দেশে ইভি রূপান্তরের বড় বাধা বিদ্যুৎ সংকট

আপলোড সময় : ২৭-০৬-২০২৬ ০১:১৪:০৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৭-০৬-২০২৬ ০১:১৪:০৮ অপরাহ্ন
দেশে বৈদ্যুতিক যান (ইভি) খাতের বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকলেও তীব্র অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং চলমান বিদ্যুৎ সংকটের কারণে থমকে আছে এর অগ্রগতি। শনিবার (২৭ জুন) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিআইআই) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক সেমিনারে দেশের অটোমোবাইল খাতের এই বাস্তব চিত্র এবং ভবিষ্যৎ নীতিমালার একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়।ডিসিআইআই এবং বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনেবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) যৌথ উদ্যোগে এই সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে জানানো হয়, দেশের পরিবহন খাত বর্তমানে মোট পেট্রোলিয়ামের প্রায় ৬৩.৪১ শতাংশ ব্যবহার করে থাকে। বিশ্বজুড়ে যখন কার্বন নিঃসরণ কমাতে পরিবেশবান্ধব ইভি প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ঘটছে, তখন বাংলাদেশে এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। অথচ সাধারণ গাড়ির তুলনায় ইভি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিচালন এবং পরিবেশগত সুবিধা অত্যন্ত স্পষ্ট।

ডিসিআইআই-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, একটি সাধারণ জ্বালানিচালিত গাড়ি চালাতে প্রতি কিলোমিটারে যেখানে প্রায় ১১ থেকে ১৪ টাকা খরচ হয়, সেখানে বৈদ্যুতিক যানের ক্ষেত্রে এই খরচ মাত্র ২.৮ থেকে ৩.৮ টাকা। শুধু তাই নয়, ইভি যানের রক্ষণাবেক্ষণ বা মেইনটেন্যান্স খরচ সনাতন ইঞ্জিনচালিত গাড়ির চেয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কম হয়ে থাকে। সাধারণ পেট্রোল বা ডিজেল চালিত গাড়ির শক্তি দক্ষতা যেখানে মাত্র ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ, বৈদ্যুতিক যানের ক্ষেত্রে তা ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কাজ করে। দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব কমাতেও এটি দারুণ কার্যকর।

বর্তমানে বাংলাদেশে মোট নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৬৭ লাখ ২৪ হাজার ৪৭টি, যার মধ্যে প্রায় ৪৯ লাখ ৮০ হাজারই মোটরসাইকেল। তবে থ্রি-হুইলার বাদে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত চার চাকার আধুনিক ইভি রয়েছে মাত্র ৬৬৯টি।

অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে দেশের আনাচে-কানাচে আনুমানিক ৬০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার বা ই-ইজি বাইক চলাচল করছে। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই বিশাল থ্রি-হুইলার বহরের ৯০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে তৈরি এবং সম্পূর্ণ অবিন্যস্ত বা কাঠামোবিহীন, যার ওপর সুনির্দিষ্ট নীতিমালার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

বাংলাদেশের ইভি রূপান্তরের পথে বেশ কিছু প্রধান কাঠামোগত অন্তরায় রয়েছে, যার মধ্যে জ্বালানি সংকট অন্যতম। দেশে বিদ্যুতের জাতীয় চাহিদা প্রায় ১৭,০০০ মেগাওয়াট। বর্তমান তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এমনিতেই দেশের অনেক ভারী শিল্প তাদের পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেক ব্যবহার করে চলছে। এমন অবস্থায় ইভি চালুর বাড়তি চাপ বিদ্যুৎ গ্রিড কতটা সামলাতে পারবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।

এর পাশাপাশি থ্রি-হুইলার, ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক সব ধরনের গাড়ির জন্যই পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন নেই এবং বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা ও প্রধান মহাসড়কগুলোতে ইভি চার্জিংয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

টার্মিনাল ও ডিপোর অপ্রতুলতাও একটি বড় সমস্যা; যেখানে সারা দেশে ৫৩ হাজারেরও বেশি এবং শুধু ঢাকাতেই ৮ হাজার বাস চলাচল করে, সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত বা সুব্যবস্থিত ডিপোর সংখ্যা ৩০টিরও কম। এটি বড় বাণিজ্যিক ইভি বাস চালুর পথে বড় বাধা। ইভি ব্যাটারির নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করা, মান পরীক্ষার ল্যাবরেটরি তৈরি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা এখনও তৈরি হয়নি।

দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন খরচ কম হলেও সাধারণ মানুষের জন্য ইভি গাড়ির প্রাথমিক ক্রয়মূল্য অনেক বেশি এবং ব্যাটারি পরিবর্তন ও খরচের রিটার্ন পিরিয়ড নিয়ে ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের মাঝে এখনও সংশয় রয়ে গেছে।

এই খাতকে গতিশীল করতে সরকার ‘অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২১’, ‘ইলেকট্রিক মোটর ভেহিকেল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ট্রাফিক পলিসি ২০২৩’ এবং ‘ইভি চার্জিং গাইডলাইন ২০২২’ এর মতো বেশ কিছু নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

একইসঙ্গে ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২৫’ এর খসড়াও চূড়ান্ত করা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত খাতে অন্তত ৩০ শতাংশ ইভি চালুর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। খাতটিকে উৎসাহিত করতে কর ছাড়ের ক্ষেত্রে ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের যন্ত্রাংশ আমদানিতে আগে যেখানে ৩৯.৭৫ শতাংশ শুল্ক ছিল, তা কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করা হয়েছে।

থ্রি-হুইলার এবং ফোর-হুইলার স্থানীয়ভাবে সংযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে মাত্র ৩ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে এবং স্থানীয় ইভি ও ই-বাইক সংযোজনের ভ্যাট ছাড় ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। পরিবেশবান্ধব গাড়ি ক্রয়ের সুবিধার্থে ইভি এবং হাইব্রিড গাড়ির জন্য ব্যাংক অটো লোনের সর্বোচ্চ সীমা ৬০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ লাখ টাকা করা হয়েছে এবং একইসাথে ঋণ ও ইকুইটির অনুপাত ৬০:৪০ থেকে উন্নত করে ৮০:২০ করা হয়েছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে সেমিনারে বলা হয়, নরওয়েতে নতুন গাড়ির বিক্রির প্রায় ৯৭.৪ শতাংশ ইভি এবং দেশটির মোট যানবাহনের ৩৩ শতাংশ ইভিতে রূপান্তরিত হয়েছে। চীনে নতুন গাড়ি বিক্রির ৫৪ শতাংশ ইভি।

তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ভারতের মডেলটি শিক্ষণীয় হতে পারে, যারা মূলত FAME এবং PM E-DRIVE প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমে ২-হুইলার ও ৩-হুইলারের বৈদ্যুতিকীকরণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর গ্রিড থেকে ইভি চার্জ করা হলে তা কার্বন নিঃসরণ পুরোপুরি কমায় না, বরং তা গাড়ি থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে স্থানান্তরিত করে মাত্র। তাই ইভি খাতের প্রকৃত সুফল পেতে হলে ঢাকাকে নবায়নযোগ্য ও ক্লিন এনার্জির উৎপাদন বাড়াতে হবে।

সেমিনারের উদ্বোধনী বক্তব্যে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিআইআই) এর সভাপতি তাসকিন আহমেদ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত ইভি রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানান।

ডিসিআইআইয়ের পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়, বড় বড় দামি গাড়ি আমদানির আগে দেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ২-হুইলার এবং ৩-হুইলারের স্থানীয় উৎপাদন ও বৈধ কাঠামো তৈরিতে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। পুরো দেশে একসাথে শুরু না করে পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রথমে ঢাকা ও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে চার্জিং নেটওয়ার্ক ও রুট পরিকল্পনা করা যেতে পারে। মেগাসিটিগুলোতে যানজট ও দূষণ কমাতে শুরুতে ৩০০ থেকে ৫০০টি সরকারি অর্থায়নে ইভি বাস নামানো প্রয়োজন।

এর পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ডের গাড়ির চার্জিং সুবিধার জন্য দেশে একক কারিগরি স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড বাধ্যতামূলক করা এবং দেশের নতুন বিল্ডিং কোড সংশোধন করে প্রতিটি করপোরেট অফিস, শপিং মল এবং বাণিজ্যিক ভবনের পার্কিং স্পেসে ইভি চার্জিং অবকাঠামো রাখা বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি।
 
বাংলাস্কুপ/ প্রতিবেদক/এনআইএন

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :