ইতিহাস-ঐতিহ্যের উজ্জ্বল নিদর্শন নওগাঁর কুসুম্বা মসজিদ

মসজিদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ দর্শনার্থীরা

আপলোড সময় : ০১-০৬-২০২৬ ১২:০৪:২৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০১-০৬-২০২৬ ১২:০৪:২৯ অপরাহ্ন
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী কৃষিনির্ভর বরেন্দ্র জেলা নওগাঁ। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ আর প্রাচীন ইতিহাসের নিদর্শনে সমৃদ্ধ এই জেলাতেই দাঁড়িয়ে আছে প্রায় পাঁচ শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী কুসুম্বা মসজিদ। অনন্য স্থাপত্যশৈলী ও নন্দনতাত্ত্বিক সৌন্দর্যের জন্য দেশের পাঁচ টাকার নোটে স্থান পাওয়া এই মসজিদ শুধু নওগাঁ নয়, বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লির পদচারণায় মুখর থাকে প্রাচীন এই মসজিদের প্রাঙ্গণ।
 
বাংলাদেশে সুলতানি আমলের যে কটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার মধ্যে নওগাঁর কুসুম্বা মসজিদ অন্যতম। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এর স্থাপত্যশৈলী, নকশা ও সৌন্দর্য আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

নওগাঁ জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে মান্দা উপজেলার কুসুম্বা ইউনিয়নের কুসুম্বা গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদ। রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের মান্দা ব্রিজের পশ্চিম দিকে প্রায় ৪০০ মিটার উত্তরে দাঁড়িয়ে থাকা কুসুম্বা মসজিদ যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। বরেন্দ্রভূমির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝখানে অবস্থিত এই স্থাপনাটি দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসেন শত শত দর্শনার্থী।

মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত প্রায় ১০০ বিঘা আয়তনের একটি বিশাল দিঘী রয়েছে। প্রায় ১২০০ ফুট লম্বা ও ৯০০ ফুট চওড়া এই দিঘীটি একসময় স্থানীয় গ্রামবাসী ও মুসল্লিদের পানির চাহিদা পূরণের জন্য খনন করা হয়েছিল। গোসল, অজু এবং খাবার পানির জন্য ব্যবহৃত এই দিঘী আজও মসজিদের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।
 
স্থাপত্যশৈলী: স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে কুসুম্বা মসজিদ অত্যন্ত অনন্য। মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৫৮ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৪২ ফুট চওড়া। চারপাশের দেয়াল প্রায় ৬ ফুট পুরু, যা নির্মাণকৌশলের দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের প্রমাণ দেয়। মসজিদের বাইরের অংশ পাথর দিয়ে আবৃত করা হয়েছে, যা এ অঞ্চলের স্থাপত্যে তুলনামূলক বিরল।

মসজিদের সম্মুখভাগে রয়েছে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার। এর মধ্যে দুটি বড় এবং একটি তুলনামূলক ছোট। প্রতিটি দরজা মেহরাব আকৃতির খিলানে নির্মিত, যা সুলতানি স্থাপত্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য বহন করে।

মসজিদের চার কোণায় রয়েছে চারটি মিনার বা বুরুজ। এগুলো আট কোনাকার এবং মসজিদের দেয়াল পর্যন্ত উঁচু। ছাদের ওপর রয়েছে ছয়টি গম্বুজ, যা দুটি সারিতে সাজানো। দ্বিতীয় সারির গম্বুজগুলো আকারে তুলনামূলক ছোট।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মসজিদের তিনটি গম্বুজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটি সংস্কার করে আগের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনে।

অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য: মসজিদের ভেতরে রয়েছে দুটি বিশাল পিলার বা স্তম্ভ, যা পুরো ছাদের ভার বহন করে। পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি মেহরাব, যেখানে ঝুলন্ত শিকল, ফুল ও লতাপাতার সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখা যায়। এই কারুকাজগুলো অত্যন্ত উন্নতমানের এবং সুলতানি শিল্পকলার নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।

দক্ষিণ দিকের দুটি মেহরাব তুলনামূলক বড়, আর উত্তর দিকের মেহরাবটি কিছুটা ছোট। মসজিদের ভেতরের দেয়ালগুলো পাথরে আবৃত, যা স্থাপত্যে এক ধরনের গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্য এনে দিয়েছে।

মসজিদের ভেতরে একসময় একটি দোতলা ঘর ছিল, যাকে বলা হতো জেনানা গ্যালারি বা মহিলাদের নামাজের ঘর। উত্তর দিকের মেহরাবের সামনে পাথরের পিলারের ওপর এই ঘরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখানে মহিলারা নামাজ আদায় করতেন।

মসজিদের সম্মুখভাগে রয়েছে খোলা প্রাঙ্গণ ও পাথর বসানো সিঁড়ি, যা সরাসরি দিঘীর দিকে নেমে গেছে। মসজিদের প্রবেশপথের কাছে একটি বাক্স আকৃতির কালো পাথর রয়েছে, যা অনেকের মতে একটি কবর হতে পারে।

ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে মতভেদ: কুসুম্বা মসজিদের প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। মসজিদে পাওয়া দুটি শিলালিপির তারিখ থেকে এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

প্রধান প্রবেশপথের শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৫৫৮ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। তখন শেরশাহের বংশধর আফগান সুলতান প্রথম গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহের শাসনামল (১৫৫৪-১৫৬০) চলছিল। সেই হিসেবে মসজিদটির বর্তমান বয়স প্রায় ৪৬৮ বছর।

তবে আরেকটি শিলালিপি অনুযায়ী, সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে তাঁর এক মন্ত্রী বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সে হিসেবে মসজিদটির বয়স প্রায় ৫২৮ বছর।

নামকরণের জনশ্রুতি: কুসুম্বা গ্রামের নামকরণ নিয়েও রয়েছে নানা জনশ্রুতি। স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত একটি গল্প হলো-গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের বেগম কুসুম বিবি কিছুদিন এই অঞ্চলে বসবাস করেছিলেন। তাঁর নামানুসারেই গ্রামটির নাম হয় কুসুম্বা। পরে সেই নাম থেকেই মসজিদের নামকরণ করা হয়। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এই গল্পের তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

দর্শনার্থীদের অনুভূতি: মসজিদটি দেখতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। নওগাঁ শহরের পিএম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারিহা হোসেন কৃপা বলেন, ‘পাঁচ টাকার নোটে এই মসজিদের ছবি দেখে অনেক দিন ধরে এখানে আসার ইচ্ছা ছিল। চারপাশের পরিবেশ খুব সুন্দর। এখানে এসে খুব ভালো লাগছে। যদি এখানে একটি রেস্ট হাউস তৈরি করা হয়, তাহলে দূর থেকে আসা দর্শনার্থীদের জন্য আরও সুবিধা হবে।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী ইরিন জামান কথা বলেন, ‘এত সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ আগে কখনও দেখিনি। আগে ছবিতে দেখেছিলাম, কিন্তু সামনে থেকে দেখলে এর সৌন্দর্য আরও বেশি অনুভব করা যায়। সামনে বিশাল দিঘী আর চারপাশের পরিবেশ খুবই মনোমুগ্ধকর।’

মুসল্লিদের উপস্থিতি: স্থানীয়রা জানান, কুসুম্বা মসজিদে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। বিশেষ করে শুক্রবার জুমার নামাজে মুসল্লিদের উপস্থিতি অনেক বেশি হয়।

মসজিদের খতিব মাওলানা মোস্তফা আল-আমিন বলেন, ‘প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। অনেকেই নামাজ আদায় করেন। মসজিদের ভেতরে ৮০ জনের ৮টি কাতারে প্রায় ৬৪০জন মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। এছাড়া সামনের খোলা প্রাঙ্গণে ১৯টি কাতারে প্রায় ২০০০ মুসল্লি জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুক্রবার ও দুই ঈদের জামাতে পুরো মসজিদ প্রাঙ্গণ মুসল্লিতে ভরে যায়। পবিত্র রমজান মাসে এখানে তারাবির নামাজও অনুষ্ঠিত হয়।’

পর্যটন সম্ভাবনা: নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাচীন এই মসজিদটি দেখতে প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। ইতোমধ্যে এখানে রেস্ট হাউস নির্মাণ করা হয়েছে। পর্যটনের সম্ভাবনা আরও বাড়াতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, কুসুম্বা মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সঠিক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা হলে এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :