ঢাকা , সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ , ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রবারণা পুর্ণিমা

আগের সেই জৌলুস নেই উৎসবে

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৬-১০-২০২৬ ০৩:৩৯:৫৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৬-১০-২০২৬ ০৩:৩৯:৫৮ অপরাহ্ন
আগের সেই জৌলুস নেই উৎসবে ফোকাস বাংলা নিউজ
প্রবারণা পূর্ণিমা। রাখাইনদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। আর এই তিঁথিতে বরাবরের মতো এবছরও সোমবার দিনভর বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার রাখাইন জনগোষ্ঠী। অনুষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত আকাশে সন্ধ্যার পরে ফানুস ওড়ানোর উৎসব । প্রত্যেক বছর এ তিঁথিতে প্রবারণা পূর্ণিমার উৎসব পালিত হয়ে আসছে। উৎসব পালনের জন্য এবছরও কলাপাড়ার ২৮টি রাখাইন পল্লীর বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধবিহার কমিটির কাছে সরকারি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এ উপলক্ষ্যে রাখাইন পল্লীতে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ।

কুয়াকাটা কেন্দ্রীয় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার অধ্যক্ষ ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো জানান, সকাল থেকে বৌদ্ধ বিহারে রাখাইন নারীরা উপস্থিত হয়ে পঞ্চশীল, উপসোথ শীল গ্রহণ করেন। নানা ধরনের পিঠা দান করা। সকলের মঙ্গল কামনায় সমবেত প্রার্থনা করা হয়েছে। ভিক্ষু সংঘ থেকে ধর্মীয় উপদেশমূলক ধর্মালোচনা করেন আগতরা। সন্ধ্যায় নাচেগানে উৎসবমূখর পরিবেশে ফানুস উড়ানোর আয়োজন করা হয়েছে। বিহারের চারপাশে হাজারো প্রদীপ প্রজ¦লন করা হয়েছে। এক থেকে তিনদিন এই উৎসব চলবে। এই প্রবারণা উৎসবকে ঘিরে উপজেলার বৌদ্ধবিহারগুলো নতুন সাজে সাজানো হয়েছে। সকাল থেকে প্রত্যেক রাখাইন পাড়ায় নানা রকম বাহারি পিঠে-পুলি তৈরি হয়েছে। করা হয় পায়েস তৈরি। 

এ বিহারাধ্যক্ষ জানান, প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। যা আশি^নী পূর্ণিমা নামেও পরিচিত। এই মাসের পূর্ণিমার তিঁথিতে পালিত হয় এই উৎসব। তিনি বলেন, ‘ প্রবারণা শব্দের পালি আভিধানিক অর্থ নিমন্ত্রণ, আহ্বান, মিনতি, অনুরোধ, নিষেধ, ত্যাগ, শেষ, সমাপ্তি, ভিক্ষুদের বর্ষাবাস পরিসমাপ্তি, বর্ষাবাস ত্যাগ, ত্যাগের কার্য কিংবা শিষ্টাচার, বিধি, তৃপ্তি বা সন্তুষ্টির বিষয়। বোঝায় ক্ষতিপুরণ, প্রায়শ্চিত্ত ও ঋণ পরিশোধ।’

এই বিহারাধ্যক্ষ আরো জানান, বর্ষাবাস সমাপনান্তে ভিক্ষুগণ তাঁদের দোষত্রুটি অপর ভিক্ষুগণের কাছে প্রকাশ করেন। এর প্রায়শ্চিত্ত বিধানের আহ্বান জানান; এমনকি অজ্ঞাতসারে কোনো অপরাধ করে থাকলে তার জন্যও ক্ষমা প্রার্থনা করেন-এটাই পলি ভাষায় প্রবারণা পুর্ণিমা। এইদিন বুদ্ধের চুলধাতুর স্মরণে পরম শ্রদ্ধায় কাগুজে ফানুস তৈরি করে ধর্মীয় রীতি-নীতি মেনে চুলামনি চৈত্যকে পূজা করার উদ্দেশে আকাশ প্রদীপ হিসেবে ফানুস বাতি উত্তোলন করা হয়। এসময় ধর্মীয় গাঁথা ব মন্ত্র পাঠ করে উৎসর্গ করে খালি পায়ে বৌদ্ধরা ফানুস উড়িয়ে দেন। মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে সাধু-ধ্বনির সুরে সুরে উড়ানো হয় ফানুস।
প্রবারণা পূর্ণিমা হলো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব, যা আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয়। এবছরও কুয়াকাটা কেন্দ্রীয় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারে প্রবারণা পূর্ণিমা পালিত হচ্ছে আজ ২৬ অক্টোবর, সোমবার থেকে। আজ অন্তত ১০-১২ টি ফানুস ওড়ানোর কথা জানালেন তিনি।

বিহারাধ্যক্ষ ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো এর ঐতিহাসিক ঘটনা বলেন,‘গৌতম বুদ্ধের চুলকর্তন, স্বর্গে মাতা মায়াদেবীকে ধর্ম দেশনা প্রদান এবং ৬০ জন ভিক্ষুকে ধর্ম প্রচারে পাঠানোর স্মৃতি বিজড়িত এই দিন।’ প্রবারণা পূর্ণিমা।

মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ বিহার অধ্যক্ষ উত্তম ভিক্ষু জানান, আজ সকাল সাতটায় ধর্মীয় প্রার্থনা শীল প্রদান ও গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই দিনটির উৎযাপন শুরু হয়েছে। দিনভর ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াও তৈরি করা হয় মজাদার খাবার পিঠে-পুলি। সন্ধ্যার পরে ঐতিহ্যবাহী ফানুস উৎসব হয় অধিকাংশ রাখাইন পল্লীতে। এবছর আজ প্রথম রাতে তারা অন্তত ১০টি ফানুস ওড়ানোর কথা জানালেন। তবে এই পল্লীর রাখাইন অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক ঘটনায় এখনো মানসিক স্বস্তিবোধ করতে পারছেন না বলে মন্তব্য এই ভিক্ষু জানালেন।

বেতকাটা রাখাইন পল্লীর বাসীন্দা ‘ ধর্ম বিজয় বৌদ্ধা বিহারের’ সভাপতি মংচো জানান, তারা প্রথম দিনে ১০-১২টি ফানুস ওড়াবেন। গোড়া আমখোলা রাখাইন পল্লীর ‘ বিজয়রামা বৌদ্ধ বিহার’ অধ্যক্ষ সুচিন্ত মহাথেরো জানান, তারা অন্তত ১০টি ফানুস ওড়াবেন। দিয়রাম খোলা পাড়ার বাসীন্দা রাখাইন নেতা মংম্যা জানান, তাঁদের পল্লীতে মোট চারটি পরিবারের বসবাস। তারপরও ৪-৫টি ফানুস ওড়াবেন। মোট কথা সব কয়টি রাখাইন পল্লীতে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। সাগরপারের  রাখাইনদের আড়াইশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবকে ঘিরে রাখাইন পল্লীগুলোতে রাখাইন নারী-পুরুষ, শিশুরা উৎফুল্ল রয়েছে। অন্য ধর্মের মানুষের উপস্থিতি রয়েছে চোখে পড়ার মতো।

এককালে এই জনপদের মানব বসতি উপযোগী করা এক সময়ের প্রভাব-প্রতিপত্তের অধিকারী রাখাইন সম্প্রদায় প্রত্যেকটি পাড়ায় তিন রাত অবধি একশ’ থেকে দেড়শ’ ফানুস ওড়ানো হতো। আকাশ আলোকিত হতো ফানুসের আলোয়। তারার মতো জ¦ল জ¦ল করত সাগরপাড়ের আকাশ। এটি এখন তাঁদের কাছে হারানো অতীত। এরা আজ পরিণত হয়েছে ক্ষয়িষ্ণু সম্প্রদায়ে। শতাধিক রাখাইন পল্লী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। চাষের জমিজমা থেকে শুরু করে বিহার, রাখাইন পাড়া থেকে শুরু শ্মশান পর্যন্ত দখল করা হয়েছে। বলতে গেলে নিঃস্ব হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে এখন আর প্রবারণা পূর্ণিমার এই তিঁথিতে আগের মতো আকাশ আলোকিত করে রাতের আকাশে ভেসে বেড়ায় না ফানুসের আলো। নেই আগের কোন জৌলুস। তারপর ওধর্মীয় অন্যতম বৃহৎ এই উৎসব পালন করছেন ছকে বাঁধা নিয়মে। টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে। সরকারি সহায়তা নিতে হয় এসব উৎসবের আয়োজনে। পাশপাশি বিভিন্ন উপকরণের দাম বৃদ্ধি হওয়ায়। ফানুস তৈরি করা অনেক সংকটে পড়তে হয় বলে রাখাইন নেতৃবৃন্দ জানান।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আরিফুজ্জামান জানান, রাখাইনরা যেন নির্বিঘ্নে প্রবারণা পূর্ণিমার বৃহৎ এই ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারে এ জন্য সকল ধরনের নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সকল ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। 

কলাপাড়া থানার ওসি মোঃ নজরুল ইসলাম ও মহিপুর থানার ওসি মোঃ শামীম হাওলাদার জানান, রাখাইনদের ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে সকল ধরনের নিরাপত্তাসহ সগযোগিতা করা হচ্ছে । এনিয়ে কোন ধরনের শঙ্কা নেই।

 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ