​উদ্বোধনের এক মাসেই বন্ধ

আবার চালু হচ্ছে পাইপলাইনে তেল সরবরাহ

আপলোড সময় : ২৪-১১-২০২৫ ০১:৩৯:২৩ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৪-১১-২০২৫ ০১:৪০:২৪ অপরাহ্ন
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সহজে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য তিন হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বানানো হয়েছে পাইপলাইন। গত ১৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধনও করা হয়। কিন্তু চালুর এক মাসের মধ্যে হিসাবে গড়মিল, তেল সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম আর প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে পাইপলাইনে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাধ্য হয়ে আবারও নৌপথে বেশি খরচে জ্বালানি পরিবহন করতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, চলতি নভেম্বর মাসেই চালু হতে পারে এই প্রকল্প।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য মূলত নৌপথ ব্যবহৃত হয়। এতে খরচ যেমন বাড়ে, অন্যদিকে সময়ও বেশি লাগে। এজন্য পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল পরিবহনের প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১৮ সালের অক্টোবরে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু কাজ শুরু হয় ২০২০ সালে। পরে প্রথম দফায় ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় দফায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। 

শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। পরে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্য বলছে, পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে সরবরাহ করা হবে ২৭ লাখ টন ডিজেল। এতে প্রায় ২৩৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। এই পাইপলাইনকে দুইটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। একটি অংশ চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা থেকে ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো পর্যন্ত। আরেকটি অংশ গোদনাইল থেকে ফতুল্লা পর্যন্ত। গত ২২ জুন পাইপলাইনে পরীক্ষামূলকভাবে তেল পরিবহন শুরু হয়৷ ১৬ আগস্ট এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়৷ এর পরেই বাধে বিপত্তি।

পাইপলাইনটি চালুর পর চট্টগ্রাম থেকে দুই কোটি ৫৩ লাখ আট হাজার ৬৩ লিটার ডিজেল কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় নিয়ে যায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি। তবে পথেই কমে যায় তিন লাখ ৭৫ হাজার ৩৬৮ লিটার তেল। যার হিসাব মেলেনি এখনও। এর মধ্যে দুই লাখ ৬২ হাজার ৮০৪ লিটার ডিজেল প্যাকিং হিসেবে পাইপলাইনে রয়ে গেছে বলে দায় স্বীকার করেছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ। অবশিষ্ট এক লাখ ১২ হাজার ৫৬৪ লিটার ডিজেলের হিসাব এখনও মেলাতে পারেনি যমুনা অয়েল। রহস্য উদঘাটনে গঠন করা হয়েছে চারটি পৃথক তদন্ত কমিটি। তবে বিপিসি কর্মকর্তারা বলছেন, তেল পরিবহনের পর তা চুরি হয়েছে কি না, সেটি দেখার জন্য পৃথক চারটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি সেগুলো খতিয়ে দেখছে। অন্যদিকে, প্রযুক্তিগত কিছু ত্রুটির কারণে মূলত তেল সরবরাহ বন্ধ ছিল। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ফের পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পরিবহন শুরু করতে পারবেন তারা।

ফতুল্লা ডিপোর ২২ ও ২৩ নম্বর ট্যাংকের রি-ক্যালিব্রেশন করার জন্য ২৮ সেপ্টেম্বর যমুনা অয়েলের ডিজিএম (ইঅ্যান্ডডি) মো. আলমগীর আলমকে প্রধান করে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এই কমিটির সদস্য বিপিসির অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের ম্যানেজার (অপারেশন্স) ইঞ্জিনিয়ার রনি আহমেদ বলেন, ‘আমাদের কমিটিতে ছয়জন ছিলেন। আমরা শুধু রি-ক্যালিব্রেশন করেছি। আমি যেহেতু ইঞ্জিনিয়ার তাই টেকনিক্যাল বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেছি মাত্র। তবে প্রথম ক্যালিব্রেশনের কিছু বিচ্যুতি আমরা পেয়েছি। প্রতিবেদনে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছি। এর চেয়ে বেশি বলা যাবে না। আমাদের রি-ক্যালিব্রেশনের অনেক তথ্য আমরা বিপিসির তদন্ত কমিটিকে দিয়েছি।’

তেল গায়েবের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে ৩০ সেপ্টেম্বর একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করে যমুনা অয়েল। কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার (এইচআর) মো. মাসুদুল হক স্বাক্ষরিত এক পত্রে প্রতিষ্ঠানটির ডিজিএম (ফাইন্যান্স) মোহাম্মদ জোবায়ের চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ২৫ দিন পর ওই কমিটি প্রতিবেদন দেয়। এ বিষয়ে জেনারেল ম্যানেজার (এইচআর) মো. মাসুদুল হক  বলেন, ‘আমি প্রতিবেদনটি পেয়েছি। সাত হাজার ৭৭১ লিটার ঘাটতি থাকার বিষয়টি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মূলত প্রথম ক্যালিব্রেশনে ভুল ছিল। ক্যালিব্রেটরদের পানিশমেন্ট হওয়া উচিত।’

গত ২ অক্টোবর বিপিসির মহাব্যবস্থাপককে (বণ্টন ও বিপণন) আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। এখনও প্রতিবেদন জমা দিতে পরেনি এই তদন্ত কমিটি। গত ৬ অক্টোবর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুল মান্নানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়। কমিটিতে বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের একজন অধ্যাপককেও রাখা হয়। ওই কমিটি এখনও প্রতিবেদন দেয়নি। কমিটির আহ্বায়ক মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমাদের কমিটিতে বুয়েটের একজন অধ্যাপক আছেন। তিনি এক্সপার্ট। পুরো বিষয়টি ও জ্বালানি তেল পরিমাণের খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ করেছেন। আমরা পুরো বিষয়টি বিশদ আলোচনা করেছি।’

বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের গড় চাহিদা বছরে ৬৫ লাখ টন। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরবরাহ করা হয়েছে ৬৭ লাখ টন। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশই ডিজেল। ঢাকা বিভাগেই জ্বালানি তেলের ব্যবহার মোট চাহিদার ৪০ শতাংশ। এখন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় তেল পরিবহনের জন্য প্রথমে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে নদীপথে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা ডিপোতে নেওয়া হয়। এরপর ডিপো থেকে সড়কপথে ঢাকায় তেল পরিবহন করা হয়। প্রতি মাসে পরিবহনে ব্যবহৃত হয় ছোট-বড় প্রায় ১৫০টি জাহাজ। এতে পরিবহন খরচ বাড়ছে। খরচ আর ভোগান্তি কমাতেই প্রয়োজন পড়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইন তৈরির।

প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, প্রতিবছর পাইপলাইন প্রকল্প থেকে ৩২৬ কোটি টাকা আয় হবে। পরিচালন, রক্ষণাবেক্ষণ, ফুয়েল, বিদ্যুৎ বিল, জমির ভাড়াসহ আরও কিছু খাতে ব্যয় হবে ৯০ কোটি টাকা। এতে প্রতিবছর সাশ্রয় হবে ২৩৬ কোটি টাকা। আগামী ১৬ বছরের মধ্যে প্রকল্পের বিনিয়োগ উঠে আসবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স ও পরিকল্পনা) ও সরকারের যুগ্ম সচিব ড. এ কে এম আজাদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বড় পাইপলাইন টিউনিং করতে হয়। স্ক্যাডা সিস্টেম (পাইপলাইন, বিদ্যুৎ, পানি বা জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়) এবং ফ্লোমিটার (এগুলোর সঙ্গে অনেকগুলো প্যারামিটার যেমন টেম্পারেচার, প্রেশার, ডেনসিটি যুক্ত থাকে) আছে। ফলে পরিমাণের দিক থেকে কিছুটা তারতম্য হচ্ছে। অর্থাৎ রিডিংয়ের দিক থেকে। তেল হারিয়ে যাওয়ার কিছু নেই, যদি না চুরি করে৷ কার্যক্রম চলছে। হয়তো নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে পাইপলাইন চালু হয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘স্ক্যাডার সিস্টেম যারা দেখেন, ইঞ্জিনিয়াররা আমাদের থেকে সময় নিয়েছেন। তারা বলছেন, একপাশে ঠিক হয়ে গেছে পতেঙ্গা সাইডে। আরেকপাশে শিগগির ঠিক হবে।’

তেলের ঘাটতি কেন হলো এমন প্রশ্নের জবাবে বিপিসির পরিচালক বলেন, ‘তদন্ত শেষ না হলে কিছু বলা যাবে না। তবে আমার ধারণা স্টোরেজ ট্যাঙ্কের ভেরিফিকেশন ভুল হতে পারে। এটা ইচ্ছাকৃত ভুলও হতে পারে। আবার দীর্ঘদিন বাইরে থাকার কারণে টেম্পারেচারের কারণে এমনটা হতে পারে। যদি পাত্র প্রসারিত হয়ে যায় তাহলে অধিক তেল যাওয়ার পরেও লেভেলটা নিচে দেখাবে। ক্যালিব্রেশন ঠিকমত হয়নি বলে আমার ধারণা।’

গরম জ্বালানি তেল পাইপলাইনে প্রবেশের কারণে এমনটি হচ্ছে কি না জানতে চাইলে আজাদুর রহমান বলেন, ‘গরমের কারণে হতে পারে, তাপমাত্রা বেড়ে ভলিউম বেড়ে যায়। নানা কারণে হতে পারে কিন্তু গায়েব হয়ে যায়নি। এটা ধারণা যদি না চুরি করে থাকে। যদি তেল সরিয়ে থাকে তাহলে এটা অবশ্যই অন্য বিষয়। আর যদি টেকনিক্যাল কারণে হয়ে থাকে, তেল আছেই। পাইপে ঢুকলে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই যদি না কোনো বাইপাস থাকে।’

রহস্য উদঘাটনে পৃথক তদন্ত কমিটি হয়েছে জানিয়ে বিপিসির এই কর্মকর্তা বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট দেওয়ার পর্যায়ে এসে গেছে। তদন্তে বেরিয়ে আসবে কেন এমনটি হয়েছে। কারণ নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। পাইপলাইন বুঝে নেওয়ার হস্তান্তর কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, নভেম্বরের শেষের দিকে পুরো পাইপলাইন বুঝে নেবে বিপিসি।

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
 

সম্পাদক ও প্রকাশক :

মোঃ কামাল হোসেন

অফিস :

অফিস : ৬/২২, ইস্টার্ণ প্লাাজা (৬ তলা), কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, হাতিরপুল, ঢাকা।

ইমেইল :