রহস্যময় বিচিত্র বৃক্ষে ভরা বিরলের শালবন

আপলোড সময় : ২৪-০৫-২০২৬ ০৩:০৫:০২ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৪-০৫-২০২৬ ০৩:০৫:০২ অপরাহ্ন
দিনাজপুরের বিরল উপজেলার কালিয়াগঞ্জ সীমান্ত। উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক শালবনটি এখানে অবস্থিত। জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরত্বের কালিয়াগঞ্জ বাজার থেকে বাঁ দিকের রাস্তা ধরে একটু এগোতেই বিশাল অরণ্য।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বনটি মানুষের তৈরি নয়। প্রাকৃতিক নিয়মে শালবীজ পড়ে তৈরি হয়েছে। তাই এর নাম প্রাকৃতিক বা ন্যাচারাল শালবন। পুরো বনটি প্রায় ২ হাজার ৮৬৭ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। বনের ভেতরে শুধু শালগাছই নয়, আছে আমলকী, সর্পগন্ধা, বহেড়া, হরীতকী ও চিরতাসহ নানা ধরনের ঔষধি গাছ। গহিন বনের মাঝে রয়েছে বেশ কিছু বিচিত্র গড়নের গাছ।

এই বনের গভীরে বাস করে মুণ্ডা, ওরাওঁ ও সাঁওতাল আদিবাসীরা। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বনে শুরু হয় ডাকঢোলের বাদ্যি। আদিবাসী পাড়াগুলোতে চলে নানা ধর্মীয় ও সামাজিক আচার। বনের ভেতরটা পাখিদের কলকাকলিতে মুখর। কোকিল, টিয়া, ঘুঘু আর ময়নাসহ হরেক প্রজাতির পাখি এখানে মহানন্দে ডানা মেলে বেড়ায়। তাদের কিচিরমিচির শব্দে চারপাশ সব সময় সজীব থাকে।

বনের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটি গাছ দেখে থমকে দাঁড়ালাম। গাছটির কোনও শেকড় খুঁজে পাওয়া যায় না। দেখতে অনেকটা অজগর সাপের মতো। অদ্ভুত এই গাছটি বেশ কয়েকটি শালগাছকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে।

গাছটির নাম জানতে চাইলে স্থানীয় এক আদিবাসী জানালেন, একে তারা ‘বাদেনা’ বলে ডাকেন। কিন্তু কেন এর এমন নাম, তার উত্তর কারও জানা নেই। গহিন অরণ্যে এমন রহস্যময় আজব গাছ আরও অনেক আছে।

বনের ভেতরে আরও একটি চমৎকার দৃশ্য চোখে পড়ে। লাল মাটির উঁচু উঁচু ঢিবি। এগুলোকে স্থানীয়রা বলেন ‘উলুর ডিবি’। আসলে এগুলো উইপোকার তৈরি ঢিবি। উইপোকারা মনের আনন্দে বনের আনাচে-কানাচে এমন অসংখ্য ঢিবি তৈরি করে রেখেছে।

শালবনের ভেতরে ছোট একটি রেস্ট হাউস আছে। সেটি পেছনে ফেলে পাশের আরেকটি বনে প্রবেশ করলাম। স্থানীয়রা একে বলে ‘মিরা বন’। বনের মাঝ দিয়ে খালের মতো একটি সরু নদী চলে গেছে ভারতের ভেতর। স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠরা জানালেন, এক সময় এই বনে বাঘসহ হিংস্র সব জানোয়ারের দেখা মিলতো। এখন আর বাঘ নেই, তবে শেয়াল, খরগোশ আর বনমোরগের দেখা পাওয়া যায়।

বনের জমিনে বিছিয়ে থাকা শুকনো পাতা কুড়াচ্ছিলেন কয়েকজন আদিবাসী নারী। তাদেরই একজন ওরাওঁ গোত্রের মলানী টিগ্গা। তার কাছে জানা গেলো শালপাতার বিচিত্র ব্যবহারের কথা। আদিবাসীরা এই পাতা দিয়ে ‘হাড়িয়া’ খাওয়ার চোঙ তৈরি করে। তাদের অতিপ্রিয় পাতার বিড়ি তৈরিতেও এই পাতা লাগে। এ ছাড়া বিভিন্ন উৎসবে খিচুড়ি খাওয়ার ঠোঙা তৈরিতেও শালপাতা অপরিহার্য।

মিরা বন পেরিয়ে আমি চলে আসি ‘ভটিয়া বনে’। এ বনের একটি বিশেষ গাছকে কেন্দ্র করে আদিবাসীদের অনেক ভক্তি। গাছটির নাম ‘খিল কদম’। কারমা উৎসবের সময় এ গাছের ডাল কেটে নিয়ে তারা পূজা করে। সবার কাছে গাছটি অত্যন্ত পবিত্র। আমি বেশ মনোযোগ দিয়ে অচেনা গাছটিকে দেখলাম।

কালিয়াগঞ্জের এ বিশাল প্রাকৃতিক শালবন, তার রহস্যময় আজব গাছ, শুকনো পাতার মিছিল আর উইপোকার ঢিবি যেকোনও ভ্রমণপ্রেমী মানুষকে মুগ্ধ করবে। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, এখানে পর্যটকদের আনাগোনা খুব কম।

বন বিভাগের মাঠ পর্যায়ের এক কর্মকর্তার মতে, এই শালবনটির তেমন কোনও প্রচার নেই। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় অনেক সময় নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া যাতায়াত ব্যবস্থাও খুব একটা উন্নত নয়। তাই এটি পর্যটকদের কাছে এখনও পরিচিত হয়ে ওঠেনি।

তবে বনের ভেতরে থাকার জন্য আধুনিক কটেজ এবং ভালো খাবারের ব্যবস্থা করা গেলে এ বনটি দেশের পর্যটন শিল্পে বড় অবদান রাখতে পারবে।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
   

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :