দাবি যাত্রী কল্যাণ সমিতির
১৩ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২১-১০-২০২৬ ০৩:৫৪:২৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২১-১০-২০২৬ ০৩:৫৪:২৫ অপরাহ্ন
বিগত সরকারের নীতিগত ভুল, কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা উপেক্ষা এবং সড়ক খাতে সীমাহীন দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির কারণে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির দাবি, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন।
বুধবার (২১ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার তথ্য পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে মোট ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে হাসপাতালগুলোর বাস্তব চিত্র বিবেচনায় নিলে দুর্ঘটনায় হতাহত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত পরিসংখ্যানের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হতে পারে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
বিজ্ঞপ্তিতে দেশের পরিবহন ব্যবস্থার অতীত ও বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়, স্বাধীনতার আগে দেশে নৌ ও রেলপথে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল। সে সময় সড়কপথে যাতায়াত করতেন প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে না তুলে সড়ককেন্দ্রিক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের প্রবণতা বাড়তে থাকে। এর ফলে দেশের যাতায়াত ব্যবস্থায় সড়কপথের ওপর নির্ভরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, পরিকল্পিত ও সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে সড়ককেন্দ্রিক বেহিসাবি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের কারণে পরিবহন খাতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ যাতায়াত সড়কপথনির্ভর হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, উন্নত গণপরিবহন ও আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থা বা ম্যাস ট্রানজিটের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ছোট যানবাহনের ব্যবহার বেড়েছে। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
সংগঠনটি সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ চালক এবং মহাসড়ক নির্মাণের ত্রুটিকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে। এসব সমস্যার সঙ্গে সড়ক খাতে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ যুক্ত হয়ে সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনার অভাব এবং নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করতে না পারার কারণে সাধারণ যাত্রী ও পথচারীদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করে সংগঠনটি।
সড়ক দুর্ঘটনা কমানো এবং পরিবহন খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বিভিন্ন সুপারিশও তুলে ধরেছে। সংগঠনটি মনে করে, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) কেবল প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। পরিবহন খাতে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা সহজ হবে বলে মনে করে তারা।
দেশব্যাপী প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাস সার্ভিস চালুর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি। উন্নত বিশ্বের আদলে আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি কার্যকর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। পরিকল্পিত গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে সড়কে ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং যান চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।
চালকদের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও সংগঠনটির সুপারিশে গুরুত্ব পেয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কগুলোতে সার্ভিস লেন ও পথচারীদের জন্য ফুটপাত নির্মাণ, নিয়মিত রোড সেফটি অডিট পরিচালনা এবং সড়ক খাতে চাঁদাবাজি বন্ধে কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন স্ক্র্যাপ করা, বিআরটিএর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং আধুনিক ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির মতে, যানবাহনের ফিটনেস যাচাই, চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স প্রদান এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স