খুলনার দাকোপের চালনা নৌঘাট
নৌপথে যাত্রী খরা: বিকল্প আয়ের সন্ধানে ট্রলার মালিক-চালকরা
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৪-১০-২০২৬ ০২:৪৭:৪৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৪-১০-২০২৬ ০২:৪৭:৪৬ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় জেলা খুলনার দাকোপে নদীপথে ট্রলারের পরিচালনা ব্যয় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। সাধারণ যাত্রী পারাপারের ট্রলারগুলোর তেলের খরচ এতটাই বেড়েছে, মাঝিরা ট্রলার ঘাটে বসিয়ে রেখে জীবিকার তাগিদে দিনমজুরি বা বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন।
ট্রলার চালক সুজিত মন্ডল, গফ্ফার হোসেন গাজী, আব্দুল্লাহ গাজী, এলাহী বক্স, খালেক ও বিধান সরদার জানান, সমুদ্র উপকূলীয় পৃথক তিনটি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত দাকোপ উপজেলার নদীপথে আগেরমতো আর যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না।
তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবন সংলগ্ন কালাবগী থেকে চালনা লঞ্চঘাট পর্যন্ত নদী পথের দূরত্ব প্রায় ৪১ কিলোমিটার। এ নদী পথে যাত্রীবাহী ছোট বড় ট্রলারের সংখ্যা ২৯টি। আর এ নদীপথে শুধু একবার ট্রলার চালিয়ে এলেই ৮ থেকে ৯ লিটার ডিজেল পোড়ে। কালাবগী থেকে চালনা লঞ্চঘাট পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া ৮০ টাকা। যখন এই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল তখন প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা। এখন ২০ টাকা বেড়ে প্রতি লিটারের দাম ১৩৫ টাকা।
তাই বাধ্য হয়ে নদীপথের দূরত্ব অনুযায়ী প্রতি যাত্রীদের কাছে থেকে কম-বেশি অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ টাকা ভাড়া বেশি নিতে হচ্ছে। কালাবগী থেকে চালনা পর্যন্ত প্রতি ট্রলারে কমবেশি যাত্রী হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ জনের মতো। এ রকম সংখ্যক যাত্রী নিয়ে ট্রলার চালালে আমাদেরকে কিছু দিন পর পথে বসতে হবে। এই রুটে এখন মাত্র ৮ থেকে ৯টি ট্রলার চলছে। আগে আরও ট্রলার চললেও লোকসান হয় বলে তারা অন্যত্র চলে গেছেন বা বন্ধ রেখেছেন। যাত্রী হোক বা না হোক প্রতিদিন ট্রলার চালাতে হলে একজন চালককে ৬৫০ ও একজন কর্মচারীকে ৫০০ টাকা বেতন দিতে হয়।
এই নদীপথের এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে বিকল্প কাঁচা সড়ক রয়েছে। তবে বর্ষাকালে এসব কাঁচা সড়ক দিয়ে চলাচল কঠিন। তাই এই রুটে মূলত বর্ষা মৌসুমে বেশি যাত্রী হয়। এখন বর্ষা মৌসুম শেষ, নদীপথের যাত্রীরা তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছাতে সড়কপথে ছুটবেন। ফলে এ নদী পথে ট্রলার চালিয়ে ডিজেলের টাকাও ওঠানো সম্ভব হবে না। আর আয় করতে না পারলে পরিবার চালাতেই হিমশিম খাবেন ট্রলার মালিক, চালক ও কর্মচারীরা।
এ অবস্থায় অনেকে ট্রলারের মাঝি কাজ ছেড়ে দিয়ে জীবন জীবিকার জন্য বিকল্প আয়ের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। সবমিলিয়ে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি এবং নদীপথে যাত্রী সংকটের কারণে ট্রলার মালিক ও চালকরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
কালাবগী থেকে সড়কপথে চালনায় আসা ব্যবসায়ী আকবর সরদার বলেন, ট্রলারে এলে বেশি অর্থ খরচ হয়। পাশাপাশি সময়ও বেশি লাগে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এলাকার রাস্তাঘাট কাদামাটি হওয়ার কারণে, তখন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হলেও ট্রলার যাতায়াত করতাম। তখন ট্রলার ভাড়া ছিল জন প্রতি ৮০ টাকা। বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে ট্রলার ভাড়া আগের তুলনায় জনপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামের রাস্তাঘাট শুকিয়ে যাওয়ায় খরচ কমাতে সড়কপথে ইঞ্জিনচালিত ভ্যানে যাতায়াত করছি।
কালাবগী থেকে চালনা পর্যন্ত যাত্রীবাহী ট্রলার চালক বকুল মল্লিক বলেন, একসময় এ নদীপথে ট্রলার যাত্রী বেশি হতো। যাত্রীবাহী এ ট্রলার চালিয়ে আমরা তখন লাভবান হয়েছি। নদীপথের যাত্রীরা শুকনো মৌসুমে চলাচল করতে চান না। সময় বাঁচাতে যাত্রীরা এখন সড়কপথ বেছে নিয়েছেন। ফলে নদীপথে ট্রলারে তেমন যাত্রী হচ্ছে না। বর্তমানে ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় ট্রলার ভাড়াও একটু বাড়ানো হয়েছে। ফলে ট্রলারে আগের থেকেও যাত্রীও কম হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইতিমধ্যে এ নদীপথের অধিকাংশ ট্রলার মালিক ও চালকরা তাদের ট্রলার পরিচালনা বন্ধ করে দিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। বর্তমানে ট্রলার চালিয়ে যে আয় হচ্ছে, তাতে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আমার ট্রলারটি ডাঙ্গায় উঠিয়ে রেখে দিনমজুরের কাজ করবো।
চালনা লঞ্চঘাটের রিজার্ভ ও ভাড়ায়চালিত ট্রলার মালিক জাফর হাওলাদার বলেন, তেলের দাম বাড়ার পর ট্রলারের ভাড়াও স্বাভাবিকভাবে বাড়াতে হয়েছে। ট্রলার চালিয়ে এখন আর আগের মতো আর আয় হচ্ছে না। ফলে সাধারণ যাত্রীরাও আগের মতো ট্রলার রিজার্ভও করছেন না। এভাবে চলতে থাকলে পরিবার-পরিজন নিয়ে পথে বসতে হবে। তাই ভাবছি, দীর্ঘ বছরের এ পেশা ছেড়ে দিয়ে এখন জীবন জীবিকার তাগিদে বিকল্প পেশায় যাবো।
লক্ষ্মীখোলা খেয়াঘাটের ট্রলার চালক কামরুল ইসলাম বলেন, আগে নদী পারাপারে জন প্রতি নেওয়া হতো ৫ টাকা। হঠাৎ ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এখন বাধ্য হয়ে জনপ্রতি নিতে হচ্ছে ৬ থেকে ৭ টাকা করে।
চালনা বাজারের খুচরা ডিজেল ব্যবসায়ী নিমাই সাহা জানান, দাম বৃদ্ধির আগে খুলনা যমুনা ডিপো থেকে ২০০ লিটারের এক ব্যারেল ডিজেল কিনতাম ২২ হাজার ৩০০ টাকায়। এখন দাম বৃদ্ধির কারণে একই ডিপো থেকে ওই ডিজেল কিনতে হয়েছে ২৬ হাজার ৩০০ টাকায়। এরপর ওই ডিজেল খুলনা থেকে চালনা বাজার পর্যন্ত ব্যারেল প্রতি পরিবহন খরচ হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ক্রেতাদের কাছ থেকেও লিটার প্রতি ২০ টাকা করে বেশি নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স