সারথী থিয়েটারের ৩২ বছরে পদার্পণ

গাইবান্ধায় তিনদিনের লোকজ শিল্পোৎসবে মিলনমেলা

আপলোড সময় : ০৩-০৪-২০২৬ ১২:৪১:০৫ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৩-০৪-২০২৬ ১২:৪১:০৫ অপরাহ্ন
কালের প্রবহমান ধারায় লোকজ শিল্প ও সংস্কৃতির তরণী বেয়ে এগিয়ে চলেছে গাইবান্ধার ঐতিহ্যবাহী নাট্যসংগঠন সারথী থিয়েটার। দীর্ঘ পথচলার সাক্ষী হয়ে চলতি বসন্তে সংগঠনটি পদার্পণ করেছে ৩২ বছরে। এই মাহেন্দ্রক্ষণকে স্মরণীয় করে রাখতে আয়োজন করা হয়েছে তিনদিনব্যাপী “মিলন কান্তি দে পালানাট্য উৎসব”- যেখানে গ্রামীণ সংস্কৃতির বহুমাত্রিক রূপ পেয়েছে এক অনন্য মেলবন্ধন।

বৃহস্পতিবার (০২ এপ্রিল) গাইবান্ধার দারিয়াপুর হাটখোলায় উৎসবের শুভ সূচনা হয়। আগামী শনিবার (৪ এপ্রিল) পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজন ঘিরে স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। উৎসবের উদ্বোধনী পর্ব ছিল অনন্য তাৎপর্যে ভরপুর। স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত আবৃত্তিশিল্পী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক আশরাফুল আলম ৩২টি প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। প্রদীপের আলো যেন প্রতীক হয়ে ওঠে সারথী থিয়েটারের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার।

তিনদিনের এ উৎসবে প্রতিদিনই রয়েছে লোকজ ঐতিহ্যের নানা পরিবেশনা- পালানাট্য, গম্ভীরা, নৃত্য, পুঁথিপাঠ, মুকাভিনয়, বিয়ের গীত এবং বাউল গান। পাশাপাশি শিল্পের বিভিন্ন শাখায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে গুণীজন সংবর্ধনার আয়োজনও রাখা হয়েছে। উৎসবের তাৎপর্য নিয়ে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী গাইবান্ধার সভাপতি, লেখক-গবেষক অধ্যাপক জহুরুল কাইয়ুম বলেন, “গ্রামীণ সংস্কৃতির ভাণ্ডার আমাদের শিকড়কে শক্ত করে। সারথী থিয়েটারের এই উদ্যোগ শুধু একটি আয়োজন নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামকে আরও বেগবান করবে।”

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী এম. আবদুস সালাম বলেন, “এ ধরনের উৎসব স্থানীয় শিল্পী ও সংস্কৃতিকে বিকাশের সুযোগ করে দেয়। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।” আয়োজক সংগঠনের সভাপতি, নাট্যকার ও নির্দেশক জুলফিকার চঞ্চল বলেন, “৩২ বছরের এই যাত্রা সহজ ছিল না। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা লোকজ নাট্যধারাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি। এই উৎসবের মাধ্যমে আমরা চাই নতুন প্রজন্ম গ্রামীণ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত হোক এবং এই ধারাটি আরও বিস্তৃত হোক।”

উৎসবের উদ্বোধনী মঞ্চে ঢাকার বঙ্গলোক পরিবেশন করেছে সায়িক সিদ্দিকীর রচনা ও নির্দেশনায় ‘রূপচান সুন্দরীর পালা’। উৎসবের আয়োজক দারিয়াপুর সারথী থিয়েটার মঞ্চস্থ করছে জুলফিকার চঞ্চলের নির্দেশনায় ‘খৈলান পালা’। অন্যদিকে ময়মনসিংহ গীতিকার কাহিনি অবলম্বনে ড. রুবাইয়াত আহমেদের পালানাট্যরূপ এবং শহীদুর রহমানের নির্দেশনায় ‘কাজল রেখা’ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে বগুড়া থিয়েটার। রাজশাহীর চারঘাটের পদ্মা বড়াল থিয়েটার পরিবেশন করছে গম্ভীরা আর মূকাভিনয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করছেন শিল্পী নাদেজদা ফারজানা মৌসুমী। পুঁঁথিপাঠে অংশ নিচ্ছেন রাজবাড়ী থেকে আগত পুঁথিশিল্পী এ্যাথেন্স শাওন এবং গাইবান্ধার বন্ধন রেসিডেনশিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। লোকজ বিয়ের গীত পরিবেশন করছেন নেত্রকোনার জুয়েল রানা ও গাইবান্ধার নাট্যকর্মী রঞ্জু। এছাড়া বাংলাদেশ বাউল ও লোকশিল্পী সংস্থা, দারিয়াপুর অঞ্চল শাখার শিল্পীরা পরিবেশন করছেন বাউল গান, যা উৎসবে যোগ করছে ভিন্নমাত্রার আবহ।

উৎসবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত নাট্যব্যক্তিত্ব, গবেষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠকেরা অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান লেবু, নাট্যকার ও সংগঠক সালাম সাকলাইন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রহমান রাজু, প্রদীপ কুমার আগরওয়ালা, অতনু করঞ্জাই, ভাওয়াইয়া শিল্পী ভূপতি ভূষণ বর্মা, একরামুল হক লিকু, আসলাম আলী, নৃত্যশিল্পী এম. আর. ওয়াসেক এবং সমাজসেবক শামীম প্রামাণিক বাদলসহ অনেকে। সারথী থিয়েটারের এ আয়োজন শুধু একটি নাট্যোৎসব নয়- এটি গ্রামীণ সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের এক প্রাণবন্ত প্রয়াস। শহুরে ব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা লোকজ শিল্পকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তিনদিনের এই উৎসব যেন হয়ে উঠেছে শিল্পী, দর্শক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের এক মিলনমেলা- যেখানে অতীতের ঐতিহ্য আর বর্তমানের সৃজনশীলতা মিলেমিশে তৈরি করছে ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক ভিত্তি।

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :