ঢাকা , শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ , ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না বাংলাদেশ: এসঅ্যান্ডপি

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ০৭-১১-২০২৬ ০১:২২:৫৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৭-১১-২০২৬ ০১:৩০:০৩ অপরাহ্ন
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না বাংলাদেশ: এসঅ্যান্ডপি ছবি: প্রতীকী
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও তা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না। জ্বালানি সংকট এবং আমদানিকৃত জ্বালানির সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় দেশের বিদ্যুৎ খাতের নাজুক অবস্থা প্রকাশ্যে এসেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের শুক্রবার (৬ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৩০ গিগাওয়াট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে ২০২৬ সালে পা রেখেছে বাংলাদেশ। এর অর্থ হলো, দেশে ৬৬ শতাংশ 'রিজার্ভ মার্জিন' রয়েছে।

বছরের প্রথমার্ধে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদ্যুতের চাহিদা ১.৫ শতাংশ কমেছে। তা সত্ত্বেও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় উৎপাদন সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে মার্চের শেষ দিকে সরবরাহ সংকট তীব্র আকার ধারণ করে বিদ্যুতের ঘাটতি ১ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছায়, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

পিজিসিবির তথ্য ও এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জি সিইআরএ-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বছরের প্রথমার্ধে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্ল্যান্ট লোড ফ্যাক্টর (পিএলএফ) ৫৪ শতাংশ থেকে কমে ৪৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এর বিপরীতে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বেড়েছে; এগুলোর পিএলএফ ৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাসের ব্যবহার কমে যাওয়া ও কয়লার ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি বিদ্যুৎ খাতের একটি বড় দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তা হলো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে কেবল স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব নয়।

বিদ্যুৎ খাতের সম্প্রসারণের মধ্যেই চাহিদার ধীরগতি

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বছরের প্রথমার্ধে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমলেও দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা জোরালো।

২০২৬ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা (পিক ডিমান্ড) বছরে গড়ে ৫ শতাংশ হারে বাড়বে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৫ থেকে ২০৬০ সালের মধ্যে গ্রিড বিদ্যুতের চাহিদা বছরে গড়ে ৩.৮ শতাংশ হারে বাড়তে পারে।

প্রাক্কলন অনুসারে, ২০৬০ সাল নাগাদ দেশে বিদ্যুতের ব্যবহার প্রায় ৩৬২ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাবে; আর সর্বোচ্চ চাহিদা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৬২ গিগাওয়াট। ক্রমবর্ধমান এই চাহিদা মেটাতে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২০২৫ সালের প্রায় ৩০ গিগাওয়াট থেকে তিনগুণেরও বেশি বাড়িয়ে ২০৬০ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করতে হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তার প্রভাবে বদলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর অতিনির্ভরশীল হওয়ায় বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত জ্বালানি ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যের অস্থিরতার ঝুঁকিতে রয়েছে।

দেশের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৮৭ শতাংশই গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির হিস্যা মাত্র ২.৬ শতাংশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট ১.৮ গিগাওয়াট সক্ষমতার মধ্যে সৌরবিদ্যুতেরই একক আধিপত্য রয়েছে, যার পরিমাণ ১.৫ গিগাওয়াট।

সিইআরএর তথ্যমতে, আগামী দশকগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসগুলোতে বৈচিত্র্য আসবে। এক্ষেত্রে জ্বালানির প্রাপ্যতা ও ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন প্রযুক্তির ভূমিকা নির্ধারিত হবে।

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সংকুচিত হয়ে পড়বে। অন্যদিকে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা এ খাতকে বৈশ্বিক বাজারদর ও সরবরাহ বিঘ্নের ঝুঁকিতে রাখবে।

বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্র ও প্রতিশ্রুত প্রকল্পগুলোর ওপর ভর করে মধ্যম মেয়াদে কয়লার গুরুত্ব বজায় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ২০৪৬ সালের পর কয়লাভিত্তিক নতুন কোনো সক্ষমতা যুক্ত হবে না বলেই ধরে নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে আসায় অদূর ভবিষ্যতে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের ব্যবহার বাড়বে। এছাড়া ২০২৮ সালের মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়ে যাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

চলতি দশকের শেষদিক থেকে অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক বিদ্যুতের ভূমিকা ক্রমশ বাড়বে। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় আমদানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব বজায় থাকবে। প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৬০ সাল নাগাদ দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৬০ শতাংশেরও বেশি আসবে পারমাণবিক, সৌর ও আমদানিকৃত বিদ্যুৎ থেকে।

সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উত্থান

এসঅ্যান্ডপি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে সৌরবিদ্যুতের হাত ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ গতি পেয়েছে। তবে অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পগুলো চালু হয়েছে ধীরগতিতে। 

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংশোধিত মহাপরিকল্পনায় মোট বিদ্যুতের উৎসে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ ও ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বড় পরিসরের ও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও স্টোরেজ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

সিইআরএ বলেছে, বাংলাদেশকে কেবল নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিলেই চলবে না; এর পাশাপাশি সঞ্চালন, বিতরণ ও সংরক্ষণ অবকাঠামোর উন্নয়নও নিশ্চিত করতে হবে।

বহুমুখীকরণ ও জ্বালানি নিরাপত্তার দিকে নীতিগত পরিবর্তন

এসঅ্যান্ডপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ, স্টোরেজ ও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যে বিনিয়োগ উৎসাহিত করছে।

তবে এই রূপান্তর কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে জ্বালানি সরবরাহ, অর্থায়ন, গ্রিড অবকাঠামো ও প্রকল্প বাস্তবায়নের জটিলতাগুলো নিরসনের ওপর।

বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রাপ্যতা ও ব্যবহারের মাত্রা বাড়ানো, পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সঞ্চালন অবকাঠামো শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে সিইআরএ। এছাড়া বিদ্যুৎ আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে তা ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

সিইআরএ কেবল নতুন উৎপাদন সক্ষমতা না বাড়িয়ে, যেখানে সম্ভব সেখানে প্ল্যান্ট লোড ফ্যাক্টর বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। একইসঙ্গে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করে—এমন বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ