ডিপ টিউবওয়েলে উঠছে চায়ের মতো গরম-লবণাক্ত পানি

আপলোড সময় : ০৮-০৬-২০২৬ ০৩:৩৩:১৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৮-০৬-২০২৬ ০৩:৩৩:১৯ অপরাহ্ন
দীর্ঘদিন ধরেই সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ। ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক, আয়রন ও অতিরিক্ত খনিজ উপাদানের কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিরাপদ পানির অভাব নতুন নয়। শহরের দুইটি টিউবওয়েলে পানির জন্য সিরিয়াল থাকে সারাদিনই।

এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ ও আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কয়েক বছর আগে পৌর এলাকায় স্থাপন করা হয়েছিল গভীর অনুসন্ধানমূলক ডিপ টিউবওয়েল। কিন্তু সেই টিউবওয়েল নিয়েই এবার দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ।

সম্প্রতি কয়েকটি ডিপ টিউবওয়েল থেকে অস্বাভাবিকভাবে গরম ও লবণাক্ত পানি উঠছে। একই সঙ্গে পানির কলের আশপাশে দিয়াশলাই জ্বালালে আগুনের শিখা দেখা যাওয়ার দাবিও করছেন স্থানীয়রা। এমন অস্বাভাবিক ঘটনায় এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে উদ্বেগ, আতঙ্ক ও নানা প্রশ্ন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে জাপান সরকারের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার অর্থায়নে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভায় সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় তিনটি গভীর অনুসন্ধানমূলক ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল পৌর এলাকার বাসিন্দাদের জন্য আর্সেনিকমুক্ত ও নিরাপদ সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে যেসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ পানির সংকট রয়েছে, সেখানে বিকল্প উৎস তৈরির লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের কয়েক বছরের মাথায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে এর কার্যকারিতা নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, টিউবওয়েলের পানি এখন শুধু ব্যবহার অনুপযোগীই নয়, বরং তা স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে দূরের এলাকা থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করছেন। এতে যেমন ভোগান্তি বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে বাড়তি খরচও।

স্থানীয় কয়েকজন নারী জানান, রান্নার সময় এই পানি ব্যবহার করলে খাবারের স্বাদ পরিবর্তন হয়ে যায়। কাপড় ধোয়ার ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা হচ্ছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, বাসনপত্রে সাদা দাগ পড়ে যাচ্ছে এবং পানি কিছুক্ষণ রেখে দিলে ভিন্ন ধরনের গন্ধও পাওয়া যায়।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ পানিতে ক্লোরাইডের স্বাভাবিক মাত্রা প্রতি লিটারে ১৫০ থেকে ৬০০ মিলিগ্রাম থাকার কথা। কিন্তু আলোচিত পানির নমুনা পরীক্ষায় ক্লোরাইডের মাত্রা প্রায় ১ হাজার ২৮০ মিলিগ্রাম পাওয়া গেছে, যা স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ক্লোরাইড পানির স্বাদ পরিবর্তনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার অধিরনেংড়া মোড়ের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই সুপেয় পানির সংকটে ভুগছেন। নিরাপদ পানির আশায় পৌরসভার ডিপ টিউবওয়েলের ওপর নির্ভরশীল হলেও সম্প্রতি সেই পানিই নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ তার।

তিনি জানান, আগে এই টিউবওয়েলের পানি স্বাভাবিক থাকলেও এখন অস্বাভাবিকভাবে গরম ও লবণাক্ত পানি উঠছে, যা ব্যবহার করতেই ভয় পাচ্ছেন এলাকাবাসী।

রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, ‘ডিপ টিউবওয়েল থেকে ওঠা পানির তাপমাত্রা এতটাই বেশি যে সেটি অনেকটা ফুটন্ত পানির মতো মনে হয়। তার দাবি, পৌরসভার ডিপ টিউবওয়েল থেকে এত গরম পানি উঠছে যে, ওই পানি দিয়ে অনায়াসেই চা তৈরি করা যাবে। ফলে এই পানি খাওয়াতো দূরের কথা, ব্যবহার করতেও ভয় লাগছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পানি ব্যবহারের পর অনেকের শরীরে চুলকানি দেখা দিচ্ছে। শিশু ও বয়স্করা পেটের সমস্যায় ভুগছেন। আগে কখনো এমন পরিস্থিতি দেখিনি। এখন বাধ্য হয়ে দূর থেকে পানি এনে ব্যবহার করতে হচ্ছে, এতে বাড়তি ভোগান্তির পাশাপাশি খরচও বেড়ে গেছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা আতিকুর রহমান বলেন, ‘প্রথমে আমরা বুঝতেই পারিনি কী হচ্ছে। পানি খেতে গিয়ে দেখি স্বাদ একেবারে লবণাক্ত। পরে গোসল ও রান্নার কাজে ব্যবহার করতে গিয়েও সমস্যা দেখা দেয়। এখন পানি এতটাই গরম উঠছে যে হাত দেওয়া কষ্টকর হয়ে যায়। অনেক সময় মনে হয় যেন গরম পানির লাইনের পানি উঠছে।’

তিনি আরও বলেন,‘সবচেয়ে ভয় লাগে যখন দেখি পানির কলের আশপাশে দিয়াশলাই ধরালে আগুনের মতো শিখা দেখা যায়। এমন ঘটনা আগে কখনো দেখিনি। ছোট ছোট বাচ্চা আছে, তাই আতঙ্কে আছি। আমরা জানি না পানির নিচে কী সমস্যা হয়েছে। দ্রুত পরীক্ষা করে প্রকৃত কারণ বের করা দরকার।’

স্থানীয় বাসিন্দা তারেক রহমান বলেন, ‘শুরুতে মনে হয়েছিল সাময়িক সমস্যা। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, পানির অবস্থা তত খারাপ হচ্ছে। অনেক সময় এত গরম পানি ওঠে যে ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে পড়ে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

এলাকাবাসীর অনেকে বলছেন, আগুন ধরালে শিখাও দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা আতঙ্কে আছি। দ্রুত পরীক্ষা করে কী কারণে এমন হচ্ছে, তা জানানো দরকার।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জেলায় নিরাপদ পানির সংকট দীর্ঘদিনের। শুধু ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য একটি আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন প্রয়োজন। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।’

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের চাঁপাইনবাবগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমার সরকার বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসনও ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে জানিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন। তিনি বলেন, ‘স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সমস্যার উৎস শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :