ঢাকা , বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ , ১৪ ফাল্গুন ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বছরে ক্ষতি শতকোটি টাকা

বিপিসি অটোমেশন সিস্টেম চালু করতে পারছে না কেন?

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ২৬-০২-২০২৫ ১২:১৬:৫৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৬-০২-২০২৫ ০১:১২:৩৪ অপরাহ্ন
বিপিসি অটোমেশন সিস্টেম চালু করতে পারছে না কেন? ​ছবি: সংগৃহীত
বছরে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এই তেল সনাতন পদ্ধতিতে পরিমাপ ও পরিবহনের কারণে চুরিসহ নানা অনিয়মের ঘটনা বরাবরের। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির বছরে ক্ষতি হয় কমপক্ষে শতকোটি টাকা। জ্বালানি তেল সরবরাহে চুরি-অপচয় ঠেকাতে অটোমেশন সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল বিপিসি। কিন্তু আড়াই বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পরিচালিত সরকারি-বেসরকারি সংস্থা বা কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিপিসিতে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি বছরে ৫ বিলিয়ন ডলারের মতো লেনদেন করে। এই হিসাব পরিচালনা, তেল আমদানি ও কেনাবেচাসহ প্রায় সবই কাগজে লিখে সনাতন পদ্ধতিতে করা হচ্ছে। তাতে বিপিসিতে শত শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। 

আর্থিক অনিয়ম ঠেকাতে ২০২২ সালে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বিপিসিকে অটোমেশনে যাওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়। একই বছর সংসদীয় কমিটির সভা থেকেও বিপিসিকে অটোমেশনে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু ‘রহস্যজনক’ কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। পদক্ষেপটি বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে ‘শর্ষের মধ্যে ভূত’ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশে জ্বালানি তেলের একমাত্র নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিপিসি। প্রতিষ্ঠানটি বছরে আমদানি করা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল বাজারজাত করে থাকে, যার ৮০ শতাংশের বেশি পরিবাহিত হয় নৌপথে। বাকি ২০ শতাংশ আসে রেল ও সড়ক পথে। 

অভিযোগ রয়েছে, এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবহনে বিশাল একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। এই চক্রে বেসরকারি জাহাজ মালিক-সংশ্লিষ্টরা ছাড়াও রয়েছে বিপিসি এবং তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের যোগসূত্র থাকার কথাও বলেন অনেকে। সংঘবদ্ধ চক্রটি বেসরকারি অয়েল ট্যাংকারের (জাহাজ) মাধ্যমে তেল পরিবহনকালে বছরে কমপক্ষে শতকোটি টাকার তেল চুরিসহ নানা অনিয়ম করে থাকে। সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরতরা যেন বিষয়টি দেখেও দেখে না। 

বিপিসিতে অটোমেশন সিস্টেম চালুতে বিলম্ব হওয়া প্রসঙ্গে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘অটোমেশন করলে তো চুরির সুযোগ কমে যাবে। তাই করছে না। তেল সেক্টরটা হচ্ছে সোনার খনি। তাই তেলকে কালো সোনা বলা হয়। বিপিসিসহ এই তেল সেক্টরে যারা আছে, তাদের অনেকেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করে খাচ্ছে। এই লুটপাটের অর্থ ভাগে কম পড়বে মনে করে ওরা বিপিসিকে অটোমেশনের আওতায় আনছে না। না হলে সংসদীয় কমিটি ও পার্লামেন্ট থেকে বলার পরও অটোমেশন না করার দুঃসাহস দেখায় কী করে।’

তিনি বলেন, ‘হরিলুটের অয়েল সেক্টরে কোনো কোনো ড্রাইভার-পিয়নেরও দুয়েকটা বিল্ডিং আছে। এটা শুধু শোনা কথা নয়, বাস্তবেও দেখা যায়। কখনও কখনও শুনি কোনো কোনো সিবিএ সেক্রেটারির অনেক বাড়ি আছে। তাদের বাড়ি থেকে ৫ আগস্টের পর কয়েক কোটি টাকা লুট হয়েছেÑ এরকম কাহিনীও আছে।’ 

বাংলাদেশকে আগে দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্য করা হয়েছিল মন্তব্য করে আখতার কবির চৌধুরী আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের পরও দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও স্টেকহোল্ডাররা এক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, চেষ্টা করছেন বলে শুনি। আমরা বিশ্বাসও করি। আমরা প্রত্যাশা করব, এই সময়ে বিপিসির দুর্নীতি দমনের জন্য অটোমেশন সিস্টেমটা দ্রুত চালু করা হবে। কেননা রাষ্ট্রের স্বার্থে এটা খুবই জরুরি। রাষ্ট্রের সম্পদ কোনো কর্মচারী-কর্মকর্তা যা খুশি তা-ই করবে; পৈতৃক সম্পত্তির চেয়ে বেশি করে লুটপাট করবেÑ এমনটা চলতে দেওয়া যায় না। অনেকদিন করেছে; এবার তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা দরকার।’

‘অটোমেশন সিস্টেম বাস্তবায়নে বিলম্ব করলে আমরা বুঝব, যাদের হাতে অটোমেশন করার দায়িত্ব, তারা সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ। নিজের আখের গোছানোর ক্ষেত্রে অসুবিধা হবে বলে বিপিসিকে তারা অটোমেশন করছে না,’ যোগ করেন তিনি। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা, ইপিজেড, সদরঘাট, কর্ণফুলী ও বন্দর এলাকা ঘিরে তেল চোর সিন্ডিকেটের তৎপরতা বেশি। বিপিসির অধীন রাষ্ট্রীয় তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল লিমিটেডের তেল জাহাজে করে সারা দেশে পরিবহনের সময় সংঘবদ্ধভাবে চুরি করা হয়। তেল লোড করে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন ডিপোতে যাওয়ার সময় ছোট ছোট মোটর লাগিয়ে ড্রাম ভর্তি করা হয়। পরে সমুদ্রের উপকূলে এনে সেই তেল খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, জ্বালানি তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, এসএওসিএল ও এলপিজি কোম্পানি। এসব কোম্পানির কাছে বিপিসি জ্বালানি সরবরাহ করে। কোম্পানিগুলোর কাছে মাসের পর মাস বিপিসির হাজার হাজার কোটি টাকা পড়ে থাকে। এতে অনেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকে। অটোমেশন সিস্টেম চালু করলে এই সুবিধা পাবে না। তাছাড়া লোড-আনলোডের ক্ষেত্রে হাজার হাজার লিটার তেল অপচয়ের নামে চুরির বিষয়টি তো আছেই। অপচয়ের নামে বছরে অন্তত শতকোটি টাকার তেল চুরি হয়ে থাকে।

বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মো. জাহিদ হোসাইন এ বিষয়ে বলেন, ‘বিপিসির এমআইকে (মূল স্থাপনা) অটোমেশনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে। ইতোমধ্যে এমআইকে অটোমেশনের আওতায় আনতে ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ করে মন্ত্রণালয়ে ডিপিপি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বিপিসির অধীন ৩৯টি ডিপোকে অটোমেশনের আওতায় আনতে ফিজিবিলিটি স্টাডির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে যেসব অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে তা আর থাকবে না।’

তেল চুরিতে বিপিসির কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকলে, সেক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই নেওয়া হবে। কেউ অনিয়মে জড়িত এমন তথ্য-প্রমাণ থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্তসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’ সূত্র : প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স


এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ