শ্রীপুরের অর্থনীতি পালাবদল: কাঠালে শত কোটির স্বপ্ন

আপলোড সময় : ২৪-০৬-২০২৬ ১২:০০:৩৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৪-০৬-২০২৬ ১২:০০:৩৮ অপরাহ্ন
ভোরের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই শুরু হয়ে যায় দিনের ব্যস্ততা। পাকা কাঁঠালের মিষ্টি সুবাসে চারপাশ ভরে ওঠে। কাঁচা-পাকা সড়ক ধরে কেউ মাথায়, কেউ ভ্যানে কিংবা ঠেলাগাড়িতে কাঁঠাল নিয়ে বাজারে যান বিক্রির জন্য। ক্রেতাদের ভিড়, দরদাম ও কাঁঠাল গাড়িতে তোলার হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে এলাকা। গাছ থেকে বাজার, বাজার থেকে দেশের নানা প্রান্ত- এই পুরো যাত্রাপথকে কেন্দ্র করে এখন কর্মচাঞ্চল হয়ে উঠেছে গাজীপুরের শ্রীপুর। 

শুধু বাজার নয়, ব্যস্ততা ছড়িয়ে পড়েছে বাগানেও। ভোরবেলা কাঁঠাল বাগানে গেলে দেখা যায়, পাইকারদের সরব উপস্থিতি। কেউ গাছের কাঁঠাল গুনছেন, কেউ ফলের আকার-আকৃতি দেখে দাম নির্ধারণ করছেন। দরদাম চূড়ান্ত হওয়ার পর গাছের নিচেই সম্পন্ন হচ্ছে বিক্রয় কার্যক্রম। ফলে অনেক কৃষকের পুরো মৌসুমের ফলন বাজারে নেওয়ার প্রয়োজনই পড়ছে না; বাগান থেকেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে সব কাঁঠাল।

দেশের কাঁঠালের রাজধানী হিসেবে পরিচিত গাজীপুর। এই জেলায় কাঁঠাল উৎপাদনের শীর্ষে রয়েছে শ্রীপুর। এছাড়া, কালিয়াকৈর, কাপাসিয়া ও কালীগঞ্জেও ব্যাপকভাবে এই ফল চাষ হয়ে থাকে। 

স্বাদ, ঘ্রাণ ও দীর্ঘদিনের সুনামের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৫ সালে গাজীপুরের কাঁঠাল ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের মর্যাদা লাভ করে। কাঁঠালকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাণিজ্য, কৃষকের কর্মব্যস্ততা এবং স্থানীয় উদ্যোগের কারণে শ্রীপুর এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁঠাল উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

শ্রীপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলাটিতে বছরে গড়ে প্রায় ৭৮ হাজার টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। এখানে প্রধানত খাজা, গালা ও দুরসা জাতের কাঁঠালের চাষ বেশি হয়ে থাকে। চলতি মৌসুমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে খাজা জাতের কাঁঠাল ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

শ্রীপুরের জৈনা বাজার এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় কাঁঠালের হাট হিসেবে পরিচিত। ব্যস্ততা শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়; নগরহাওলা, চকপাড়া, টেপিরবাড়ি, বরমী, রাজাবাড়ি, ছাতির বাজার, কেওয়া ও চন্নাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন কাঁঠালকেন্দ্রিক বাণিজ্যের জমজমাট দৃশ্য চোখে পড়ে।

বাজারগুলো ঘুরে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশে সারি সারি করে রাখা হয়েছে কাঁঠালের স্তূপ। পাইকারেরা সেখান থেকে কাঁঠাল কিনে ভ্যান ও ট্রাকে করে পাঠাচ্ছেন বড় আড়ত এবং পাইকারি বাজারে। পরে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা সেসব কাঁঠাল সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন নিজ নিজ এলাকায়।

জৈনা বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী আবুল কালাম জানান, “বর্তমানে মাঝারি আকারের ১০০টি কাঁঠালের একটি লট ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের কাঁঠালের লটের দাম ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা এবং ছোট কাঁঠালের লট ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে।”

কাঁঠালের পাইকার মো. আলাল হোসেন বলেন, “আমি এপ্রিলে শতাধিক কাঁঠালগাছ কিনে রেখেছি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাঁঠাল সরবরাহ করছি। আমার মতে, দেশের সবচেয়ে মিষ্টি কাঁঠাল শ্রীপুরেই পাওয়া যায়।”

ঢাকা থেকে কাঁঠাল কিনতে আসা ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম বলেন, “শ্রীপুরের কাঁঠাল মিষ্টি ও সুগন্ধি হওয়ায় বাজারে খুব দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতারা নাম শুনেই কিনতে আগ্রহ দেখান।”

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ইতোমধ্যে বারি-১, বারি-২, বারি-৩, বারি-৪ ও বারি-৫ সহ কাঁঠালের কয়েকটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে, যা উচ্চ ফলনশীল এবং বাণিজ্যিক চাষের জন্য উপযোগী।

কাঁঠালের সম্ভাবনাকে আরো বিস্তৃত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা। তিনি বলেন, “কাঁঠাল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। কাঁঠালের আচার এবং ‘রেডি টু কুক’ পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ চলছে।”

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া জানান, বর্তমানে দেশের কাঁঠালের রাজধানী হিসেবে গাজীপুর পরিচিত। এখানে কাঁঠালকে ঘিরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বাজার গড়ে উঠেছে। কাঁঠাল ও এর প্রক্রিয়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে এই বাজার ২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা সম্ভব।

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন


 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :