ঢাকা , শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ , ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধের শঙ্কায় দেশে দেশে চলছে খাবার মজুতের প্রস্তুতি

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ২৪-১০-২০২৬ ১১:১৭:১০ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ২৪-১০-২০২৬ ১১:১৭:১০ পূর্বাহ্ন
যুদ্ধের শঙ্কায় দেশে দেশে চলছে খাবার মজুতের প্রস্তুতি ফাইল ছবি
জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধের আশঙ্কা, সাইবার হামলা ও নাশকতার ঝুঁকি বাড়তে থাকায় দুর্যোগ মোকাবিলায় নাগরিকদের আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। যুক্তরাজ্য থেকে অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স থেকে ভারত, প্রায় সবখানেই জরুরি পরিস্থিতিতে অন্তত কয়েক দিনের জন্য খাবার, পানি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখতে বলা হচ্ছে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় দুর্যোগের জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়াকে অতি সতর্ক মানুষের কাজ বলে মনে করা হতো। কিন্তু এখন সরকারি পর্যায়েও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, বড় কোনো বিপর্যয়ে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ব্যাংকিং সেবা ও সরবরাহব্যবস্থা অচল হয়ে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগপর্যন্ত নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা থাকা জরুরি।

দেশভেদে প্রস্তুতির ধরনও ভিন্ন। কোথাও তিন দিনের খাবার মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহের প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখতে বলা হচ্ছে।

ফ্রান্স

ফ্রান্সে দুর্যোগের প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে ‘নির্ণায়ক সময়’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময় টেলিভিশন ও রেডিওতে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ এবং দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার প্রয়োজন হলে ব্যবহার করা যায়, এমন জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ব্যাগে খাবার, পানি, ওষুধ ও নগদ অর্থের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নথির ফটোকপি, বাড়ি ও গাড়ির অতিরিক্ত চাবি এবং সময় কাটানোর জন্য কিছু খেলনা বা খেলার সামগ্রী রাখার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, গুজব ও অপতথ্য এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবী বা নাগরিক সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জার্মানি

পশ্চিম জার্মানিতে ষাটের দশক থেকেই পরিবারগুলোকে ১৪ দিনের খাবার মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হতো। প্রায় এক দশক আগে এ লক্ষ্য কমিয়ে ১০ দিন করা হয়। গত বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত নির্দেশনায় বলা হয়, সম্ভব হলে ১০ দিনের সরবরাহ প্রস্তুত রাখতে হবে। তবে অন্তত তিন দিনের খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী থাকলেও তা বড় সহায়তা হতে পারে।

জার্মানির নাগরিক সুরক্ষা ও দুর্যোগ সহায়তা দপ্তর দীর্ঘদিন ভালো থাকে এমন খাবার মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে, যেগুলো রান্না ছাড়াই খাওয়া যায়। রান্না করতে হলে কম জ্বালানি লাগে, এমন খাবার রাখার কথাও বলা হয়েছে, যাতে বিদ্যুৎ না থাকলেও ক্যাম্পিং চুলার জ্বালানি বেশিদিন ব্যবহার করা যায়।

জরুরি সামগ্রীর তালিকায় রয়েছে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে চালানো বা সৌরশক্তিচালিত রেডিও, গুরুত্বপূর্ণ ফোন নম্বরের কাগজে লেখা তালিকা এবং পর্যাপ্ত ওষুধ।

যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৩ সালে চালু হওয়া দুর্যোগ প্রস্তুতি কর্মসূচিতে আগেভাগে পরিকল্পনা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ, দুর্যোগের সময় পরিবারের সদস্যরা একই জায়গায় নাও থাকতে পারেন।

সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন এক মার্কিন গ্যালন বা প্রায় ৩ দশমিক ৮ লিটার পানি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পান করার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার কাজেও এ পানি ব্যবহার করা যাবে।

এ ছাড়া সাহায্যের জন্য সংকেত দিতে বাঁশি, দূষিত বাতাস থেকে সুরক্ষায় ধুলারোধী মাস্ক এবং আশ্রয় তৈরির জন্য প্লাস্টিকের শিট রাখার কথা বলা হয়েছে।

কত দিনের খাবার মজুত রাখতে হবে, তা দেশটির অঙ্গরাজ্যভেদে ভিন্ন। ক্যালিফোর্নিয়ায় কয়েক দিনের সরবরাহ রাখার পরামর্শ দেওয়া হলেও হাওয়াইয়ে দুই সপ্তাহের বেশি সময়ের প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। পরিবারের চাহিদা পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিবছর জরুরি ব্যাগের সামগ্রী পর্যালোচনা এবং বাড়ি, কর্মস্থল ও গাড়িতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

নর্ডিক দেশগুলো

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলা শুরুর পর নর্ডিক দেশগুলো দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করেছে। ফিনল্যান্ডে অন্তত তিন দিনের খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী। তবে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত পণ্য কিনে মজুত না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

দেশটির কৌশলগত খাদ্যভান্ডারে পর্যাপ্ত শস্য সংরক্ষিত রয়েছে। সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়লে বা দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হলে এ মজুত দিয়ে প্রায় নয় মাস জনগণের খাদ্যচাহিদা মেটানো সম্ভব।

সুইডেনে যুদ্ধের পাশাপাশি মহামারি ও চরম আবহাওয়ার পরিস্থিতি মাথায় রেখে প্রস্তুতির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নাগরিকদের অন্তত এক সপ্তাহ নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা অর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

সেখানে জানালার পাশে বেরি জাতীয় ফল চাষ, ফ্রিজ নষ্ট হলে ব্যবহারের জন্য পানির বোতল জমিয়ে রাখা এবং টয়লেটে পানি না এলে প্লাস্টিকের ব্যাগে মলমূত্র সংগ্রহ করে তার ওপর করাতের গুঁড়া ছড়িয়ে দেওয়ার মতো পরামর্শও রয়েছে।

নরওয়েতে অন্তত এক সপ্তাহ নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে। ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ব্যাংকের লেনদেন বন্ধ হয়ে গেলেও যাতে মানুষ চলতে পারে, সে লক্ষ্যেই এ নির্দেশনা।

দেশটিতে ঘর গরম রাখার জন্য বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বেশি। তাই গরম কাপড়, স্লিপিং ব্যাগ ও মোমবাতি মজুত রাখা এবং অগ্নিকুণ্ড ও চিমনি পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ডেনমার্কে তিন দিনের খাবারের একটি নমুনা তালিকাও দেওয়া হয়েছে। এতে রয়েছে ৫০০ গ্রাম ক্রিস্পব্রেড, টমেটো সসে ৩০০ গ্রাম টিনজাত ম্যাকারেল মাছ, ৩০০ গ্রাম ছোলা ও কিডনি বিন, ৫০০ গ্রাম করে পাস্তা ও শস্যজাতীয় খাবার, দেড় কেজি টিনজাত সবজি, ১০০ গ্রাম বাদাম এবং কিছু উদ্ভিজ্জ তেল।

অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়ায় সাধারণত তিন থেকে সাত দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে নিউ সাউথ ওয়েলসের স্বাস্থ্য বিভাগ দুই সপ্তাহের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেছে।

পরিবারে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি বা অসুস্থ কেউ থাকলে তাদের বিশেষ চাহিদা অনুযায়ী খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দাবানল মোকাবিলায়ও রয়েছে বিস্তারিত নির্দেশনা। বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড় ছেঁটে রাখা, মাথায় জ্বলন্ত অঙ্গার পড়া থেকে সুরক্ষায় চওড়া কিনারার টুপি পরা এবং ধোঁয়ার ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে রেসপিরেটর মাস্ক ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ