের উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এখনও সীমিত। তামাক চাষের প্রকৃত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে হবে। দাদনভিত্তিক চুক্তি চাষের ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিকল্প ফসলের জন্য সহজ ঋণ ও প্রণোদনা বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাক শুকানোর ভাটি নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। রাষ্ট্র ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে এ বিষয়ে জনমত গড়ে তুলতে হবে।
চট্টগ্রাম জেলা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, তামাক চাষ শুধু পরিবেশ ও কৃষির জন্য নয়, কৃষক ও স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। ভেজা তামাকপাতার সংস্পর্শে আসার ফলে শরীরে নিকোটিন শোষিত হয়ে ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ হতে পারে। এতে মাথা ঘোরা, বমিভাব, দুর্বলতা, মাথাব্যথা ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
তিনি আরও বলেন, তামাক শুকানোর ভাটি থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণিকা আশপাশের মানুষের জন্যও স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বাংলাস্কুপ/ প্রতিনিধি/এনআইএন