ঢাকা , শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ , ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্রেতাশূন্য অভিজাত শপিংমল, বন্ধ হওয়ার শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ৩০-১০-২০২৬ ০৪:২২:৩৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ৩০-১০-২০২৬ ০৪:২২:৩৭ অপরাহ্ন
ক্রেতাশূন্য অভিজাত শপিংমল, বন্ধ হওয়ার শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা ফাইল ছবি
দুপুর গড়িয়ে গেলেও অনেক দোকানে হয় না দিনের প্রথম বিক্রি। পণ্য বিক্রি না হওয়ায় দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। কেউ কেউ ঋণ করে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন, আবার অনেকে দোকান ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। রাজধানীর একসময়ের অভিজাত ও জমজমাট শপিংমলগুলোর চিত্র এখন এমনই।

রাপা প্লাজা, ইস্ট প্লাজা, প্লাজা এয়ার ও অর্কিড পয়েন্টের মতো বিপণিবিতানে ক্রেতাসংকটের কারণে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে একে একে বন্ধ হয়ে যেতে পারে আরো কিছু শপিংমল।

এরই মধ্যে ব্যবসায়িক মন্দা, ক্রেতাসংকট ও আর্থিক সংকটের কারণে রাজধানীর শান্তিনগর-কাকরাইলের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ হয়ে গেছে। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া এই বিপণিবিতানটি গত ১ অক্টোবর থেকে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন দোকানমালিকেরা।

দীর্ঘদিন ধরে ক্রেতা কমে যাওয়া, লোকসান ও বকেয়া বিলের চাপ সামলাতে না পেরে তারা এ সিদ্ধান্ত নেন।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও ক্রেতা পাই না

রাজধানীর রাপা প্লাজায় ২৬ বছর ধরে ব্যবসা করছেন নূর নবী। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় অনেক উত্থান-পতন দেখেছেন তিনি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন বলে মনে করছেন এই ব্যবসায়ী।

নূর নবী বলেন, ‘অবস্থা এমনিতেই খারাপ।

তবে রাপা প্লাজার অবস্থা আরো খারাপ। একসময় আমরা শাটার খোলার অপেক্ষা করতাম, কখন ক্রেতা আসবেন। ক্রেতারা বলতেন, আমার পণ্যটা দিয়ে তারপর শাটার বন্ধ করেন। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও ক্রেতা পাই না।’
তিনি আরো বলেন, অনেক দিন দুপুর গড়িয়ে গেলেও বিক্রি শুরু হয় না। দোকানে পণ্য সাজানো থাকলেও ক্রেতা না থাকায় ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

একই মার্কেটের এক নারী ব্যবসায়ীও হতাশার কথা জানান। সকাল ১১টার দিকে দোকান খুললেও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তার কোনো বিক্রি হয়নি বলে জানান তিনি।

ওই নারী ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমাদের পুরো পরিবার ব্যবসার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। দোকানের আয় দিয়ে বাসাভাড়া, খাওয়াদাওয়া, পণ্য কেনা ও কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এত খারাপ যে সব খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

২০ টাকার পণ্যও বিক্রি হচ্ছে না

রাপা প্লাজার মতো একই চিত্র দেখা যাচ্ছে রাজধানীর অন্য কয়েকটি শপিংমলেও। একসময় কেনাকাটার জন্য পরিচিত ছিল ইস্ট প্লাজা। সেখানকার ব্যবসায়ীরাও এখন ক্রেতাসংকটে ভুগছেন।

এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমাদের দোকানে ২০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামের পণ্য রয়েছে। তারপরও সারা দিন কোনো ক্রেতা পাই না। সোমবারও কোনো বিক্রি হয়নি, আজও হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে দোকানভাড়া দেওয়া সম্ভব হবে না।’

তিনি বলেন, কয়েক মাস দোকানভাড়া দিতে না পারলে দোকান ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। মাসে কয়েক দিন বিক্রি হলেও বাকি দিনগুলোতে আয় না থাকায় ব্যবসার খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

অর্কিড পয়েন্টের ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের আশঙ্কা করছেন। তাদের একজন জানান, মঙ্গলবার মার্কেটটি বন্ধ ছিল। ব্যবসার অবস্থা খারাপ হওয়ায় কিছু দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। আবার কিছু নতুন ব্যবসায়ী এসেছেন। তবে সামগ্রিকভাবে বিক্রি বাড়ছে না।

ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা দোকানভাড়া, সার্ভিস চার্জ ও কর্মচারীদের বেতন দিয়ে ব্যবসা করি। অন্যদিকে ফুটপাতে কম খরচে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। অনলাইনে অনেক পণ্য তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। এসব কারণে আমাদের ব্যবসায় প্রভাব পড়ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আগে ভাড়ার দোকানে ব্যবসা করতাম। পরে সেখানে দোকান না পেয়ে এই মার্কেটে এসেছি। কিন্তু এখানেও ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়।’

ঋণের বোঝা বাড়ছে ব্যবসায়ীদের

ব্যবসায় মন্দার কারণে অনেক ব্যবসায়ী ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। দোকানে লাখ লাখ টাকার পণ্য থাকলেও বিক্রি না হওয়ায় নগদ অর্থের সংকট কাটছে না। একপর্যায়ে পণ্য কেনার টাকা, দোকানভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন জোগাড় করাও কঠিন হয়ে উঠছে।

এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘গত আড়াই বছরে আমার প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা ঋণ হয়েছে। দোকানে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার পণ্য থাকলেও ক্রেতা না থাকলে কী হবে? সংসার চালাতে হচ্ছে একজনের কাছ থেকে ধার করে আরেকজনের দেনা শোধ করে।’

আরেক ব্যবসায়ী জানান, তার পরিচিত এক দোকানির প্রায় ৩০ লাখ টাকার পণ্য রয়েছে। কিন্তু তার দেনার পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ টাকা। বিক্রি না হওয়ায় পণ্য থাকা সত্ত্বেও দেনা পরিশোধ করতে পারছেন না তিনি।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রতিদিন দোকান খোলা রাখার জন্য বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন, ভাড়া ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হয়। অথচ বিক্রি না থাকায় এসব ব্যয় মেটানোর মতো অর্থ হাতে থাকছে না। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে দোকান বন্ধ করে দিচ্ছেন।

অনলাইন কেনাকাটা ও ফুটপাতের প্রতিযোগিতা

ব্যবসায়ীরা বলেন, ক্রেতাসংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। অনলাইনে কেনাকাটার প্রবণতা বৃদ্ধি, ফুটপাতের দোকানে কম দামে পণ্য পাওয়া, ক্রেতাদের পরিবর্তিত অভ্যাস এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কেনাকাটায় সতর্কতা—সব মিলিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।

এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘অনলাইনে অনেক কম দামে পণ্য পাওয়া যায়। ক্রেতারা সেখান থেকে কেনাকাটা করেন। আবার ফুটপাতেও কম দামে পণ্য বিক্রি হয়। কিন্তু আমাদের দোকানভাড়া, সার্ভিস চার্জ ও কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়। ফলে একই দামে পণ্য বিক্রি করা কঠিন।’

তবে অনলাইন কেনাকাটা বা ফুটপাতের ব্যবসাকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, মানুষের হাতে খরচ করার মতো অর্থ কমে গেলে কেনাকাটাও কমে যায়। প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর অনেকেই পোশাক বা অন্যান্য পণ্য কেনা পিছিয়ে দিচ্ছেন।

কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি কি সতর্কবার্তা?

রাজধানীর শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে অবস্থিত কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি একসময় অভিজাত বিপণিবিতান হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া এই শপিং কমপ্লেক্সে একসময় ১৯৮টি দোকান ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ক্রেতা কমতে থাকায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত গত ১ অক্টোবর থেকে বিপণিবিতানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন অন্য শপিংমলের ব্যবসায়ীরা। তাদের আশঙ্কা, ক্রেতা না ফিরলে এবং বিক্রি না বাড়লে একই পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে আরো কিছু বিপণিবিতান।

ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, দোকানভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাড়লেও বিক্রি না থাকলে তারা কত দিন ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবেন? অনেকের কাছে এখন ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেয়ে ঋণের বোঝা না বাড়ানোই বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে রাজধানীর একসময়ের অভিজাত শপিংমলগুলোতে ক্রেতাসংকট ব্যবসায়ীদের অস্তিত্বের সংকটে ফেলেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা, কেনাকাটার পরিবেশ ও ব্যবসার ব্যয়—সব দিকেই নজর দেওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, ক্রেতারা আবার ফিরবেন, বাড়বে বিক্রি। তা না হলে একসময় জমজমাট এসব বিপণিবিতানের অনেকগুলোই হয়তো ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। সূত্র: কালের কন্ঠ

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ