পবিত্র রমজান মাস প্রায় শেষের দিকে। এরপর ঈদের ছুটিতে শুরু হবে ঘুরে বেড়ানো। অতীতের মতো এবারের ঈদের ছুটিতে বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সৈকত ভ্রমণে আসছেন অন্তত ১০ লাখ পর্যটক। তাদের বরণ করে নিতে প্রস্তুত শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউস ও সাত শতাধিক রেস্তোরাঁ। পর্যটকদের নিরাপত্তায় প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিতে কয়েক লাখ পর্যটকের আগমন ঘটবে কক্সবাজারে। এসব পর্যটক জেলার পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউজ এবং সাত শতাধিক রেঁস্তোরাসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিচরণ করবেন। ইতিমধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি হোটেল-মোটেলের কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে। ঈদের আগে এবং ছুটির দিনগুলোতে শতভাগ বুকিংয়ের আশা হোটেল মালিকদের। পর্যটকেরা সৈকত ভ্রমণের পাশাপাশি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক, টেকনাফ সমুদ্রসৈকত, ইনানী সৈকত, পাটোয়ারটেক, রামুর বৌদ্ধপল্লি, ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক, সাগরদ্বীপ মহেশখালী, সোনাদিয়া দ্বীপ ভ্রমণে যাবেন। ইতিমধ্যে বিনোদনকেন্দ্রগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নসহ নানাভাবে সজ্জিত করা হয়েছে। বর্তমানে সাগরের লোনাজল ও বিস্তৃত বালিয়াড়ির সৈকত যেমন ফাঁকা ঠিক তেমনি সব হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টেও নেই পর্যটক। রমজানের পুরো এক মাস পর্যটকশূন্য আছে প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে ঈদুল ফিতরে টানা সাত দিনের ছুটি রয়েছে। এই ছুটিতে আশার আলো দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
মঙ্গলবার সৈকতের সুগন্ধা, কলাতলী ও সিগাল পয়েন্টে দেখা গেছে, পুরো সৈকত ফাঁকা। কয়েক কিলোমিটার সৈকতে শতাধিক মানুষের বিচরণ। তারা স্থানীয়। তবে সৈকতে পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য দ্রুতগতির জলযান জেডস্কি, স্পিডবোট, সমুদ্রের পানিতে গোসলে নামার টিউব, বালুচরে বসে সমুদ্র দর্শনের চেয়ার ছাতা (কিটকট) বসানোর প্রস্তুতি চলছে। সৈকত এলাকায় বন্ধ দোকানপাটও খুলতে শুরু করেছে। হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউস মালিকরা বলছেন, বিগত বছরে ঈদের ছুটিতে কক্সবাজার সৈকত ভ্রমণে এসেছিলেন প্রায় সাত লক্ষাধিক পর্যটক। তখন হোটেল, গেস্টহাউস, রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা হয়েছিল প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। এবারের ঈদেও একই রকম পর্যটকের সমাগম হবে বলে আশা তাদের। আরও বাড়তেও পারে। কারণ এবার ছুটি বেশি। প্রতিদিন এক থেকে দেড় লাখ পর্যটকের আশা করছেন তারা। সবকিছু বিবেচনা করে ১০ লাখ পর্যটকের সমাগম আশা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে পাঁচ শতাধিক হোটেল, গেস্টহাউস, রিসোর্টে ৫০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে। সেক্ষেত্রে পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি হোটেলের কক্ষ ভাড়া এবং খাবারের অতিরিক্ত মূল্য আদায় বন্ধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তৎপর থাকতে হবে।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, টানা সাত দিন ছুটির প্রত্যেক দিনে লক্ষাধিক পর্যটকের সমাগমে মুখরিত থাকবে কক্সবাজার। তাই হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও রেঁস্তোরাগুলো সাজানো হয়েছে নতুন রূপে। পর্যটকদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে দোকানপাটগুলোতে তোলা হচ্ছে নতুন পণ্য। এরই মধ্যে আশানুরূপ সাড়া পেতে শুরু করেছে সাগরপাড়ের আবাসিক হোটেলগুলো। আগাম কক্ষ বুকিং দিয়েছেন পর্যটকরা। তাদের বরণে সার্বিক প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে যাতে হোটেল কক্ষের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং কক্ষ পেতে বিড়ম্বনায় পড়তে না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন তারা।
বিচ বাংলা ট্যুরিজমের ব্যবস্থাপক মো. আবদুল্লাহ বলেন, ‘চলতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পর্যটনে তেমন ব্যবসা হয়নি আমাদের। তাই এবারের ঈদে ইনানী বড়খাল বিচ কায়াকিংকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। পর্যটকদের দেওয়া হবে বাড়তি বিনোদন সেবা। সেভাবে প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।’ স্বপ্নতরীর মালিক ও সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন সোহেল বাহাদুর বলেন, ‘ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিতে কয়েক লাখ পর্যটক সমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেত টানা সাত দিনের ছুটি, সেহেতু নিঃসন্দেহে অতীতের যেকোনো ঈদের চেয়ে এবার বেশি পর্যটক কক্সবাজার বেড়াতে আসবেন। ইতিমধ্যে পর্যটকদের বরণে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি।’ কক্সবাজার বৃহত্তর বিচ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রহমান বলেন, ‘এবার ঈদুল ফিতরের সাত দিনের ছুটিতে দিনে অন্তত এক থেকে দেড় লাখ পর্যটকের সমাগম হবে। এতে পর্যটকনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যে চাঙাভাব দেখা দেবে। এজন্য পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা সব ধরনের প্রস্ততি নিয়েছেন। আশা করা যাচ্ছে এবারের ছুটিতে হোটেল-মোটেল ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা লাভের মুখ দেখবেন।’
ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে টানা ছয় দিন প্রতিদিন এক লাখের বেশি পর্যটকের সমাগম ঘটতে পারে বলে জানালেন কক্সবাজার কলাতলী মেরিন ড্রাইভ হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মৌখিম খান। তিনি বলেন, ‘ঈদে কক্সবাজার বেড়াতে আসা অতিথিদের স্বাগত জানাতে হোটেল-মোটেলে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এতে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সব ধরনের সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে হোটেল ও গেস্টহাউস, রিসোর্টের ৫০ শতাংশ কক্ষের আগাম বুকিং হয়ে গেছে। অবশিষ্ট কক্ষ এরই মধ্যে বুকড হয়ে যাবে। আশা করা যায়, ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন দেড় লাখ পর্যটক আসবেন। সে হিসাবে এবারের ঈদের ছুটিতে অন্তত ১০ লাখ পর্যটক সমাগম ঘটবে বলে প্রত্যাশা করছি।’
ফেডারেশন অব ট্যুরিজম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউসের দৈনিক পর্যটকের ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৬০ হাজার। এ সময় হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট নানা খাতে ব্যবসা হবে অন্তত ৪০০ কোটি টাকার। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শহর থেকে ৬৭ কিলোমিটার দূরে চকরিয়ার ডুলাহাজারায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের প্রতিও পর্যটকদের আগ্রহ রয়েছে। ২০০১ সালের ১৯ জানুয়ারি ২ হাজার ২৫০ একর বনাঞ্চলে গড়ে তোলা হয় দেশের প্রথম এই সাফারি পার্ক। বর্তমানে পার্কে জেব্রা, জলহস্তী, ময়ূর, অজগর, কুমির, হাতি, বাঘ, ভালুক, সিংহ, হরিণ, লামচিতা, শকুন, কচ্ছপ, রাজধনেশ, কাকধনেশ, ইগল, সাদা বক, রঙিলা বক, সারস, কাস্তেচরা, মথুরা, নিশিবক, কানিবক, বনগরুসহ ৫২ প্রজাতির ৩৪১টি প্রাণী আছে।
শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে দরিয়ানগর পর্যটনপল্লি। পল্লির অভ্যন্তরে আছে ৪০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক শাহেনশাহ গুহা। পাহাড়চূড়ার কবিটঙ, ঝুলন্ত সেতু পর্যটকের পছন্দ। সেখান থেকে আরও সাত কিলোমিটার গেলে দৃষ্টিনন্দন হিমছড়ি ঝরনাধারা। ঝরনার শীতল জলে শরীর ভিজিয়ে পাকা সিঁড়ি বেয়ে ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড়চূড়ায় ওঠার ব্যবস্থাও আছে। পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকালে মনে হবে বিশাল সাগর আপনার পায়ের নিচে। দরিয়ানগর ও হিমছড়ি সৈকতে রয়েছে আকাশে চক্কর মারার প্যারাসেইলিং। আকাশ থেকে নিচের পাহাড়সারি, সমুদ্র, বালুচরে লোকজনের দৌড়ঝাঁপ অপরূপ।বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে স্পিডবোটে মহেশখালীতে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ১৫ মিনিট। সেখানকার মৈনাক পাহাড়চূড়ার আদিনাথ মন্দির, নিচে রাখাইনপল্লি, বৌদ্ধবিহার নজর কাড়ে।
টেকনাফ মডেল থানা প্রাঙ্গণে শতবছরের ঐতিহাসিক মাথিন কূপ। মগ জমিদারকন্যা মাথিনের সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তা ও সাহিত্যিক ধীরাজ ভট্টাচার্যের প্রেমকাহিনি নিয়ে এই কূপ। প্রতিবছর অন্তত ১০ লাখ মানুষ এই কূপ পরিদর্শন করেন। এখান থেকে দুই কিলোমিটার পূর্ব দিকে গেলে নাফ নদী, তারপর মিয়ানমার সীমান্ত। নাফ নদীর পাড়ে নেটং (দেবতার পাহাড়) পাহাড়ে রয়েছে ঐতিহাসিক ব্রিটিশ বাংকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ সেনারা এই বাংকারে বসে মিয়ানমারে থাকা জাপান সেনাদের নজরদারি করত এবং কামানের গোলা ছুড়তো। নাফ নদীর মধ্যভাগে দৃষ্টিনন্দন জালিয়ার দ্বীপ, উল্টো দিকের পাহাড়ে এলিফ্যান্ট পয়েন্ট, বৌদ্ধমন্দির, পানের বরজ, নেচার পার্ক, হাতিখেদা, কুদুমগুহা মুহূর্তে মনকে পুলকিত করে তোলে।
পর্যটকের সার্বিক নিরাপত্তায় প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, এমনটি জানিয়েছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পারভেজ আহমদ। তিনি বলেন, ‘ঈদের টানা ছুটিতে কক্সবাজারে প্রতিদিন দেড় লাখের বেশি পর্যটক সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে এবারের টানা ছুটিতে অন্তত ১০ লাখ পর্যটক সমাগম ঘটতে পারে। তাই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে পেট্রল টিমের পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্ট বসানো হয়েছে সিসি ক্যামরা। সমুদ্রসৈকত ছাড়াও পর্যটনকেন্দ্রের বিভিন্ন এলাকায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত আছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিতে কয়েক লাখ পর্যটকের আগমন ঘটবে কক্সবাজারে। এসব পর্যটক জেলার পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউজ এবং সাত শতাধিক রেঁস্তোরাসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিচরণ করবেন। ইতিমধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি হোটেল-মোটেলের কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে। ঈদের আগে এবং ছুটির দিনগুলোতে শতভাগ বুকিংয়ের আশা হোটেল মালিকদের। পর্যটকেরা সৈকত ভ্রমণের পাশাপাশি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক, টেকনাফ সমুদ্রসৈকত, ইনানী সৈকত, পাটোয়ারটেক, রামুর বৌদ্ধপল্লি, ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক, সাগরদ্বীপ মহেশখালী, সোনাদিয়া দ্বীপ ভ্রমণে যাবেন। ইতিমধ্যে বিনোদনকেন্দ্রগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নসহ নানাভাবে সজ্জিত করা হয়েছে। বর্তমানে সাগরের লোনাজল ও বিস্তৃত বালিয়াড়ির সৈকত যেমন ফাঁকা ঠিক তেমনি সব হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টেও নেই পর্যটক। রমজানের পুরো এক মাস পর্যটকশূন্য আছে প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে ঈদুল ফিতরে টানা সাত দিনের ছুটি রয়েছে। এই ছুটিতে আশার আলো দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
মঙ্গলবার সৈকতের সুগন্ধা, কলাতলী ও সিগাল পয়েন্টে দেখা গেছে, পুরো সৈকত ফাঁকা। কয়েক কিলোমিটার সৈকতে শতাধিক মানুষের বিচরণ। তারা স্থানীয়। তবে সৈকতে পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য দ্রুতগতির জলযান জেডস্কি, স্পিডবোট, সমুদ্রের পানিতে গোসলে নামার টিউব, বালুচরে বসে সমুদ্র দর্শনের চেয়ার ছাতা (কিটকট) বসানোর প্রস্তুতি চলছে। সৈকত এলাকায় বন্ধ দোকানপাটও খুলতে শুরু করেছে। হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউস মালিকরা বলছেন, বিগত বছরে ঈদের ছুটিতে কক্সবাজার সৈকত ভ্রমণে এসেছিলেন প্রায় সাত লক্ষাধিক পর্যটক। তখন হোটেল, গেস্টহাউস, রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা হয়েছিল প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। এবারের ঈদেও একই রকম পর্যটকের সমাগম হবে বলে আশা তাদের। আরও বাড়তেও পারে। কারণ এবার ছুটি বেশি। প্রতিদিন এক থেকে দেড় লাখ পর্যটকের আশা করছেন তারা। সবকিছু বিবেচনা করে ১০ লাখ পর্যটকের সমাগম আশা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে পাঁচ শতাধিক হোটেল, গেস্টহাউস, রিসোর্টে ৫০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে। সেক্ষেত্রে পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি হোটেলের কক্ষ ভাড়া এবং খাবারের অতিরিক্ত মূল্য আদায় বন্ধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তৎপর থাকতে হবে।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, টানা সাত দিন ছুটির প্রত্যেক দিনে লক্ষাধিক পর্যটকের সমাগমে মুখরিত থাকবে কক্সবাজার। তাই হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও রেঁস্তোরাগুলো সাজানো হয়েছে নতুন রূপে। পর্যটকদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে দোকানপাটগুলোতে তোলা হচ্ছে নতুন পণ্য। এরই মধ্যে আশানুরূপ সাড়া পেতে শুরু করেছে সাগরপাড়ের আবাসিক হোটেলগুলো। আগাম কক্ষ বুকিং দিয়েছেন পর্যটকরা। তাদের বরণে সার্বিক প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে যাতে হোটেল কক্ষের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং কক্ষ পেতে বিড়ম্বনায় পড়তে না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন তারা।
বিচ বাংলা ট্যুরিজমের ব্যবস্থাপক মো. আবদুল্লাহ বলেন, ‘চলতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পর্যটনে তেমন ব্যবসা হয়নি আমাদের। তাই এবারের ঈদে ইনানী বড়খাল বিচ কায়াকিংকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। পর্যটকদের দেওয়া হবে বাড়তি বিনোদন সেবা। সেভাবে প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।’ স্বপ্নতরীর মালিক ও সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন সোহেল বাহাদুর বলেন, ‘ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিতে কয়েক লাখ পর্যটক সমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেত টানা সাত দিনের ছুটি, সেহেতু নিঃসন্দেহে অতীতের যেকোনো ঈদের চেয়ে এবার বেশি পর্যটক কক্সবাজার বেড়াতে আসবেন। ইতিমধ্যে পর্যটকদের বরণে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি।’ কক্সবাজার বৃহত্তর বিচ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রহমান বলেন, ‘এবার ঈদুল ফিতরের সাত দিনের ছুটিতে দিনে অন্তত এক থেকে দেড় লাখ পর্যটকের সমাগম হবে। এতে পর্যটকনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যে চাঙাভাব দেখা দেবে। এজন্য পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা সব ধরনের প্রস্ততি নিয়েছেন। আশা করা যাচ্ছে এবারের ছুটিতে হোটেল-মোটেল ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা লাভের মুখ দেখবেন।’
ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে টানা ছয় দিন প্রতিদিন এক লাখের বেশি পর্যটকের সমাগম ঘটতে পারে বলে জানালেন কক্সবাজার কলাতলী মেরিন ড্রাইভ হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মৌখিম খান। তিনি বলেন, ‘ঈদে কক্সবাজার বেড়াতে আসা অতিথিদের স্বাগত জানাতে হোটেল-মোটেলে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এতে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সব ধরনের সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে হোটেল ও গেস্টহাউস, রিসোর্টের ৫০ শতাংশ কক্ষের আগাম বুকিং হয়ে গেছে। অবশিষ্ট কক্ষ এরই মধ্যে বুকড হয়ে যাবে। আশা করা যায়, ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন দেড় লাখ পর্যটক আসবেন। সে হিসাবে এবারের ঈদের ছুটিতে অন্তত ১০ লাখ পর্যটক সমাগম ঘটবে বলে প্রত্যাশা করছি।’
ফেডারেশন অব ট্যুরিজম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউসের দৈনিক পর্যটকের ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৬০ হাজার। এ সময় হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট নানা খাতে ব্যবসা হবে অন্তত ৪০০ কোটি টাকার। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শহর থেকে ৬৭ কিলোমিটার দূরে চকরিয়ার ডুলাহাজারায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের প্রতিও পর্যটকদের আগ্রহ রয়েছে। ২০০১ সালের ১৯ জানুয়ারি ২ হাজার ২৫০ একর বনাঞ্চলে গড়ে তোলা হয় দেশের প্রথম এই সাফারি পার্ক। বর্তমানে পার্কে জেব্রা, জলহস্তী, ময়ূর, অজগর, কুমির, হাতি, বাঘ, ভালুক, সিংহ, হরিণ, লামচিতা, শকুন, কচ্ছপ, রাজধনেশ, কাকধনেশ, ইগল, সাদা বক, রঙিলা বক, সারস, কাস্তেচরা, মথুরা, নিশিবক, কানিবক, বনগরুসহ ৫২ প্রজাতির ৩৪১টি প্রাণী আছে।
শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে দরিয়ানগর পর্যটনপল্লি। পল্লির অভ্যন্তরে আছে ৪০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক শাহেনশাহ গুহা। পাহাড়চূড়ার কবিটঙ, ঝুলন্ত সেতু পর্যটকের পছন্দ। সেখান থেকে আরও সাত কিলোমিটার গেলে দৃষ্টিনন্দন হিমছড়ি ঝরনাধারা। ঝরনার শীতল জলে শরীর ভিজিয়ে পাকা সিঁড়ি বেয়ে ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড়চূড়ায় ওঠার ব্যবস্থাও আছে। পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকালে মনে হবে বিশাল সাগর আপনার পায়ের নিচে। দরিয়ানগর ও হিমছড়ি সৈকতে রয়েছে আকাশে চক্কর মারার প্যারাসেইলিং। আকাশ থেকে নিচের পাহাড়সারি, সমুদ্র, বালুচরে লোকজনের দৌড়ঝাঁপ অপরূপ।বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে স্পিডবোটে মহেশখালীতে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ১৫ মিনিট। সেখানকার মৈনাক পাহাড়চূড়ার আদিনাথ মন্দির, নিচে রাখাইনপল্লি, বৌদ্ধবিহার নজর কাড়ে।
টেকনাফ মডেল থানা প্রাঙ্গণে শতবছরের ঐতিহাসিক মাথিন কূপ। মগ জমিদারকন্যা মাথিনের সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তা ও সাহিত্যিক ধীরাজ ভট্টাচার্যের প্রেমকাহিনি নিয়ে এই কূপ। প্রতিবছর অন্তত ১০ লাখ মানুষ এই কূপ পরিদর্শন করেন। এখান থেকে দুই কিলোমিটার পূর্ব দিকে গেলে নাফ নদী, তারপর মিয়ানমার সীমান্ত। নাফ নদীর পাড়ে নেটং (দেবতার পাহাড়) পাহাড়ে রয়েছে ঐতিহাসিক ব্রিটিশ বাংকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ সেনারা এই বাংকারে বসে মিয়ানমারে থাকা জাপান সেনাদের নজরদারি করত এবং কামানের গোলা ছুড়তো। নাফ নদীর মধ্যভাগে দৃষ্টিনন্দন জালিয়ার দ্বীপ, উল্টো দিকের পাহাড়ে এলিফ্যান্ট পয়েন্ট, বৌদ্ধমন্দির, পানের বরজ, নেচার পার্ক, হাতিখেদা, কুদুমগুহা মুহূর্তে মনকে পুলকিত করে তোলে।
পর্যটকের সার্বিক নিরাপত্তায় প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, এমনটি জানিয়েছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পারভেজ আহমদ। তিনি বলেন, ‘ঈদের টানা ছুটিতে কক্সবাজারে প্রতিদিন দেড় লাখের বেশি পর্যটক সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে এবারের টানা ছুটিতে অন্তত ১০ লাখ পর্যটক সমাগম ঘটতে পারে। তাই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে পেট্রল টিমের পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্ট বসানো হয়েছে সিসি ক্যামরা। সমুদ্রসৈকত ছাড়াও পর্যটনকেন্দ্রের বিভিন্ন এলাকায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত আছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন